Saturday, May 9, 2015

রামুতে বনায়নের নামে পাহাড় কেটে পুকুর




বিপ্লব রহমান ও তোফায়েল আহমদ
বনায়নের নামে পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে কক্সবাজারের রামুতে পাহাড় কেটে পুকুর তৈরি করেছে বন বিভাগ। যদিও পুকুরে পানির দেখা মেলেনি। আর বোটানিক্যাল গার্ডেনের (উদ্ভিদ উদ্যান) নামে বন বিভাগের গোলাপ বাগান গড়ার উদ্যোগও গেছে ভেস্তে। 'কক্সবাজার জেলার পাহাড়ি প্রাণবৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার' নামের প্রকল্পে এভাবেই অপচয় করা হয়েছে জলবায়ু তহবিলের অর্থ।


সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার রাজারকুল বনাঞ্চলে ওই প্রকল্পের অধীন উদ্ভিদ উদ্যান তৈরির অংশ হিসেবে বন বিভাগ পুকুর খননের জন্য কেটে ফেলেছে একটি পাহাড়ের চূড়া। এতে পরিবেশের ভারসাম্য তো নষ্ট হয়েছেই, আশঙ্কা দেখা দিয়েছে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসের। পুকুরটি এখনো রয়েছে শুকনো। উচ্চতার কারণে এতে ভূগর্ভস্থ পানির দেখা মেলারও সম্ভাবনা নেই। পুকুরের তলদেশে প্লাস্টিকের শিট বিছিয়ে একে কৃত্রিম জলাধারে পরিণত করার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত পাহাড়ধসের আশঙ্কাই থাকছে। পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, পাহাড় ও টিলা কাটা পরিবেশ আইনে পুরোপুরি নিষিদ্ধ। আর রামুতে পাহাড় কেটে পুকুর নির্মাণের বিষয়টি তারা জানেই না। বন বিভাগ এ ব্যাপারে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজনই মনে করেনি।

বন বিভাগের দাবি, নানা দুর্লভ গাছপালা দিয়ে তারা চেষ্টা করছে উদ্ভিদ উদ্যান গড়ে তুলতে। পরিকল্পনা রয়েছে ৬৫ একর জমিতে নার্সারি, গোলাপ বাগান, অর্কিড হাউস, ক্যাকটাস হাউস, বহুবর্ষজীবী ফুলের বাগান, ঋতুভিত্তিক ফুলের বাগান ইত্যাদি গড়ে তোলার। এই উদ্যানের গাছে পানি সরবরাহের লক্ষ্যেই খনন করা হয়েছে পুকুর। পাশাপাশি পুকুরটি দর্শনার্থীদের জন্য বিনোদনকেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হবে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করে বলেন, তবে পুকুরটি পানিশূন্য থাকায় এটি আর কোনো কাজে লাগছে না। পানির অভাবে উদ্যানের গাছপালাও দ্রুত মরে যাচ্ছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের জুলাইয়ে গ্রহণ করা হয় 'কক্সবাজার জেলার পাহাড়ি প্রাণবৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার' প্রকল্প। জলবায়ু তহবিলের অর্থায়নে এই প্রকল্পে দুই কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়সাপেক্ষে ১৫ একর বনভূমিতে উদ্যান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় প্রায় পাঁচ কোটি ৫০ হাজার টাকা। এরই মধ্যে ব্যয় হয়েছে প্রায় চার কোটি টাকা।

এই খাতে জলবায়ু তহবিলের বরাদ্দ বাড়ানোয় বন বিভাগ ১৫ একরের বদলে উদ্ভিদ উদ্যানটি মোট ৬৫ একর জমিতে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়। প্রথম দফায় ২০১২-২০১৩ সালে ১৫ একর বনভূমির চারদিকে সীমানা দেয়াল, বাগানমালী ও নিরাপত্তা প্রহরীর ব্যারাক, পাম্প হাউস, নার্সারি, জীবন্ত গাছের বেড়ার বাগান, গোলাপ বাগান, অর্কিড হাউস, ক্যাকটাস হাউস, বহুবর্ষজীবী ফুলের বাগান, ঋতুভিত্তিক ফুলের বাগানসহ অন্যান্য কাজে ব্যয় করা হয় প্রায় দুই কোটি ৮০ লাখ টাকা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ১৫ একর বনভূমির চারদিকে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকায় গড়ে তোলা হয় সীমানাপ্রাচীর। প্রকল্প এলাকার জমি পরে আরো ৫০ একর বাড়ানোয় ওই সীমানাপ্রাচীরের অর্ধেকই এখন আর কোনো কাজে আসছে না। আবার প্রথম দফায় ১৫ একর বনভূমিতে গোলাপ বাগান, বহুবর্ষজীবী ফুলের বাগানসহ অন্যান্য উদ্ভিদ উদ্যান করা হলেও পরিচর্যার অভাবে তা নষ্ট হতে বসেছে। প্রকল্প এলাকায় রয়েছে পর্যাপ্ত পানির অভাব। বাগান পরিচর্যার জন্য মালীসহ অন্যান্য লোকবলও নেই। লোকশূন্য বলে বাগানমালী ও নিরাপত্তা প্রহরীর আবাসনের ব্যারাক ব্যবহৃত হচ্ছে উদ্ভিদ উদ্যানের কার্যালয় হিসেবে। সম্প্রসারিত ৫০ একর উদ্যানে সৃজন করা হচ্ছে ঔষধি গাছসহ বিরল ও বিলুপ্ত প্রজাতির বাগান, এমনকি বাঁশবাগানও। সেই সঙ্গে সেখানে বিনোদন সুবিধা বাড়াতে দর্শনার্থীদের জন্য বিশালাকায় ছাতার নিচে বসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তৈরি করা হচ্ছে উদ্যানের ভেতর ওয়াকওয়ে (হাঁটার পথ)।

