২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। একাত্তরের এই দিনে যে মুক্তির বারতা ছড়িয়ে পড়েছিল, তার পেছনে ছিল ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে আপামর জনসাধারণের ত্যাগ। রক্তক্ষয়ী নয় মাসে লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতায় সমান অংশীদার ছিলেন পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী মানুষরাও। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, ৫৪ বছর পেরিয়ে আজও বাংলাদেশের সংবিধানে সেই বীর যোদ্ধাদের এবং তাদের জাতিসত্তার মৌলিক স্বীকৃতি মেলেনি। স্বাধীন দেশের মানচিত্রে নিজেদের অস্তিত্বের অধিকার খুঁজতে গিয়ে আদিবাসীরা যেন আজ নিজভূমে পরবাসী।
১৯৭২ সালে যখন স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান
রচিত হয়, তখন এক জাতীয়তাবাদের দোহাই দিয়ে আদিবাসীদের স্বাতন্ত্র্যকে অস্বীকার করা হয়েছিল।
সংবিধানে আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, যা একটি
স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য ছিল চরম অকৃতজ্ঞতার নামান্তর। আদিবাসীদের ভূমি অধিকার, নিজস্ব
ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যবাহী চাষাবাদ পদ্ধতি (যেমন জুম চাষ) সাংবিধানিক সুরক্ষা পায়নি।
গত সাড়ে পাঁচ দশকে সংবিধান বহুবার সংশোধন বা ‘কাটাছেঁড়া’ করা হয়েছে, কিন্তু আদিবাসীদের
রাজনৈতিক ও জাতিগত স্বীকৃতির দাবিটি সবসময়ই উপেক্ষিত থেকেছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে
তাদের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বা ‘উপজাতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের
দাবিটি পূরণ করা হয়নি।
রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে আদিবাসীরা
চরম বৈষম্যের শিকার। দেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের নামে নির্বাচনে অংশ নিতে
পারলেও, আদিবাসীদের নিজস্ব রাজনৈতিক সংগঠনগুলো তাদের জাতিগত পরিচয়ে বা দলের নামে জাতীয়
নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় না। এটি এক বড় ধরনের গণতান্ত্রিক পরিহাস যে, একসময়
যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত বা স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিও রাজনৈতিক সুযোগ লাভ করেছে,
অথচ আদিবাসীরা কেবল ‘বাঙালি’ না হওয়ার কারণে নিজস্ব পরিচয়ে রাজনীতি করার অধিকার থেকে
বঞ্চিত। ২০২৬ সালের গণতন্ত্রে উত্তরণের নির্বাচনেও আদিবাসীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে,
কিন্তু তাদের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নটি আজও অমীমাংসিত।
সংবিধানে ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি না
থাকায় আদিবাসীরা প্রতিনিয়ত উচ্ছেদের শিকার হচ্ছে। সমতলের প্রভাবশালী ও বিত্তবানরা ছলে-বলে-কৌশলে
তাদের চিরায়ত জমি দখল করে নিচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা
বনভূমি রক্ষা বা পর্যটনের নামে ভিটেমাটি হারাচ্ছে। ভূমিই যেখানে আদিবাসীদের জীবন ও
সংস্কৃতির মূল ভিত্তি, সেখানে সেই ভূমির আইনি সুরক্ষা না থাকা মানে তাদের অস্তিত্বকে
বিপন্ন করা। মানবাধিকার লঙ্ঘনের এই চিত্রগুলো প্রমাণ করে যে, কাগজে-কলমে নাগরিক হলেও
তারা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে এক প্রকার অদৃশ্য জীবন যাপন করছে।
অথচ বাংলাদেশের অর্জনে আদিবাসীদের অবদান
অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। একাত্তরের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান,
চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৬ সালের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন—প্রতিটি বাঁকেই
তারা রক্ত দিয়েছে। কেবল লড়াই নয়, দেশের সুনাম বৃদ্ধিতেও তারা অগ্রগামী। বিশেষ করে আদিবাসী
নারী ফুটবলাররা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পতাকাকে যেভাবে উঁচিয়ে ধরেছেন, তা গোটা
জাতিকে গর্বিত করেছে। অর্থনীতিতে তাদের শ্রম ও জুম পাহাড়ের ফলন দেশের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ
করছে।
এত অর্জনের পরও কেন তারা ‘আদিবাসী’
হিসেবে স্বীকৃতি পাবে না? কেন তাদের নিজস্ব পরিচয় নিয়ে স্বাধীন দেশে মাথা উঁচু করে
দাঁড়ানোর অধিকার থাকবে না? পৃথিবী পরিবর্তনশীল, বাংলাদেশও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের যে আলাপ এখন চারদিকে, তার সার্থকতা তখনই
আসবে যখন আদিবাসীরা তাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পাবে। দেশের
প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন পাহাড় ও সমতলের এই প্রান্তিক মানুষগুলো নিজেদের আর
‘পরবাসী’ ভাববে না। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ একদিন আদিবাসীদের
এই দীর্ঘ বঞ্চনার অবসান ঘটাবে—এটাই আজকের দিনের প্রত্যাশা।

No comments:
Post a Comment