Wednesday, February 5, 2014

একুশের সংবাদ: ই-বুকে স্বচ্ছন্দ পথচলা



ছাপাখানা আবিষ্কার হয়েছিল ৬০০ বছর আগে। সেই থেকে বইয়ের দাপুটে পথচলা। এরই ধারাবাহিকতায় বইয়ের জগতে বড় বিপ্লবটি ঘটিয়েছে ইলেকট্রনিক-বই বা ই-বুক। তবে তা গতানুগতিক মলাট বাঁধাই নয়। অনলাইনে পাঠক তার কাক্সিক্ষত বইটি সহজেই পড়ে নিতে পারে কম্পিউটারের পর্দায় চোখ রেখে। ডাউনলোড করে প্রিন্টও নিতে পারে। এ জন্য দোকানে গিয়ে বই কেনার বা গ্রন্থাগারে গিয়ে বই ধার করার ঝক্কি-ঝামেলা নেই। প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় কম্পিউটারে ই-বুক পড়া যেমন যায়, তেমনি ই-বুক পড়ার জন্য রয়েছে আলাদা ই-বুক রিডার। গত কয়েক বছরে স্মার্ট ফোন থেকেও সহজলভ্য হয়েছে ই-বুক পাঠ। মোবাইল ফোনেই আজকাল কয়েক হাজার ই-বুক রাখা যায়।

বছর দশেক ধরে অন্যান্য ভাষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলা ভাষাতেও তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ই-বুক। বিনা মূল্যে ই-বুক পাঠের সুবিধার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি সাইটে বাংলা ভাষার ই-বুক অনলাইনে বিক্রিও হচ্ছে। ই-বুকের কল্যাণে ক্রমেই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে বাংলা ভাষাভাষীর পাঠচর্চা। বাংলা পেয়েছে নতুন মাত্রা। বাংলাদেশ সরকার স্কুল-কলেজের প্রায় সব পাঠ্য বইকে ই-বুক আকারে প্রকাশ করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে এসব বইপত্র বিনা মূল্যে ডাউনলোড করা যায়। সে সুবাদে শিক্ষার্থীরা আজকাল কম্পিউটার, ল্যাপটপ এমনকি মোবাইল ফোনেই তাদের পাঠ্য বই পড়তে পারছে। এটা নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী অগ্রগতি।

 
ওয়াকিবহালরা বলছেন, ই-বুকের কল্যাণে ভাষা যেমন পেয়েছে গতিশীলতা, তেমনি এতে বইয়ের প্রকাশনা খরচও কমে গেছে। পাশাপাশি সর্বত্র বইয়ের বিস্তার ঘটানোর সুযোগ বেড়েছে অভাবনীয়ভাবে। একেকটি ই-বুক রিডারে হাজার হাজার বই ডাউনলোড করে রেখে পড়া যায় বলে কাগুজে বই সংরক্ষণের জন্য বিশাল পাঠকক্ষ বা শত শত বইয়ের আলমারি আর প্রয়োজন নেই।

