Friday, November 9, 2007

এমএন লারমা: একটি ব্যক্তিগত মূল্যায়ন




এক. পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ও এর সাবেক গেরিলা দল শান্তিবাহিনীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্দ্র নারায়ন (এমএন) লারমা বলেছিলেন, নেতৃত্বের মৃত্যূ আছে, আদর্শের মৃত্যূ নেই। তীক্ষè দূরদৃষ্টির এই মহান দেশপ্রেমিক নেতার এই কথাটি যে আক্ষরিক অর্থেই কতোটা সত্যি, তা বোঝা যায়, তার মৃত্যূর পরেও জনসংহতি সমিতি তথা শান্তি বাহিনীর আদর্শিক অবস্থানের দৃঢ়তা দেখে।
বাংলাদেশ নামক বাংলা ভাষাভাষীর রাষ্ট্রর জন্মলগ্নেই এমএন লারমা সেই ’৭৩ সালেই বুঝেছিলেন, আঞ্চলিক শায়ত্বশাসন ছাড়া ভাষাগত সংখ্যালঘু পাহাড়ি আদিবাসীর মুক্তি নেই। তাই তিনি স্বতন্ত্র সাংসদ ও জনসংহতি সমিতির আহ্বায়ক হিসেবে সংসদ অধিবেশনে তুলে ধরেছিলেন পাঁচ দফা দাবি নামা। এগুলো হচ্ছে:

... “ক. আমরা গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সমেত পৃথক অঞ্চল হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পেতে চাই। খ. আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের অধিকার থাকবে, এ রকম শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন চাই। গ. আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব সংরক্ষিত হবে, এমন শাসন ব্যবস্থা আমরা পেতে চাই। ঘ. আমাদের জমি স্বত্ব Ñ জুম চাষের জমি ও কর্ষণ যোগ্য সমতল জমির স্বত্ব সংরক্ষিত হয়, এমন শাস ব্যবস্থা আমরা পেতে চাই। ঙ. বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল হতে এসে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে যেনো কেহ বসতি স্থাপন করতে না পারে, তজ্জন্য শাসনতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার প্রবর্তন চাই।”...



জুমঘর, ফিলিপ গাইন, সেড।
এই সব দাবিনামার স্বপক্ষে এমএন লারমা তাঁর সংসদের ভাষণে বলেছিলেন:

 “...আমাদের দাবি ন্যায় সঙ্গত দাবি। বছরকে বছরকে ধরে ইহা একটি অবহেলিত শাসিত অঞ্চল ছিলো। এখন আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ পার্বত্য চট্টগ্রামকে পৃথক শাসিত অঞ্চল, অর্থাৎ আঞ্চলিক স্বায়ত্ব শাসিত অঞ্চলে বাস্তবে পেতে চাই।”...

কিন্তু এমএন লারমার দাবি সে সময় চরম অবজ্ঞা করে সরকার।

দুই. এমএন লারমাই বাংলাদেশে প্রথম পাহাড়ি আদিবাসী গোষ্ঠিকে সশস্ত্র করে তাঁদের মুক্তির পথ দেখান। তিনিই প্রথম গেরিলা যুদ্ধকে সঠিকভাবে এ দেশের প্রেক্ষাপটে সূত্রায়ন, নেতৃত্বদান ও পরিচালিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।


সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন গেরিলা দল শান্তিবাহিনী, ৫ মে, ১৯৯৪
চরম দেশপ্রেম ও আতœত্যাগ থাকা স্বত্বেও, গেরিলা যুদ্ধের রণনীতি ও রণকৌশলকে ৭০ দশকের চীনাপন্থী বিপ্লবীরা সেই অর্থে সঠিকভাবে সূত্রাবদ্ধ, নেতৃত্বদান ও পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছিলেন। এ সব কারণে সাধারণ জনগণের ক্ষোভকে বিপ্লবী চেতনায় পরিনত করতে না পেরে তারা শেষ পর্যন্ত হয়ে পড়ে ছিলেন জনবিচ্ছিন্ন গোষ্ঠি বিপ্লবীতে।
তিন. লক্ষ্যনীয় সংসদ অধিবেশনে উত্থাপিত এমএন লারমার ওই পাঁচ দফাই আরো পরে সংশোধিত ও পরিমার্জিত আকারে জনসংহতি সমিতির পাঁচ দফায় পরিনত হয়। এই সংশোধিত পাঁচ দফার ভিত্তিতেই এমএন লারমার মৃত্যূর (১০ নভেম্বর, ১৯৮৩) পরেও অনুজ জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমার নেতৃত্বে শান্তিবাহিনী গেরিলা যুদ্ধ অব্যহত রাখে।

