Friday, February 7, 2014

একুশের সংবাদ: জেলা তথ্য বাতায়নে দখিনা হাওয়া


কোনো জেলা সম্পর্কে সাধারণ তথ্য পাওয়া একটি কঠিন কাজ। সরকারি পর্যায়েও আছে বেড়াজাল। ছোট কোনো তথ্যের জন্যও ধরনা দিতে হবে বিভিন্ন দপ্তর ও বিভাগে। আবার লাইব্রেরিতে গিয়ে পুস্তক-সাময়িকী ঘাঁটাঘাঁটিতে অনেক ঝক্কি। উপরন্তু বাজারের বইপত্রের তথ্য কতখানি নির্ভরযোগ্য, তা নিয়েও রয়েছে সংশয়। তবে এই অচলায়তনে দখিনা হাওয়া হয়ে আসে ওয়েবসাইট। ‘বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন’ www.bdgovportal.com বিভিন্ন জেলার ছোট-বড় নানা তথ্য নিয়ে ছড়িয়ে আছে বিশ্বময়। ইন্টারনেটের সহায়তায় সাইটে ঢুকলেই সব তথ্য চলে আসে হাতের নাগালে।

একুশের গৌরবের পথচলায় সরকারি উদ্যোগে উন্মুক্ত হয়েছে তথ্যের এই খিড়কি দুয়ার। খোদ বাংলাদেশ সরকার এসব তথ্যের জোগানদাতা বলে গবেষণা ও লেখাপড়ায় নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যায় এই ওয়েবসাইটের তথ্যসূত্র। কম দামি স্মার্টফোন থেকেও এই সাইটটি ব্রাউজ করা যায়।


জানা যায়, বছর সাতেক আগে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় নেওয়া হয় ‘একসেস টু ইনফরমেশন’ বা এটুআই প্রকল্প। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয় ২০০৬-২০১১ সালে। এটুআই প্রকল্পে বাংলা বর্ণ সংকেতায়ন বা বাংলা হরফে ইউনিকোডে নির্মাণ করা হয় bdgovportal.com। নির্মাণে অনেক ত্রুটি থাকলেও সাইটটি অনেকের জন্যই অতি প্রয়োজনীয়। নেভিগেশন কি বা সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে কাক্সিক্ষত বিভাগ, মন্ত্রণালয় ও জেলা তথ্য বাতায়ন থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া সম্ভব। একেকটি বিষয়ে তথ্য সরবরাহ করেছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও বিভাগ। এ কারণে সমন্বিত এই উদ্যোগটি অনেক সুশৃঙ্খল। আবার কাক্সিক্ষত জেলার নাম ইংরেজিতে লিখে তার পাশে ডটগভ ডটবিডি লিখলেই ব্যবহারকারী সরাসরি প্রবেশ করতে পারেন সংশ্লিষ্ট জেলা তথ্য বাতায়নে [যেমন, dhaka.gov.bd।



প্রতিটি জেলা তথ্য বাতায়নে যোগ করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, সরকারি অফিস, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, ই-সেবা, ফটো গ্যালারি, নোটিশ বোর্ড, কৃষি, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা, পর্যটন ও ঐতিহ্য, প্রকৌশল ও যোগাযোগ, মানবসম্পদ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিবিধ ইত্যাদি বিভাগ। এ ছাড়া সাইটের প্রচ্ছদ বা নীড়পাতার ডান পাশে দেওয়া রয়েছে নানা প্রয়োজনীয় সরকারি পরিষেবার লিংক। এর মধ্যে ই-বুক, জাতীয় ই-তথ্যকোষ, জাতীয় ফরম ডাউনলোড, নাগরিক আবেদন, দাপ্তরিক আবেদন, নকলের জন্য আবেদন, সর্বশেষ অবস্থা জানুন, ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির আবেদন ফরম, ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত তথ্য প্রাপ্তির আবেদনপত্র, তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা ইত্যাদি অন্যতম।

