Monday, February 16, 2026

মুনীর অপটিমা থেকে অভ্র: কম্পিউটারে বাংলা লেখার বিপ্লব


বিশ্বে সাত হাজারেরও বেশি ভাষার মধ্যে বাংলা অন্যতম, যার রয়েছে নিজস্ব বর্ণমালা ও সমৃদ্ধ সাহিত্য। আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে মাতৃভাষায় মনের ভাব প্রকাশ এখন কেবল কথ্য রূপেই সীমাবদ্ধ নয়, ডিজিটাল মাধ্যমেও তা স্বতঃস্ফূর্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিন বা দাপ্তরিক কাজেও আমরা অবলীলায় ব্যবহার করছি বাংলা। কিন্তু কম্পিউটারে বা মোবাইলে কয়েক সেকেন্ডে বাংলা লেখার এই সহজ পথটি একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে বহু জ্ঞানী ও মেধাবী মানুষের অক্লান্ত শ্রম আর মেধার বিনিয়োগ। 
টাইপরাইটার যুগে বাংলা: মুনীর অপটিমা


বাংলা ফন্টের প্রথম ব্যবহার শুরু হয়েছিল টাইপরাইটারে। কম্পিউটারে বাংলা শব্দ লেখার পথে প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল একটি উপযুক্ত বাংলা কিবোর্ড তৈরি করা। এর সঙ্গে প্রয়োজন ছিল ব্যাকগ্রাউন্ড প্রসেসিং সফটওয়্যার এবং অক্ষর প্রকাশের জন্য ফন্ট। ইংরেজি কিবোর্ডের বিন্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলা বর্ণমালাকে কীভাবে সাজানো যায়, সেটাই ছিল মূল কাজ। ১৯৬৫ সালে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী (১৯৭১ এর শহীদ বুদ্ধিজীবী) প্রথম বৈজ্ঞানিক বাংলা কিবোর্ড বিন্যাস তৈরি করেন। জার্মানির রেমিংটন টাইপরাইটারদের সহযোগিতায় তৈরি এই কিবোর্ডের নামকরণ করা হয় ‘মুনীর অপটিমা কিবোর্ড’, যা পরে কম্পিউটারেও ব্যবহৃত হয়।

কম্পিউটারে বাংলার প্রথম পদধ্বনি: সাইফ শহীদ


কম্পিউটারের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হলে এতে বাংলা ফন্টের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আমেরিকা প্রবাসী প্রকৌশলী ড. সাইফ উদ দোহা শহীদ, যিনি সাইফ শহীদ নামে পরিচিত, সেই সময় কম্পিউটারে বাংলা ফন্ট ব্যবহারের কাঠামো তৈরি করেন। ১৯৮৩ সালে বেক্সিমকোতে কর্মরত অবস্থায় তিনি বাংলা কম্পিউটিংয়ের কাজ শুরু করেন। এর ফলশ্রুতিতে ১৯৮৪ সালে ম্যাকিন্টশ কর্পোরেশনের সহযোগিতায় ও নিজস্ব উদ্যোগে তিনি তৈরি করেন বাংলা ফন্ট ‘যশোর’, বাংলা কিবোর্ড ‘শহীদ লিপি’ এবং ম্যাক অপারেটিং সিস্টেমে বাংলা ইন্টারফেস। ১৯৮৫ সালের ২৫ জানুয়ারি তিনি ম্যাকিন্টশ কম্পিউটার থেকে তার মায়ের কাছে বাংলায় একটি চিঠি লেখেন, যা কম্পিউটারে প্রথম বাংলা লেখা হিসেবে স্বীকৃত। এই দিনটিকে ‘কম্পিউটারে বাংলা প্রচলন দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়।

বাণিজ্যিক যাত্রা: বিজয় বাংলা সফটওয়্যার

১৯৮৮ সালে সাংবাদিক মোস্তফা জব্বারের মালিকানাধীন আনন্দ কম্পিউটারস 'বিজয় বাংলা সফটওয়্যার' বাজারজাত করা শুরু করে। মোস্তফা জব্বার নিজেই এই বাংলা ফন্টগুলো নকশা করেছিলেন। প্রাথমিকভাবে ম্যাকিন্টশ অপারেটিং সিস্টেমে পরিচালিত হলেও, পরে বিজয় বাংলা বিভিন্ন আধুনিক কম্পিউটার ও মোবাইলের জন্য অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করে।

বর্তমানে বিজয় বাংলায় ১১০টিরও বেশি ফন্ট ফ্যামিলি রয়েছে এবং এটি ইউনিকোডের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ১৯৮৯ সালে 'বিজয় বাংলা স্ক্রিপ্ট ইন্টারফেস সিস্টেম' কপিরাইট আইনের অধীনে সুরক্ষিত হয়। মোস্তফা জব্বার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীও ছিলেন।

তরুণ প্রজন্মের প্রিয়: অভ্র কিবোর্ড


২০০৩ সালে চিকিৎসক ও প্রোগ্রামার মেহদী হাসান খান তার প্রতিষ্ঠিত ওমিক্রন ল্যাবের সহযোগিতায় তৈরি করেন ‘অভ্র কিবোর্ড’। এটিই প্রথম এএনএসআই এবং ইউনিকোড উভয় ফরম্যাটে বিনামূল্যে দেওয়া কিবোর্ড ইন্টারফেস। সি++ এবং ডেলফিতে রচিত এই কিবোর্ডের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি যেকোনো ভাষার বর্ণ ব্যবহার করে বাংলা ফন্ট টাইপ করতে পারে। এতে স্বয়ংক্রিয় বানান সংশোধন ও পরীক্ষকও যুক্ত রয়েছে। অভ্র’র সোর্স কোড উন্মুক্ত এবং এটি শতভাগ ভাইরাসমুক্ত। এই উদ্ভাবনের জন্য ২০২৫ সালে অভ্র টিম একুশে পদক লাভ করেছে।


এছাড়া বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বিএনএসআইএস) ২০১১ সালে অভ্রকে বিশেষ অবদান পুরস্কার প্রদান করে। বর্তমানে অভ্র কিবোর্ড বহুল ব্যবহৃত এবং বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরিতেও এটি ব্যবহার করা হয়।


পরবর্তীতে রিদ্মিক, ওপেনবাংলা কিবোর্ডের মতো আরও অনেক বাংলা কিবোর্ড আবিষ্কৃত হয়েছে। গুগল ও অ্যাপলের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেমের জন্য বাংলা কিবোর্ড চালু করেছে। এই দীর্ঘ পথচলা এবং মেধার বিনিয়োগের ফলেই আজ প্রযুক্তির প্রতিটি স্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার এতটাই সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত।

No comments:

Post a Comment