Saturday, February 21, 2026

ঐতিহাসিক প্রচারপত্র: ভাষা আন্দোলনে কমিউনিস্টদের ভূমিকা


 ১৯৫২ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি, ঐতিহাসিক ২১শে ফেব্রুয়ারির ঠিক আগের দিন, পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ববঙ্গ সাংগঠনিক কমিটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রচারপত্র বিলি করে। এই প্রচারপত্রটি কেবল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিই নয়, বরং পাকিস্তানের সকল জাতিসত্তার ভাষার সমমর্যাদা এবং সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ অবস্থান তুলে ধরেছিল।


প্রচারপত্রটি হুবহু নিচে উদ্ধৃত করা হলো:


সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহবানে সাড়া দিন

সকল ভাষার সমমফ্যাদা ও বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা দাবীতে ২১শে ফেব্রুয়ারী সারা প্রদেশব্যাপী ধর্মঘট, হরতাল, সভা ও শোভাযাত্রা করুন

আওয়াজ তুলুন:


  • ইংরেজী ভাষাকে আর রাষ্ট্রভাষা রাখা চলবে না

  • পাকিস্তানের সকল ভাষার সমন্যান্য চাই

  • বাঙ্গালী, পাঞ্জৰী, পাঠান, সিন্ধি, বেলুচি, উর্দুভাষী প্রভৃতি সকল জাতিকেই নিজ নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ করার ও রাজকার্য পরিচালনার অধিকার দেওয়া চাই,

  • বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা চাই।


বাংলার জন্য আন্দোলন, উর্দু'র বিরুদ্ধে আন্দোলন নয়। ইংরেজীর বদলে উর্দু, বাংলা-সকল ভাষাকে রাষ্ট্রে সমমর্যাদা দেওয়ার আন্দোলন।


ইংরেজ পাক-ভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষি জাতিকে পশ্চাৎপদ রাখিয়া সাম্রাজ্যবাদী ও সামন্তবাদী শোষণ ব্যবস্থাকে অব্যাহত রাখার জন্য একটী ভাষা-ইংরেজী ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করিয়াছিল। লীগ সরকারও একই উদ্দেশ্যে এখন পর্যন্ত ইংরেজী ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চালু রাখিয়াছেন এবং একমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করিতে চাহিতেছেন।


একটি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করিলে পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষি জাতি পশ্চাৎপদ গাত্রিয়া পাইবে এবং ইহার ফলে পাকিস্তানের সামগ্রিক উন্নতিই ব্যাহত হইবে।


অতএব পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাকে সমমর্য্যাদা ও রাষ্ট্রভাষা করার দাবীর আন্দোলনে পাকিস্তানের বাঙ্গালী, পাঞ্জাবী, পাঠান, সিন্ধি বেলুচি, উর্দু ভাষী-সকল জাতি ঐক্যবদ্ধতাষে আগাইয়া আসুন।


২০শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৫২

পূর্ববঙ্গ সাংগঠনিক কমিটি

পাকিস্তানের কমিউনিষ্ট পার্টি


সমসাময়িক প্রেক্ষাপট


৫২-এর এই প্রচারপত্রটি বর্তমান বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৫২ সালে কমিউনিস্ট পার্টি যেভাবে 'সাম্রাজ্যবাদী ও সামন্তবাদী শোষণ' ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ভাষাকে হাতিয়ার করেছিল, ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে সেই শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। সে সময় বামপন্থীরা যেমন পাঞ্জাবী, সিন্ধি বা বেলুচদের অধিকারের কথা বলেছিল, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা দেশের ভেতরে প্রান্তিক জাতিসত্তা ও শ্রমজীবী মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।


প্রচারপত্রটি প্রমাণ করে যে, ভাষা আন্দোলন কেবল "বাংলা বনাম উর্দু" ছিল না। কমিউনিস্টরা বিষয়টিকে "সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজী" শাসনের অবশেষ এবং "সামন্তবাদী শোষণ" হিসেবে দেখতেন।


ওই প্রচারপত্রে পাঞ্জাবী, সিন্ধি, বেলুচ ও পাখতুনদের নিজ নিজ ভাষায় শিক্ষার অধিকারের কথা বলা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, তৎকালীন বামপন্থীরা একটি ফেডারেল বা বৈচিত্র্যময় পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে কোনো একটি ভাষার আধিপত্য থাকবে না।


মূল প্রচারপত্রে "উর্দু'র বিরুদ্ধে আন্দোলন নয়" কথাটি ব্যবহার করে তারা এটি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, তারা কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর বিরোধী নন, বরং তারা শোষণের বিরোধী।


সম্প্রতি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পরিবর্তিত রাজনৈতিক শক্তির যে সমাবেশ দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে যে একুশের চেতনা এখন আর কেবল একটি নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং সর্বজনীন অধিকারের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

১৯৫২ সালে কমিউনিস্টদের সেই 'ঐক্যবদ্ধ' লড়াইয়ের ডাক আজও প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে যখন রাষ্ট্র সংস্কার এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হচ্ছে। ভাষার অধিকার আজ কেবল বর্ণমালার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বাকস্বাধীনতা এবং নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ৫২-এর সেই অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের স্বপ্নই বর্তমানের নতুন বাংলাদেশের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।


No comments:

Post a Comment