Monday, February 3, 2014

একুশের সংবাদ: বাংলার গৌরব ব্লগ, ব্লগাজিন ই-ম্যাগে



যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবিতে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগ গণবিস্ফোরণের পর ‘ব্লগ’, ‘ফেসবুক’, মাইক্রো ব্লগ ‘টুইটার’ ইত্যাদি এখন খুব পরিচিত শব্দ। এর মধ্যে ‘ব্লগ’ কথাটিই সবচেয়ে এগিয়ে। মতান্তরে, সামাজিক গণযোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকও একটি বড় মাপের ব্লগ। আরব বসন্তের পর প্রজন্ম শাহবাগ আরেকবার বিশ্ববাসীকে জানান দিয়ে গেছে ব্লগের অন্তর্নিহিত শক্তি তথা প্রযুক্তির উৎকর্ষে বাংলা ব্লগের অমিত সম্ভাবনা। আন্তর্জাতিক বর্ণ সংকেতায়ন বা ইউনিকোডে বাংলা ভাষা যুক্ত হওয়ার পর এই ভাষায় ওয়েবসাইট নির্মাণের পাশাপাশি এখন দ্রুত ভাষার গৌরব ছড়িয়ে পড়েছে ব্লগ, ব্লগাজিন ও ইলেকট্রনিক-ম্যাগাজিন বা ই-ম্যাগে।

ব্লগ, ব্লগাজিন ও অনলাইনপত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা এই যে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই যখন তখন মোবাইল ফোন, নোট প্যাড, নোটবুক, ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ কম্পিউটার টিপে এসব ওয়েবসাইটে লেখা পড়া যায়। এ জন্য দোকানে গিয়ে পত্র-পত্রিকা কেনার প্রয়োজন নেই। পাশাপাশি যে কেউই সেখানে লিখে ফেলতে পারে পছন্দসই লেখা। এ জন্য পেশাদার লেখক হওয়ারও প্রয়োজন নেই। প্রিন্ট মিডিয়ার সঙ্গে এসব মাধ্যমের আরেকটি বড় পার্থক্য হচ্ছে, বিকল্প এই গণযোগাযোগমাধ্যমগুলোতে কোনো লেখা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই পাঠক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় লেখাটির নিচে মন্তব্যের ঘরে। সেখানেও চলে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, প্রশংসা, এমনকি নিন্দাও। আবার একটি লেখার বিতর্ক জন্ম দেয় আরো অনেক চিন্তাশীল লেখারও।


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ‘ওয়েবলগ’ কথাটি থেকে ‘ব্লগ’ কথাটির জন্ম। ১৯৯৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রথম এর সূচনা করেন জর্ন বার্গার নামের এক আমেরিকান। আদি ব্লগারদের তিনি একজন, প্রথম দিকের ব্লগ সাইটের উদ্যোক্তা তো বটেই। ১৯৯৯ সালের এপ্রিল-মে মাসের দিকে পিটার নামের একজন ‘ওয়েবলগ’কে আরো সহজ করে ‘উই ব্লগ’ কথাটি ব্যবহার করেন। সেখান থেকে জনপ্রিয়তা পায় ‘ব্লগ’ শব্দটি। শেষ পর্যন্ত এটিই হয়ে উঠেছে তরুণ প্রজন্মের কণ্ঠস্বর, প্রথাবিরোধী মত প্রকাশের ফোরাম। বিশ্বব্যাপী নানা ভাষায় ছড়িয়ে পড়েছে স্বেচ্ছাশ্রমের এই আয়োজন।

অন্যদের তুলনায় আমাদের দেশে ইন্টারনেট সহজলভ্য হয়েছে মাত্র সেদিন। সেই তুলনায় বছর আটেকের পথ চলায় বাংলা ব্লগে ঘটেছে উল্লম্ফন। ‘বাঁধ ভাঙার আওয়াজ’ স্লোগান নিয়ে ২০০৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রথম যাত্রা শুরু করে বাংলা ব্লগ সামহয়্যার ইনব্লগ ডটনেট। এটিই এখন বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় ব্লগ, এর নিবন্ধিত সদস্যসংখ্যা অর্ধসহস্রাধিক। এরপর তৈরি হয়েছে সচলায়তন ডটকম, আমারব্লগ ডটকম, নির্মাণব্লগ ডটকম, মুক্তমনা ডটকম, নাগরিকব্লগ ডটকম, উন্মোচন ডটনেট ইত্যাদি। প্রতিটি ব্লগ সাইটের রয়েছে নিজস্ব নীতিমালা ও মেজাজ। এসব নীতিমালা মেনে ব্লগাররা সেখানে লেখালেখি করে, বিনিময় করে নিজস্ব ভাবনা। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে ব্লগাররা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর পাশাপাশি সমবেত হয় একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস বা বিজয় দিবসে। আবার দুস্থ মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন অথবা বন্যা, খরা, শীত উপদ্রুত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিতে চাঁদা সংগ্রহ করে ব্লগাররা ঝাঁপিয়ে পড়ে। সবশেষ রানা প্লাজার মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়ই ব্লগাররা স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে তৈরি করেছে অনন্য উদাহরণ। এ ছাড়া বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা, নিউজ পোর্টাল, উন্নয়ন সংস্থারও রয়েছে নিজস্ব ভাবধারার ব্লগ সাইট।

