Sunday, March 9, 2008

মেথর পট্টিতে পানপর্ব...



চট্টগ্রামের খ্যাতনামা সাংবাদিক প্রদীপ খাস্তগীর অনেকদিন ঢাকায় অবসর জীবন কাটাচ্ছেন। কাল সন্ধ্যায় আমি তাকে ধরে বসি, দাদা, আপনার সাংবাদিকতা জীবনের গল্প শুনবো। বিশেষ করে পাহাড়ের সাংবাদিকতার কিছু গল্প শুনতে চাই।
প্রদীপ দা বলেন, চোলাই খেতে আপত্তি না থাকলে আমার সাথে এক জায়গায় চলেন। পান করতে করতে আলাপ হবে।

আমি এক কথায় রাজী। পান বা আহার নিয়ে আমার কোনো সংস্কার নেই--আসলে আমি সর্বভূক। শুধু পানের দ্রব্যটিতে কোনো ভেজাল না থাকলেই হলো। আর সঙ্গী ও পরিবেশ -- দুইই মনের মতো হওয়া চাই।

আমার পানের মাস্টার উত্তম দা বলতেন, বিপ্লব, যেখানে সেখানে যারতার সঙ্গে ভাত খেও না, মদ খেও না। ...সেটাকেই এতোদিন গুরুবাক্য জেনে এসেছি।

প্রায় কৈশরে উত্তম দার সঙ্গে কারওয়ান বাজার রেলওয়ে বস্তির পাশে মৃত এক রেল লাইনের ওপর বসে প্রথম চোলাই বাংলা টানি। ডাবের জল মেশানো ছিলো তাতে। হঠাৎ রাতের আঁধার চিরে একেবারে এক গজ দূরত্বে গমগম করতে করতে ছুটে যায় একটি মেইল ট্রেন! আহা, সে কি রোমান্স! ...
তাই প্রদীপ দা যখন বলেন, আমাদের চোলাই পর্ব হবে গুপিবাগ মেথর পট্টিতে, তখন তা নিয়ে নাক সিঁটকাবো, এমন মানুষ আমি নই।

*
গুপিবাগ মেথর পট্টিটি দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। বড় একটি লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে গিয়ে দেখি ছোট্ট একটি উঠোন ঘিরে নীচু নীচু সব একতলা টিন শেডের বাড়ি। উঠোনের এক কোনে শ্রী শ্রী সার্বজনীন দূর্গা পূজা মণ্ডপ। তার সামনে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খেলা করছে। সব কিছু ঝকঝকে-তকতকে, পরিস্কার।...

আমরা এরই একটি ঘরে প্রবেশ করি। গৃহকর্তা আমার চেয়ে বয়সে খানিকটা বড় হবেন। নাম মুকুল (পদবীটা মনে পড়ছে না)। দেড় কামরার বাসাটির একেবারে ভেতরের ঘরে ছোট্ট একটি টেবিল ঘিরে দুটি প্লাস্টিকের চেয়ার। আমরা সেখানে আসন পাতি।

ঘরের একটি বড় অংশ জুড়ে ডাবল সাইজের খাট। সুন্দর করে এককোনে পূজোর ঘট, কালার টিভি, সিডি প্লেয়ার - ইত্যাদি সাজানো। খাটের ওপর কালো মতো একটি বৌ শিশুকে স্তন্যপান করাচ্ছেন। মুকুল বাবু পরিচয় করিয়ে দেন, আমার স্ত্রী।

আরেকটি মায়াবী চোখের বাচ্চা ছেলে আমাদের কাছে ঘুর ঘুর করে। জানতে পারি, সেটি মুকুল দার বড় ছেলে, নাম সাগর। প্রথম দেখায় তাকে পথের পাঁচালির অপু বলে ভ্রম হয়।

আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, সাগর, তুমি স্কুলে পড়ো? ছেলেটি মাথা নাড়ে, না। বাসায় পড়ো? এবারও সে মাথা নাড়ে, না।

বৌদি অশুদ্ধ বাংলায় বলে উঠেন, স্যার, আমরা গরিব মানুষ। ছেইলা - মাইয়াদের লেখা-পড়া করাইতে পারি না!

প্রদীপ দা বলেন, দিদি তুমি চিন্তা করো না। আবার যখন আসবো, তখন সাগরের জন্য আমি কিছু ছবিওয়ালা বর্ণমালার বই নিয়ে আসবো। সাগর অন্তত বাসায় পড়াশুনাটা শুরু করুক। সামনের বছর ওকে স্কুলে ভর্তি করতে হবে। টাকা - পয়সা নিয়ে তোমরা ভেবো না। আমি কিছু কিছু সাহায্য করবো। ...
*

এরমধ্যে গৃহকর্তা মুকুল দা গোল মতো আধা স্বচ্ছ কেরু কোম্পানীর এক বোতল চোলাই আর দুটি ছোট ছোট গ্লাস নিয়ে আসেন। বৌদি কি এক ভাষায় সাগর ছেলেটিকে কিছু আদেশ করেন। সে ছুটে বেরিয়ে যায়।

পর্দা সরিয়ে আরেকটি বউ এসে এক প্লেটে কিছু চালভাজা, আরেকটি প্লেটে কাঁচা পেয়াঁজ মেশানো সেদ্ধ ছোলাবুট রেখে যান।

শুরু হয় আমাদের পান পর্ব।

চোলাইটি মোটেই তেমন কড়া নয়। অনেকটি চাকমাদের এক চোয়ানির মতো স্বাদ। এর কটু গন্ধটিও অবিকল এক চোয়ানির মতো। এক টুকরো লেবু চিপে গ্লাসে ছেড়ে দিলে মদটি থেকে বেশ একটা লেবু লেবু গন্ধ ছড়ায়।

