Monday, February 13, 2012

শিরোনামহীন

 
আপনাকে নিয়ে আমি কী লিখতে পারি? কী লেখা উচিৎ? আপনাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে টিভিতে দেখা সাগর-রুনি সাংবাদিক দম্পতি হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা আমার চোখের সামনে একে একে সিনেমার স্লাইডের মতো ভেসে উঠছে। কম্পিউটার-কি বোর্ড স্লথ থেকে স্লথতর হয়ে আসছে।...
সাগর সারোয়ার, প্রিয় সাগর, বরং আমি বলতে পারি, ক্ষুদে সাংবাদিকতারকালে পাহাড় যাত্রায় আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় সেই ১৯৯৬ সালের মধ্যভাগের কোনো এক দুপুরে। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ নেতা সঞ্জয় চাকমার ঢাবির জগন্নাথ হলের (দক্ষিণ বাড়ি) ৩২০ নম্বর কক্ষ থেকে আলাপচারিতা হয়। পরে পাহাড়ি ছাত্রদের আহ্বানে আমরা বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়েছিলাম কল্পনা চাকমার সন্ধানে।...

আমরা ঢাকায় ফিরে সরেজমিন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করি। আপনি ভোরের কাগজে, আমি আজকের কাগজে। আমাদের বেতন তখন তিন হাজার+ মাত্র। ...

সেই থেকে শুরু। এরপর আমরা দুজনে একাধীকবার পাহাড়ি শরণার্থীদের ওপর সরেজমিন প্রতিবেদন করতে ত্রিপুরা যাত্রা করবো। পরে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরকালে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে জনসংহতি সমিতির রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন 'মেঘনা'য় নিয়মিত ভীড় করবো। আপনি তথন চাকরি বদল করে সংবাদে, আমি ভোরের কাগজে।...

কি আশ্চর্য! একদিন সংবাদের পাতায় দেখবো আপনারই লেখা সংবাদ নেপথ্য কথা: 'মেঘনা পাড়ের সাংবাদিক'! আর তাতে এই অধমের নামও উঠে আসবে বারবার।

এরপর গেরিলা গ্রুপ শান্তিবাহিনীর অস্ত্র সমর্পন, শরণার্থী প্রত্যাবাসন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন, আঞ্চলিক পরিষদের যাত্রা, চুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ নামক নাবালক বিপ্লবীদের গ্রুপ গঠন এবং তিন বিদেশী অপহরণ-- পাহাড়ের ওপর একের পর এক শীর্ষ প্রতিবেদন করতে করতে আমরা ক্রমেই বড়ো হতে থাকবো, চলবে ইতিবাচক পেশাদারি প্রতিযোগিতা। মাঝে আপনি দৈনিক যুগান্তর হয়ে যোগ দেবেন ইত্তেফাকে, আমি তখন যুগান্তরে।

একদিন প্রেসক্লাবে পরিচয় করিয়ে দেবেন সাবেক সংবাদের প্রদায়ক ও তখন আপনার প্রেমিকা রুনি'র সঙ্গে। মেয়েটি সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর আমি আপনাকে কুমন্ত্রণা দিয়ে নির্মলেন্দু গুন উদ্ধৃত করে বলবো, ওসব বিয়ে-টিয়ের কথা ছাড়ুন তো! "বিবাহিত পুরুষের আর কিছু নেই, যত্রতত্র স্ত্রী সঙ্গম ছাড়া!"...

পরে এই নিয়ে রুনি আমাকে এক চোট ঝাড়বে; আমি হা হা হা করে হেসে বলবো, আরে! ওটা তো একটা দুষ্টুমী ছিলো! সাগর একে সিরিয়াসলি নিয়েছে নাকি?...

বিয়ের পর কোনো একদিন হুট করেই আপনার ইন্দিরা রোডের বাসাতেও ঢুঁ মেরে থাকবো। নতুন সংসারে আপনি বিপ্লবদা'কে কোথায় বসাবেন, এ নিয়ে খানিকটা অস্থির হবেন। হাতল ভাঙা চায়ের কাপে আয়েশ করে চুমুক দিয়ে আমি পূর্বোক্ত ঘটনাটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবো, নাহ! বিয়ে জিনিষটা খুব একটা খারাপ নয় দেখছি!...

এরপর আমাদের গতি বাড়ে। রুনি এটিএন বাংলায় সাংবাদিকতা শুরু করে। আপনি ছোট্ট বাবুসোনা 'মেঘ'কে রেখেই পাড়ি জমান বার্লিনে ডয়েচে ভেলে'তে। আমি তখন বিডিনিউজ টোয়েন্টফোর-এ। বৈদ্যুতিক ও আন্তর্জাল সাংবাদিকতার দূরত্বে এই প্রথম আমাদের যুগল সর্ম্পকে ছেদ পড়ে বহু বছর পর।...ফেস টু ফেস আর দেখা হয় না। তবে ফেসবুকে যোগসূত্র রয়ে যায় ঠিকই।

২০০৯ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় আমার প্রথম বই 'রিপোর্টারের ডায়েরি: পাহাড়ের পথে পথে'। পরের বছর আন্তর্জালে বইটি মুক্ত হলে আপনি পড়ে ফেসবুকে উচ্ছসিত প্রশংসা করেন। মাঝে মাঝে অ্যাসাইনমেন্টে রুনি'র সঙ্গে দেখা হয়। প্রতিবারই আমি মাথা নেড়ে বলি একই কথা, বউ-বাচ্চা ফেলে সাগরের বিদেশে যাওয়া-- একদম উচিৎ হয়নি! রুনি ম্লান হাসেন।...

পরে হঠাৎ সাগরের দেশে ফেরা, টেলিফোন খুচরো সংলাপ, সামান্য কুশল বিনিময়, ওর মাছরাঙা টিভি'তে যোগদান। মাঝে এমএন লারমাকে নিয়ে গত বইমেলায় ওর লেখা উপন্যাস প্রকাশ। স্বীকার করে বলি, এমএন লারমার মতো একজন বড়ো মাপের গেরিলা নেতাকে নিয়ে লেখা ‘কর্নেলকে আমি মনে রেখেছি’ শিরোনাম পছন্দ না হওয়ায়, অপঠিত ওই বইটি নিয়ে আমি একহাত নেই ওর ওপর। ফেসবুক স্যাটাসে একটি তীর্যক মন্তব্যও বোধহয় ঠুকে দেই! তবু অটোগ্রাফসহ বইটির একটি কপি সংগ্রহের আকাঙ্খা করি। সেটিও আর যন্ত্র জীবনে বাস্তবতা পায় না।...

আবারো জীবন চলে জীবনের গতিতে। এরই মধ্যে হঠাৎ সকালে ওই যুগল খুনের খবর। একের পর এক টেলিফোন বাজতে থাকে। পাহাড়ি বন্ধুরা জানতে চান কেনো? কে? কারা?... আমি বাস্পরূদ্ধ স্বরে বলতে পারি না কিছুই। বার বার আমার জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে আসে। টিভি স্ক্রিন ঝাপসা হতে থাকে। যদিও জানি, সেই অমোঘ সত্য: মৃত‌্যুতেই থেমে যায় না সব জীবন!...

__
ছবি: ফেসবুকের পারিবারিক অ্যালবাম থেকে সংগৃহিত।