বাংলা ব্লগের পাশাপাশি ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বাংলা ভাষায় অনলাইনপত্র বা ইলেকট্রনিক ম্যাগাজিন সংক্ষেপে ই-ম্যাগ। আবার একই সঙ্গে ব্লগ ও ই-ম্যাগের বৈশিষ্ট্য নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ব্লগাজিন। বিজ্ঞান, দর্শনসহ গুরুতর বিষয় নিয়ে প্রায় এক দশক আগে তৈরি হয় ই-ম্যাগ মুক্তমনা ডটকম। পাঠক সম্পৃক্ততা বাড়াতে বছর সাতেক আগে এই সাইটকে ব্লগে রূপান্তর করার পর এটি এখন পরিণত হয়েছে প্রধান সারির বাংলা ব্লগে। ওপার বাংলার এক দশকের পুরনো ই-ম্যাগ গুরুচণ্ডালী ডটকম গত বছর রূপান্তরিত হয়েছে ব্লগাজিনে। এ ছাড়া মেঘবার্তা ডটইনফো, মঙ্গলধ্বনি ডটনেট, সাপলুডু ডটনেট নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে সমান জনপ্রিয়। সাপলুডু ডটকমের সাইটে সৃজনশীল লেখালেখির পাশাপাশি রয়েছে ভিডিও ফুটেজ, অডিও সংগীত, ফটো ফিচার ইত্যাদি।

ব্লগ, ব্লগাজিন ও ই-ম্যাগে বাংলা ভাষার প্রসার বৃদ্ধি প্রসঙ্গে ইউনিভার্সিটি অফ আলাবামা অ্যাট বার্মিংহামের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রাগিব হাসান এই প্রতিবেদককে বলেন, গত কয়েক বছরে ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির সর্বত্র বাংলা ভাষার ব্যাপক প্রচলন ঘটেছে। ইন্টারনেটে বাংলা কন্টেন্ট, ওয়েবসাইট এসব এখন প্রচুর। বছর পাঁচেক আগে যেমন গুটিকয়েক সাইট আর উইকিপিডিয়া ছাড়া তেমন বাংলা কন্টেন্ট ছিল না, এখন চিত্রটা পাল্টে গেছে পুরাপুরি।


ব্লগার রাগিব হাসান আরো বলেন, ‘খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে বাংলা ব্লগ, ব্লগাজিন ও ই-ম্যাগ। আর মোবাইল ফোন, ফেসবুক, সর্বত্র বাংলায় সবাই আজ লেখেন, পড়েন, প্রকাশ করেন মনের আবেগ-অনুভূতি। শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে শিক্ষক ডটকম, খান একাডেমি বাংলার মতো সাইট এসে এই ভাষাতেই সারা বিশ্বের সব জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছে। আশা করি, ভবিষ্যতের দিনগুলাতেও এভাবেই এগিয়ে যাবে আমাদের মায়ের ভাষা বাংলা।’
ওপার বাংলার ব্লগাজিন গুরুচণ্ডালী ডটকমের অন্যতম সম্পাদক ঈপ্সিতা পাল এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘গুরুচণ্ডালী আসলে একটি নিখিল বিশ্ব বাঙালিদের ইন্টারনেট ঠেক। আপনি এখানে বসে রান্নাবান্না বা অফিসের কাজের ফাঁকে বসে আড্ডাও দিতে পারেন, মতামত, তর্ক-বিতর্ক, এমনকি গান বা সিনেমার ফাইলের লিংকও আদান-প্রদান করতে পারেন। তার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে, বিভিন্ন সময়ে লেখা কলাম, প্রবন্ধ, ধারাবাহিক বা গল্প-কবিতাও পড়তে পারেন। এসবের মধ্যে কোনো কোনো লেখার লেখক আপনি নিজেও হতে পারেন।’
তিনি বলেন, ‘গুরুচণ্ডালীতে আছে মুখ্যত দুই ধরনের বিভাগ। একটি মডারেটেড (ই-ম্যাগ), যেখানে বাছাই করা কিছু লেখা তুলে রাখা হয়। আরেকটি আনমডারেটেড (ব্লগ)। ওটি চলে সম্পূর্ণভাবে আপনার খেয়ালখুশিমতো। যা লিখবেন, তা-ই প্রকাশিত হবে মুহূর্তের মধ্যে।’
ই-ম্যাগ সাপলুডু ডটকমের সম্পাদক মোল্লা সাগর বলেন, ‘অনলাইন এমন একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যা ধীরে ধীরে অন্য সব মাধ্যমকে গিলে ফেলছে। এই ভাবনা থেকে স্বাধীন মতপ্রকাশের মাধ্যম সাপলুডু ডটকমে গত চার বছরে আমরা একে একে যুক্ত করেছি অডিও সংগীত, সাক্ষাৎকার, হাস্য কৌতুক, ভিডিও ফুটেজ, ফটো, ফটো ফিচার ইত্যাদি। ক্রমেই বাড়ছে এর পাঠক ও উৎকর্ষতা।’
__
মূল প্রতিবেদনটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রথম পাতায় ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ এ প্রকাশিত।
- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/03/48076#sthash.fOPcB9Ai.dpuf