Wednesday, February 18, 2026

যেভাবে আমাদের হলো একুশের অবিনাশী গান



‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’—বাঙালির শোকের মাসে এই একটি সুর কোটি প্রাণের আবেগকে একবিন্দুতে মিলিত করে। প্রতিবছর প্রভাতফেরির শাশ্বত অনুষঙ্গ হয়ে ওঠা এই কালজয়ী গানের সৃষ্টির পেছনে রয়েছে রাজপথের রক্ত আর এক তরুণের দ্রোহের ইতিহাস। 

সৃষ্টির ক্ষণ: ঢাকা মেডিকেলের সেই বারান্দা

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দেন রফিক, সালাম, বরকতসহ অনেকে। সেই উত্তাল সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের আউটডোরে গুলিবিদ্ধ ছাত্রদের দেখতে যান তরুণ সাংবাদিক ও ছাত্রনেতা আব্দুল গাফফার চৌধুরী।

হাসপাতালের বারান্দায় তিনি ভাষা শহীদ রফিকের লাশ দেখতে পান, যার মাথার খুলি উড়ে গিয়েছিল। সেই বীভৎস দৃশ্য দেখে শিউরে ওঠেন তিনি। নিজের আপন ভাইকে হারানোর মতো এক গভীর বেদনা থেকে হাসপাতালের বিছানায় বসেই তিনি লিখে ফেলেন কবিতার প্রথম কয়েকটি পংক্তি। মূলত একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে পরবর্তী দু-তিন দিনে কবিতাটি পূর্ণতা পায়।

সুরের বিবর্তন: আব্দুল লতিফ থেকে আলতাফ মাহমুদ

গানটি শুরুতে সুর করেছিলেন লোকসংগীত শিল্পী আব্দুল লতিফ। ১৯৫৩ সালে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনে এটি কবিতা হিসেবে প্রকাশিত হয়। ওই বছরই একুশের প্রথম বার্ষিকীতে আব্দুল লতিফের সুরে গানটি গাওয়া হয়েছিল।


তবে গানটির বর্তমানের ধীর ও শোকাতুর সুরটি সংযোজন করেন প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ আলতাফ মাহমুদ। ১৯৫৪ সালের পরে তার করা এই সুরটিই সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যা এখন আমাদের প্রভাতফেরির অবিচ্ছেদ্য অংশ।


ঐতিহ্যের অম্লান স্মারক

এই গানটি কেবল একটি সংগীত নয়, বরং এটি বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের প্রতীক। পাকিস্তান আমলের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে এই গানটি ছিল প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনেও এই গানটি বাঙালির মনে তীব্র জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিল।


গানের বর্তমান সুরকার আলতাফ মাহমুদ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হলেও তার রেখে যাওয়া সুর আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে।

মাতৃভাষার প্রতি এমন গভীর মমতা আর ত্যাগের মহিমা বিশ্বের আর কোনো গানে এভাবে ফুটে ওঠেনি।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই গানটি আমাদের আত্মপরিচয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনাকে জাগ্রত রাখে।

No comments:

Post a Comment