একই সঙ্গে শান্তিবাহিনীর মূল দল জনসংহতি সমিতি সরকারের সঙ্গে আলোচনার পথও খোলা রেখেছিলো; যার সূত্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিলো এমএন লারমার জীবন দশাতেই।




ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি, ২ ডিসেম্বর, ১৯৯৭
শান্তিবাহিনীর প্রায় দুই দশকের রক্তক্ষয়ী বন্দুক যুদ্ধ আর পাহাড়ি - বাঙালির রক্তের মধ্য দিয়ে অবশেষে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক পার্বত্য শান্তিচুক্তি। এই শান্তিচুক্তিরও মূল কথা, পাহাড়ে সীমিত আকারে হলেও আঞ্চলিক শাসত্ব শাসন প্রতিষ্ঠা করা। তবে ভূমি সমস্যার সমাধানসহ শান্তিচুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো এখনো বাস্তয়ন না হওয়ায় পাহাড়ি আদিবাসী জীবনের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তনই আসেনি, সেটি অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ।

চার. বৃহত্তর বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রবল জোয়ারের বিপরীতে এমএন লারমাই প্রথম জুম্ম (পাহাড়ি) জাতীয়বাদী চেতনায় পাহাড়ের ১৩টি ক্ষুদ্র জাতীস্বত্বাকে সংগঠিত করেছিলেন; যাদের ব্রিটিশ ও পাকিস্তান সরকার তো মানুষই মনে করেনি, ‘উপজাতি’ বানিয়ে রেখেছিলো। আর স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু তো তাদের বাঙালিই হয়ে যেতে বলেছিলেন!

এ কারণে পাহাড়ি নেতা এমএন লারমা সত্যিকার অর্থেই জুম্ম জাতীয়তাবাদের অগ্রদূত।
পাঁচ. পরিশিষ্ট: সংবাদপত্রের খবরে এমএন লারমার জীবন, সংগ্রাম ও মৃত্যূ সংবাদ:

এমএন লারমার মৃত্যূর আটদিন পর তাঁর নিহত হওয়ার খবরটি দৈনিক ইত্তেফাক -- ‘শান্তিবাহিনী’ প্রধান মানবেন্দ্র লারমা নিহত -- এই শিরোনামে ১৯৮৩ সালের ১৮ নভেম্বর প্রথম পৃষ্ঠায় দুই কলামে সংবাদ আকারে প্রকাশ করে।


সাবেক গেরিলা নেতা সন্তু লারমা, ২০০৭

প্রকাশিত ওই খবরে বলা হয়:
বাংলাদেশ জাতীয় পরিষদের প্রাক্তন সদস্য, তথাকথিত শান্তিবাহিনীর প্রধান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির চেয়ারম্যান মি: মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা নিহত হইয়াছেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়া গতকাল (বৃহস্পতিবার) রাত্রে আমাদের রাঙ্গামাটি সংবাদদাতা জানান, মি: লারমা গত ১০ই নভেম্বর সীমান্তের অপর পারে ভারতে ইমারা গ্রামে বাগমারা নামক স্থানে শান্তিবাহিনীর কল্যানপুর ক্যাম্পে প্রতিদ্বন্দ্বী শান্তিবাহিনীর ‘প্রীতি’ গ্র“পের সদস্যদের হামলায় নিহত হইয়াছেন।

বিভক্ত শান্তিবাহিনীর মধ্যে মি: মানবেন্দ্র চীনপন্থী ও ঘাতক প্রীতদলের নেতা প্রীতি চাকমা ভারতপন্থী বলিয়া পরিচিত। মানবেন্দ্র লারমার সহিত তাঁহার বড় ভাইয়ের শ্যালক মনি চাকমা, খাগড়াছড়ি হাই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক অপর্ণা চরম চাকমা, কল্যানময় চাকমা ও লেফটেনেন্ট রিপনসহ শান্তিবাহিনীর আটজন সদস্য ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান। শান্তিবাহিনীর ছয়-সাতজন কেন্দ্রীয় নেতাও এ হামলায় আহত হয়। ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থিত এই ক্যাম্পে শান্তিবাহিনীর কেন্দ্রীয় নেতা সন্তু লারমা, রূপায়ন দেওয়ান, ঊষাতন তালুকদারসহ অন্যান্য নেতার ভাগ্যে কি ঘটিয়াছে, তাহা এখনো জানা যায় নাই। সন্তু লারমাকেই মানবেন্দ্র লারমার পর শীর্ষ নেতা বলিয়া মনে করা হইত।
 
