বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি—বাঙালির শোক, শক্তি ও গৌরবের দিন। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সেদিন রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা অনেকেই। সেই রক্তের দাগ শুকানোর আগেই দ্রোহের আগুনে জ্বলে উঠেছিল বাঙালি কবিদের কলম। রচিত হয়েছিল এমন সব কালজয়ী কবিতা, যা আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে শিহরণ জাগায় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা জোগায়।
একুশের প্রথম কবিতা হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। বায়ান্নর ২১শে ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের এক ছাপাখানায় বসে রচিত এই দীর্ঘ কবিতাটি সেদিনই গোপনে ছাপিয়ে বিলি করা হয়েছিল। পুলিশের রক্তচক্ষু ও হুলিয়া উপেক্ষা করে লেখা এই কবিতাটি ছিল ভাষা শহীদদের রক্তের প্রথম শক্তিশালী ও প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ।
একুশের কবিতার কথা উঠলেই অবধারিতভাবে মনে পড়ে আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ কবিতাটির কথা। ২৩ ফেব্রুয়ারি নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারটি পুলিশ ভেঙে ফেলার পর তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়ে লিখেছিলেন, “স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কী বন্ধু, আমরা এখনো/ চারকোটি পরিবার/ খাড়া রয়েছি তো!” এই পঙ্ক্তিমালা সে সময় তরুণদের কতটা সাহস জুগিয়েছিল, তা আজ এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘কোনো এক মাকে’ কবিতাটি একুশের আরেক অনবদ্য সৃষ্টি। “কুমড়ো ফুলে-ফুলে নুয়ে পড়েছে লতাটা/ সজনে ডাঁটায় ভরে গেছে গাছটা/ আর, আমি ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছি.../ খোকা তুই কবে আসবি? কবে ছুটি?”— একজন গ্রামীণ মায়ের এই ব্যাকুল অপেক্ষা এবং সন্তানের শহীদ হওয়ার চিত্র প্রতিটি পাঠকের চোখ আজও ভিজিয়ে দেয়।
কবি শামসুর রাহমানের ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ কবিতায় বাংলা ভাষার প্রতি যে গভীর মমত্ববোধ ও বিপন্নতার চিত্র ফুটে উঠেছে, তা অতুলনীয়। এছাড়া, আল মাহমুদের ‘একুশের কবিতা’, হাসান হাফিজুর রহমানের ‘অমর একুশে’, এবং আবদুল গাফফার চৌধুরীর সেই কালজয়ী রচনা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ (যা মূলত একটি কবিতা হিসেবেই প্রথম লেখা হয়েছিল)—এগুলো একুশের সাহিত্যভাণ্ডারকে করেছে চরম সমৃদ্ধ।
একুশের এই কবিতাগুলো শুধু শোকগাথা নয়, এগুলো বাঙালির প্রতিরোধের জীবন্ত দলিল। সাত দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই কবিতাগুলোর আবেদন এতটুকু মলিন হয়নি; বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এগুলো মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা, স্বাধিকার চেতনা এবং যে কোনো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অফুরন্ত প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে।
No comments:
Post a Comment