প্রতিটি জেলা তথ্য বাতায়নের একেকটি বিভাগে রয়েছে বিভিন্ন অনুবিভাগ। যেমন- জেলা সম্পর্কিত তথ্য বিভাগে একনজরে জেলা, জেলার পরিচিতি, জনপ্রতিনিধি, পত্রপত্রিকা, বিশেষ অর্জন, ইতিহাস-ঐহিত্য বিভাগে পুরাকীর্তির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, ভাষা ও সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের তালিকা, প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব, খেলাধুলা ও বিনোদন, স্থানীয় প্রশাসন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, নদ-নদী, অর্থনীতি বিভাগে প্রাকৃতিক সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য, হাট-বাজার, হোটেল ও আবাসন ইত্যাদি অনুবিভাগ রয়েছে।

আধুনিক ওয়েব ডিজাইনের বিচারে সাইটটি অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। মূল সাইটের প্রচ্ছদের ‘অনলাইন কি’সহ কয়েকটি ফিচার সক্রিয় নয়। আবার ‘আইনশৃঙ্খলা’ বিষয়ে একই ফিচার রয়েছে দুটি। এসব সাইটের মোবাইল বা লো গ্রাফিক্স ভার্সন নেই বলে কম দামি মোবাইল ও মন্থর গতির ইন্টারনেট থেকে সাইটগুলো ব্রাউজ করা কষ্টসাধ্য।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও লেখক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লেখালেখি এবং গবেষণার জন্য নানা বই-পত্রের পাশাপাশি অনলাইন তথ্যের ওপর নির্ভর করেন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘সরকারি উদ্যোগে এ ধরনের সাইট নির্মাণ অবশ্যই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এটি বাংলা ভাষায় জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চা বাড়াচ্ছে। জাতীয় তথ্য বাতায়ন ও জেলা তথ্য বাতায়ন গতিশীল করেছে অবাধ তথ্য প্রবাহকে। সবচেয়ে বড় কথা, এতে স্বল্প পরিসরে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো ভুল তথ্য দেওয়া হয়নি।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখন দরকার ওয়েবসাইটগুলো প্রয়োজনীয় উন্নয়ন এবং এর বিষয়বস্তুর উৎকর্ষতা বৃদ্ধি। প্রায়ই দেখা যায়, আমাদের দেশে একটি কাজ শুরু হলে পরে সেটিকে এগিয়ে নেওয়া হয় না। আমি আশা করব, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সরকার এ ধরনের তথ্য সেবা অব্যাহত রাখবে। তথ্য-প্রযুক্তি যেন সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে সুলভে পৌঁছে, সে জন্য নেবে জরুরি সব উদ্যোগ।’

প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক মাসকাওয়াথ আহসান বলেন, ‘জাতীয় তথ্য বাতায়নে জেলাভিত্তিক যে ওয়েবসাইট চালু হয়েছে, তা নাগরিককে অধিকাংশের মাতৃভাষা বাংলায় রাষ্ট্রীয় সেবা প্রদানে সহায়তা করছে। তবে ওয়েবসাইট ইন্টারনেট স্পিডের সঙ্গে সম্পর্কিত। সে ক্ষেত্রে এই ওয়েবসাইটে রঙিন ছবির ব্যবহার কমানো জরুরি। এ ক্ষেত্রে চিত্রের চেয়ে তথ্যের ওপর জোর দেওয়াই বাঞ্ছনীয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘জেলা বাতায়নগুলোর তথ্য-সংবাদও নিয়মিত হালনাগাদ করা আবশ্যক। অন্যথায় তা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর ভবিষ্যতে এই সাইট যদি ই-গভর্ন্যান্সে অবদান রাখতে পারে, তবেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাজ হয়ে উঠবে অর্থবহ।’


- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/07/49627#sthash.QdDfaKGv.dpuf