কল্যাণপুর ক্যাম্প অপারেশনের ঘটনা সম্পর্কে জানা গিয়াছে যে, ক্যাপ্টেন এলিনের নেতৃত্বে প্রীতিগ্র“পের আট-দশজনের একটি সুইসাইডাল স্কোয়াড লারমা গ্র“পের শিবিরে সশস্ত্র অভিযান চালায়। প্রীতি কুমার চাকমা বর্তমানে তাহার দলবল লইয়া পানছড়ি এলাকায় লারমা গ্র“পের সদস্যদের খুঁজিয়া বেড়াইতেছে। উল্লেখ্য, গত ১০ই নভেম্বর মতিবান পুলিশ ক্যাম্পের এক মাইল পূর্বে প্রীতি গ্র“প লারমার মামার বাড়িতে অবস্থানরত শান্তিবাহিনীর সদস্যদের উপর আক্রম চালায়। উক্ত আক্রমনে অবশ্য কেহ হতাহত হয় নাই। মি: মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নামে একটি সংগঠন গড়িয়া তোলেন। সাবেক সংসদ সদস্য মি: রোয়াজা ছিলেন উক্ত সংগঠনের সভাপতি এবং মি: লারমা ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। ইতিপূর্বে পাহাড়ি ছাত্র সমিতির মাধ্যমে মানবেন্দ্র লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষত তরুণদের সংগঠিত করেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনে মি: লারমা স্বতন্ত্র প্রার্থী রূপে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিত পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচনেও মি: লারমা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। গণপরিষদে তিনি একটি খসড়া সংবিধান উপস্থাপন করিয়াছিলেন। লারমা সংসদ সদস্য হিসাবে নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিচালনাকালে পাহাড়ি ছাত্র সমিতিসহ তরুণদের সহিত তাহার ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। ১৯৭৪ সালে মি: লারমা জনসংহতি সমিতির একটি সশস্ত্র গ্র“প গঠন করেন, পরে উহা শান্তিবাহিনী রূপে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৭৬ সালে শান্তিবাহিনীর মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। মি: লারমা চীনাপন্থী ও প্রীতি কুমার চাকমা ভারতপন্থী নীতি গ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালে শান্তিবাহিনী সম্পূর্ণ রূপে দ্বিধা-বিভক্ত হয়। এই সময় আতœকলহে শান্তিবাহিনীর শতাধিক সদস্য নিহত হয়। ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বরে, ১৯৮২ সালের আগস্টে এবং ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দুই গ্র“পের মধ্যে বড় ধরণের সংঘর্ষ হয়। মি: মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা ছাত্রাবস্থা হইতেই বামপন্থী রাজনীতির সহিত জড়িত ছিলেন। তাঁহার পিতার নাম চিত্তকিশোর লারমা। তাঁহাদের আদিবাড়ি ছিলো কোতয়ালী থানার মহাপুরম গ্রামে। কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে ওই এলাকা প্লাবিত হওয়ায় তাহারা পানছড়ি এলাকায় চলিয়া যান। মি: লারমার স্ত্রীর নাম পঙ্কজিনী লারমা। তাহার দুই পুত্র রহিয়াছে। কিন্তু তাহাদের নাম জানা যায় নাই। মি: লারমা ১৯৫৮ সালে মেট্রিক পাস করেনএবং ১৯৬০ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ হইতে আইএ এবং ১৯৬৩ সালে বিএ পাস করেন। এ সময় সরকার বিরোধী কার্যকলাপের দায়ে তাহাকে দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু নবীন অপরাধী হিসাবে তাহার দণ্ড হৃাস করিয়া নির্দিষ্ট সময়ে থানায় হাজিরা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এ সময় তিনি দীঘিনালা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এবং পরে বিএড ও এলএলবি পাস করেন।
___
*লেখাটি একই সঙ্গে পাহাড়ের ছোটকাগজ 'মাওরুম' এ প্রকাশিত। ১০ নভেম্বর এমএন লারমার ২৪ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে সকল শহীদ দেশ প্রেমিক বিপ্লবীকে।

No comments:

Post a Comment