এদিকে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে উদ্যানের গাছপালায় নিয়মিত পানি সরবরাহের জন্য পাঁচ লাখেরও বেশি টাকা ব্যয় করে পাহাড়ের চূড়ায় জলশূন্য পুকুর খনন নিয়ে। আবার পুকুরের পাশে প্রায় দুই হাজার ঘনমিটার খাল এবং আরো প্রায় দুই হাজার ঘনমিটার লেক সংস্কার করারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় আট লাখ টাকা ব্যয়ে খাল ও লেক সংস্কার করা হলে অহেতুক পুকুরটি কাটার যৌক্তিকতা কী জানতে চাইলে বন কর্মকর্তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

রামুর বিশিষ্ট ফল বাগান মালিক মোজাফফর আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, পাহাড়ের চূড়ায় পুকুর খনন মানে কচুপাতায় পানি ধরে রাখার নিষ্কল চেষ্টা। কারণ পাহাড়ে কখনো পানি জমে থাকে না, ঢালু বনভূমি বলে পানি খুব দ্রুত নিচের দিকে গড়িয়ে নামে। উপরন্তু পাহাড়ে পুকুর খননের ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। আশঙ্কা রয়েছে যেকোনো সময় পাহাড়ধসের।

উদ্ভিদ উদ্যান কর্মসূচি বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত হচ্ছেন রাজারকুল রেঞ্জ কর্মকর্তা আমির হামজা। খাল ও লেক সংস্কারের পাশাপাশি ওই পুকুর খননের যৌক্তিকতা কতটুকু জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, 'প্রতিটি উদ্যানের জন্য আবশ্যিকভাবে চাই একটি করে পুকুর। উদ্যানে পানি সরবরাহ ছাড়াও পুকুরের সৌন্দর্যই আলাদা। আর দর্শনার্থীরাও এর পারে প্রকৃতি উপভোগ করতে পারে। আমাদের ওপর নির্দেশনাও রয়েছে সেখানে একটি পুকুর খননের। তাই পাহাড়ে পুকুর করেছি।'

রেঞ্জ কর্মকর্তা আরো বলেন, 'উদ্ভিদ উদ্যানের নিজস্ব লোকবল নেই। তাই আমি রেঞ্জ ও বিট কার্যালয় থেকে তিনজন বনকর্মী এনে কোনোরকমে উদ্যানটি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। নৈশপ্রহরী না থাকায় রাতে বন্য হাতি ও অন্যান্য বন্য প্রাণী হানা দিয়ে উদ্যানটি নষ্ট করে ফেলছে। প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে জুন মাসে। তখন এটিকে এগিয়ে নেওয়াই হবে মুশকিল।'

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবদুল আউয়াল সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, টেকসই জলবায়ুর জন্য প্রয়োজন স্থায়ী বনের। এরই অংশ হিসেবে একটি উদ্ভিদ উদ্যান গড়ে তোলা হচ্ছে। পরিকল্পনা রয়েছে সেখানে প্রচুর গাছগাছালি রাখার। এতে দিন দিন গাছপালার সংখ্যাও বাড়ানো হবে। ফলে হ্রাস পাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি। এসব দিক বিবেচনা করেই বন বিভাগ রামুতে ওই উদ্যান গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। তাঁর দাবি, এরই মধ্যে ঊর্ধ্বতন বন কর্মকর্তারা প্রকল্প এলাকা ঘুরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

অন্যদিকে কক্সবাজার জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সরদার শরিফুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি প্রথম কালের কণ্ঠ'র কাছেই শুনছেন বন বিভাগের উদ্যোগে রামুতে পাহাড় কেটে ওই পুকুর তৈরির ঘটনা। তিনি বলেন, 'পরিবেশ আইনে যেকোনো ধরনের পাহাড় ও টিলা কেটে ফেলা দণ্ডনীয় অপরাধ। রামুতে পাহাড় কেটে পুকুর নির্মাণের বিষয়ে বন বিভাগ আমাদের কোনো তথ্যই জানায়নি। আমরা শুধু এটুকু জেনেছি যে, তারা সেখানে একটি উদ্ভিদ উদ্যান তৈরি করছে।'
- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2015/05/09/219792#sthash.u0IFJT8X.1ErvnGSQ.dpuf