প্রদীপ দার কাছ থেকে জানতে পারি, এই মেথর পট্টিটির পত্তন সেই ব্রিটিশ আমলে। ভারতের কর্নাটক, মাদ্রাজ ও গুজরাট থেকে 'ধাঙর' হিসেবে এই সব মানুষদের এখানে নিয়ে আসা হয় নগর পরিচ্ছন্নতার কাজে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে ধাঙররা সবাই বিভিন্ন সরকারি অফিস - আদালতে 'ক্লিনার ও সুইপার' এর কাজ পান। আর তাদের পোষাকী ভাষা বাংলা হলেও এখনো তারা কোনো রকমে নিজ নিজ ভাষাও ধরে রেখেছেন। যেমন, বৌদি তার ছেলে সাগরকে যে ভাষায় চাল ভাজা ও ছোলাবুট দেওয়ার জন্য পাশের বাসায় খবর দিতে বললেন, সেটি হচ্ছে হিন্দী ভাষা।...

বাইরে থেকে মাঝে মাঝে হট্টগোল, হিন্দী ভাষায় সমবেত গান ভেসে আসে। আর অশ্রাব্য সব খিস্তি খেউড়ে তো আছেই।...

*

আমি প্রদীপ দার কাছ থেকে জানতে চাই, তার পাহাড়ের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা।

তিনি বলে চলেন, জনসংহতি সমিতির সাংসদ এমএন লারমার সঙ্গে আমার আগে থেকেই পরিচয় ছিলো। তিনি সংসদ অধিবেশনে জুম্ম (পাহাড়ি) জনতার সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তুলেছিলেন। তার সেই দাবি প্রত্যাখ্যান হয়। এমন কি উপন্দ্রে লাল চাকমা যখন একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে একই দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাত করেন, তখন বঙ্গবন্ধু তাদের সেই দাবি নামা মুখের ওপর ছুঁড়ে ফেলেছিলেন। তার উক্তি ছিলো, বেশী বাড়াবাড়ি করো না। পার্বত্য চট্টগ্রামে এক কোটি বাঙালি ঢুকিয়ে দেবো।...

...১৯৭৩ সালের আগস্ট মাস। আমি তখন কাজ করছি, চট্টগ্রামের স্থানীয় দৈনিক দেশবাংলায়। একই সঙ্গে আমি দৈনিক গণকন্ঠের চট্টগ্রাম সংবাদদাতা হিসেবেও কাজ করছি। এই সময় এমএন লারমা লোক দিয়ে আমাকে খবর পাঠান, আমি যেনো অমুক তারিখে রাঙামাটির দুর্গম বরকল বাজারে হাজির থাকি। একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর তিনি আমাকে দেবেন।

যথসময়ে বরকল বাজারে হাজির হলে জনসংহতি সমিতির লোকজন আমাকে একটু দূরে পাহাড়িদের একটি ঘরে নিয়ে যায়। সেখানে এমএন লারমা সমিতির নেতাদের নিয়ে সাধারণ সভায় বসেছেন। আমি নিজেও সেই সভায় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পাই। সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, জনসংহতি সমিতি শিগগিরই 'শান্তিবাহিনী' নামে একটি সামরিক শাখা খুলবে। জুম্ম জাতির সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ আঞ্চলিক স্বায়ত্ব শাসন প্রতিষ্ঠায় শান্তিবাহিনী সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করবে। গেরিলা যুদ্ধই হবে পার্টির রণনীতি।

পরে আমি চট্টগ্রাম ফিরে ওই মাসেই দৈনিক দেশ বাংলা ও গণকন্ঠে 'সাংসদ এমএন লারমা গৃহযুদ্ধ চালাইবেন' এমন একটি সংবাদ দেই।

এই খবরটি প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্ষীবাহিনী আমাকে হাত বেঁধে চোখ বেঁধে দেশবাংলার অফিস থেকে তুলে নিয়ে যায়। ঠিক কোথায় জানি না, তারা আমাকে প্রায় ১৫ দিন আটকে রেখেছিলো। জেরার পর জেরা, শাররীক, মানসিক সব ধরণের নির্যাতন চলতে থাকে।...

এদিকে আমার বার্তা সম্পাদক কোথাও আমার কোনো খোঁজ খবর না পেয়ে বিএফইউজে’র (বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন) তখনকার কেন্দ্রীয় নেতা নির্মল সেন ও কামাল লোহানীর কাছে ঢাকায় খবর পাঠান। তারা রক্ষীবাহিনীর বড় কর্তাদের ধরাধরি করে আমকে ছাড়িয়ে আনেন।

*

কি জিজ্ঞেস করতো রক্ষীবাহিনী? আমি জানতে চাই।

প্রদীপ দা বলেন, ওরা আসলে আমাকে ভুল বুঝেছে। ওদের ধারণা ছিলো, আমি বোধহয় কমিউনিস্ট, কি সর্বহারা পার্টির সমর্থক কোনো সাংবাদিক। ভুয়া খবর দিয়ে সরকারকে বিপদে ফেলতে চাইছি। তারা জিজ্ঞসাবাদে জনসংহতির কারা কারা আমাকের সহযোগিতা করেছে, সে তথ্যও চাইছিলো।...কিন্তু আসলে আমি ওই খবরটির মাধ্যমে সরকারকে একটি ম্যাসেজ দিতে চেয়েছিলাম। আর সেটি হচ্ছে, শুধু নকশাল বা সর্বহারা পার্টি নয়, এবার বিদ্রোহের বারুদ জ্বলতে যাচ্ছে পাহাড়ে।

কথায় কথায় আরো গোটা চারেক চোলাই এর বোতল উড়ে যায়। আমরা বাসার দিকে পা বাড়াই।...