ধারণা করা হচ্ছে, ই-বুকের দ্রুত অগ্রযাত্রার কল্যাণে আগামী কয়েক শতাব্দীতে ‘বইয়ের বোঝা’ কথাটি ধীরে ধীরে চলে যাবে জাদুঘরে। বেশির ভাগ ই-বুক পোর্টেবল ডকুমেন্ট ফরমেট বা পিডিএফ আকারে তৈরি হয় বলে তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান রাখে, এমন যে কেউই তৈরি করতে পারে নিজস্ব ই-বুক। পরে এটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে সংযুক্ত করে পাঠকের কাছে তা জানান দেওয়ার অপেক্ষা। অনলাইন বিজ্ঞাপনের ফলে ই-বুকের ক্রেতা ও পাঠক দুই-ই বেড়ে চলেছে দ্রুতগতিতে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলা ই-বুক প্রথম দিকে তৈরি হয় স্বেচ্ছাশ্রমে পরিচালিত বিভিন্ন ব্লগ সাইটে। ব্লগারদের নির্বাচিত লেখা নিয়ে প্রথম ই-বুক তৈরি করে বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় ব্লগ সাইট সামহোয়ারইনব্লগ ডট নেট। এখন সচলায়তন ডটকম, আমারব্লগ ডটকম, মুক্তমনা ডটকমসহ অন্যান্য ব্লগ সাইটও ব্লগারদের বাছাই করা লেখা নিয়ে নিয়মিত ই-বুক প্রকাশ করে চলেছে। মুক্তমনা ডটকমে বিনা মূল্যের ই-বুক ছাড়াও বিজ্ঞান, দর্শন, বিবর্তন ও সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন গ্রন্থ ক্রেডিট কার্ডে ই-বুক আকারে কেনার ব্যবস্থাও রয়েছে। বাংলা ভাষার প্রথম সঞ্চালনবিহীন ব্লগ সাইট আমারব্লগ ডটকমে রয়েছে ই-বুকের জন্য আলাদা বিভাগ। সেখানে ব্লগাররা নিজস্ব ই-বুক সংরক্ষণ করতে পারেন। এ ছাড়া মেধাস্বত্বের আওতামুক্ত চিরায়ত বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব বই-ই এখন অনলাইনে বিনা মূল্যের ই-বুক আকারে সুলভ। দেশের কয়েকটি নিউজ পোর্টালেও চিরায়ত বাংলা সাহিত্যের বেশ কয়েকটি ই-বুক সংযুক্ত করা হয়েছে।

ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা অ্যাট বার্মিংহামের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রাগিব হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলা ভাষায় ই-বুকের ধারণাটি আস্তে আস্তে বিকশিত হচ্ছে। বছর দুয়েক আগে যেমন বাংলাতে ই-বুক ছিল না বললেই চলে, এখন সে চিত্র পাল্টেছে। অনেক নবীন প্রকাশক এবং লেখক প্রথাগত বইয়ের পাশাপাশি ই-বুক প্রকাশ করছেন। আমার বিশ্বাস, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ই-বুক রিডারের প্রচলন বাড়বে। সেই সঙ্গে বাড়বে বাংলা ই-বুকের চাহিদাও।’

আমারব্লগ ডটকমের নির্মাতা সুশান্ত দাসগুপ্ত বলেন, ‘ই-বুক বর্তমানে তথ্যসংগ্রহের জনপ্রিয় ডিজিটাল মাধ্যম। অনলাইনে বেশ কিছু বাংলা ব্লগ ব্লগারদের নির্বাচিত লেখাগুলোকে ই-বুক আকারে প্রকাশ করছে। চর্চা হচ্ছে ম্ক্তুচিন্তার, ছড়িয়ে যাচ্ছে জ্ঞান, উপকৃত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম, দেশ ও জাতি। পাশাপাশি সরকার ই-বুক আকারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে সংযুক্ত করেছে স্কুল ও কলেজের অধিকাংশ পাঠ্য বই। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে এভাবেই ই-বুকগুলো আমাদের পথচলাকে বেগবান করছে।’

করাচি প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক মাসকাওয়াথ আহসান বলেন, ‘প্রকাশনার ক্ষেত্রে ই-বুক হচ্ছে সমসাময়িক বাস্তবতায় রীতিমতো একটি ভিন্ন মাত্রার উল্লম্ফন। ঠিক যে কারণে মানুষ হাতে লেখা চিঠির কথা ভুলে ই-মেইল চর্চার যুগে ঢুকে পড়েছে, একই কারণে তৈরি হয়েছে ই-বুকের জনপ্রিয়তা। ছাপার বইয়ের আবেদন চিরন্তন ঠিকই; কিন্তু লেখকের বরাবরের আকাক্সক্ষা থাকে আরো বেশিসংখ্যক পাঠকের কাছে পৌঁছানোর। ই-বুক মুহূর্তেই অনেক পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়। এটি ছাপানোর বিষয় নেই বলে কাগজ নষ্ট হচ্ছে না। সেই দিক থেকে ই-বুক পরিবেশবান্ধব। এসব দিক বিবেচনায় বাংলা ভাষাতেও ঘটছে ই-বুকের প্রসার।’

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/05/48792#sthash.B97f3V5A.dpuf