Sunday, August 24, 2014

ম্রো নারীর জীবিকার লড়াইয়ে তাঁত

বিপ্লব রহমান, থানচি (বান্দরবান) থেকে ফিরে:
পাহাড়ের ‘ম্রো’ জনগোষ্ঠীর মেয়েরা জুমচাষের পাশাপাশি এই প্রথমবারের মতো বেছে নিয়েছেন ঐহিত্যবাহী তাঁতশিল্পকে। দুর্গম পাহাড়ে জনবসতি বেড়ে যাওয়ায় জুমচাষের জমির সঙ্গে দিন দিন কমে আসছে ফসলের পরিমাণও। তাই বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে তাঁতশিল্পকে বেছে নেওয়ায় এখন ম্রোদের সংসারে এসেছে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, জুমচাষ এবং শিকারই ম্রো জনগোষ্ঠীর বংশপরম্পরায় প্রাচীন পেশা। কিন্তু অনেক বছর ধরে পাহাড়ে বাড়ছে পাহাড়ি-বাঙালি জনবসতি। উপরন্তু রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী, বন বিভাগসহ নানা সরকারি-বেসরকারি সংস্থার ভূমি অধিগ্রহণ। রাবার, চা বাগানসহ বিভিন্ন বনজ ও ফলদ গাছের বাণিজ্যিক চাষ, এমনকি পর্যটনশিল্পও কেড়ে নিচ্ছে বিস্তীর্ণ পাহাড় ও অরণ্যের স্বাধীন জীবন। খাদ্য জোগাতে ঘন ঘন জুমচাষের কারণে পাহাড়গুলো হারাচ্ছে জমির স্বাভাবিক উর্বরতা। আর ক্রমেই কমছে ধান, ভুট্টা, শাকসবজি, ফলমূলসহ সব ধরনের জুম ফসলের পরিমাণ। জনবসতির চাপে প্রাকৃতিক বনাঞ্চলও উজাড় হতে বসেছে বলে শিকার উপযোগী বন্য প্রাণীও হ্রাস পাচ্ছে। নদী, ছড়া ও ঝরনাতেও আগের মতো মাছ, শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়াসহ জলজ প্রাণী মিলছে না। সব মিলিয়ে কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে পাহাড়ের জনজীবন।

বান্দরবান জেলা সদর থেকে ৮৫ কিলোমিটার দূরে পাহাড় ও অরণ্য ঘেরা দুর্গম থানচি এলাকায় সম্প্রতি সরেজমিনে ম্রো তাঁতশিল্পীদের জীবন সংগ্রামের খণ্ডচিত্র চোখে পড়ে। পাইলট প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, উপজেলা বাজারসংলগ্ন ‘হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন’ নামক স্থানীয় একটি বেসরকারি সংস্থার টিনশেডের কার্যালয়ে চারটি জ্যাক-আর্ট তাঁতকলে চলছে ম্রো মেয়েদের কাপড় বয়ন প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটিকে ঘিরেই পাহাড়িরা তাদের হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য তাঁতশিল্পকে উপজীব্য করে চেষ্টা করছে স্বাবলম্বী হতে। ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ নামের আরেকটি সংস্থা এই প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে।


তাঁত প্রশিক্ষক লিজা ত্রিপুরা (৪০) জানান, ২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে কাপড় বুনে বিকল্প কর্মসংস্থান করতে পারছেন শতাধিক ম্রো জুমিয়া মেয়ে। প্রতি ব্যাচে ছয়জন মেয়ে তাঁত প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। প্রথমেই তাঁদের শেখানো হয় চরকায় সুতা কাটা। এরপর সুতায় রং করে শুকিয়ে মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় পাহাড়ি গামছা বোনার। বড় মাপের একেকটি গামছার দাম পড়ে ১২০ টাকা। প্রতিটি গামছায় লাভ থাকে ৩০ টাকা। একেকজন পাহাড়ি মেয়ে দিনে পাঁচ-ছয়টি গামছা বুনতে পারেন।

ক্যাসি থোয়াই মারমা নামের আরেক যুবক প্রশিক্ষক জানান, মরিয়মপাড়া ও রুমবেতপাড়া নামের দুটি ম্রো গ্রামে তাঁরা সমিতি গড়ে সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে চারটি তাঁতকল বসিয়েছেন। সেখানে ম্রো মেয়েরা তাঁতে কাপড় বুনে সংসারে এনেছেন কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য। আর পাহাড়ি বুনট ও নকশার কাপড়গুলো সরাসরি পাইকাররা কিনে নিয়ে বান্দরবান সদরসহ পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে তো বটেই, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ঢাকার শো রুমেও বিক্রি করেন। এতে তাঁতশিল্পীদের কাপড় বাজারজাত করার ভোগান্তিতে পড়তে হয় না।

রুমবেতপাড়ার বাসিন্দা থম পয় ম্রো (১৬) নামের কিশোরী ভাঙা বাংলায় কালের কণ্ঠকে বলে, ‘আগে আমরা বাবা-মায়ের সঙ্গে প্রতিদিন জুমচাষে যেতাম। কিন্তু জুমচাষে আগের মতো ফসল হচ্ছে না বলে সবার ঘরে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। এখন গ্রামে বসেই তাঁতের কাজ করি। এতে সংসারে কিছুটা বাড়তি আয় হচ্ছে।’ একই গ্রামের আরেক মেয়ে তুম লে ম্রো (১৮) বলেন, ‘প্রথম প্রথম তাঁতের কাজকে পেশা হিসেবে নিতে গ্রামের মেয়েরা কেউ আগ্রহী হননি। কিন্তু এক পরিবারের দেখাদেখি আস্তে আস্তে আশপাশের গ্রামগুলোতেও এখন এ নিয়ে আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে।’ মরিয়মপাড়ার বাসিন্দা পারি ম্রো (১৭) বলে, ‘তাঁতের কাজ একবার শিখে গেলে খুব দ্রুত দক্ষতা তৈরি হয়। তখন আমরা অন্য মেয়েদেরও প্রশিক্ষণ দিতে পারি।’ ওই গ্রামের লং প্রুম ম্রো (১৮) বলেন, ‘আমরা কখনো ভাবিনি, তাঁত বুনে সংসারে আয় হতে পারে। কিন্তু এটিই এখন বাস্তব। আর বাজারজাত করার দুশ্চিন্তাও আমাদের নেই।’


- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2014/08/24/120447#sthash.Mg4n10Ao.dpuf