Thursday, December 4, 2014

​অদম্য:: প্রতিবন্ধিতা জয় করে চলেছেন আকবর

‘শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আমাকে দমাতে পারেনি। স্কুল-কলেজে পড়তে পারিনি ঠিকই, তবে বাসায় একা একাই পড়েছি। আর শিখেছি কম্পিউটারে জটিল সব গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ। এই কাজে এখন আমি যথেষ্ট পারদর্শী। আরো দক্ষতা অর্জনে নিজেকে তৈরি করছি। ঘরে বসেই অনলাইনে গ্রাফিক্স ডিজাইন করে আয়ও করছি। ইউরোপের বাজারে আমার পণ্য তীব্র প্রতিযোগিতা করে বিক্রি হচ্ছে। এভাবেই প্রতিবন্ধকতার সব বাধা একদিন আমি পেরিয়ে যেতে চাই। জয় করতে চাই পাহাড়সম বাধা।’
হুইল চেয়ারে বসে ল্যাপটপে জরুরি কাজ করার ফাঁকে কথাগুলো বলছিলেন আকবর হোসেন (২৯)। ঢাকার হাতিরপুলে সেন্ট্রাল রোডের বাসায় কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপচারিতায় এই গ্রাফিক্স ডিজাইনার শোনান তাঁর সাফল্যের নেপথ্যের দীর্ঘ সংগ্রামের কথা। 


মাত্র দেড় বছর বয়সে পোলিও আক্রান্ত হন তিনি। আর ম্যালেরিয়ার ভুল চিকিৎসায় সে সময় পুরো শরীরই অসাড় হয়ে যায়। বাবা মোবারক হোসেন তখন ছিলেন নৌবাহিনীর কর্মকর্তা। চাকরির সুবাদে তাঁরা থাকতেন চট্টগ্রামে। অনেক কষ্টে পতেঙ্গার নৌবাহিনী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করান ছেলেকে। এর পরের পথচলাটা বলতে গেলে একাকী। টানা ১৪ বছরের গৃহবন্দি জীবনে আকবর নিজেকে যোগ্য করে তোলার সংগ্রামে নামেন। স্কুল-কলেজে পড়তে পারেননি বলে সেভাবে বন্ধু-বান্ধবও গড়ে ওঠেনি। আর ঘরের বাইরে যাওয়ার সুযোগ হয়নি বলে তখনো তাঁর জগৎ বন্দি ছিল চার দেওয়ালেই।
আকবর বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ায় ভালো ছিলাম। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। ছোট ভাই-বোনদের পড়ালেখা আমিই দেখিয়ে দিতাম। কিন্তু আমার ছেলেবেলায় হুইল চেয়ার এত সহজলভ্য ছিল না। অভিভাবকরা আমাকে কোলে করে ক্লাসে পৌঁছে দিতেন। ষষ্ঠ শ্রেণির স্কুলগুলো হতো দোতলা বা তিন তলায়। সেখানে ছিল নিয়মিত ক্লাস করার বাধ্যবাধকতা। তাই আমার পক্ষে শেষ পর্যন্ত আর স্কুলে ভর্তি হওয়া হয়নি। কিন্তু বাসায় আমি নিজেই দশম শ্রেণির সিলেবাস শেষ করেছি। আর প্রচুর জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যের বই পড়েছি। টেলিভিশন, বই ও সংবাদপত্রই ছিল বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে আমার যোগাযোগের মাধ্যম।’
বাধাজয়ী এই প্রতিবন্ধী বলেন, ‘বছর পাঁচেক আগে আমাদের বাসায় ইন্টারনেট সংযোগসহ একটি ডেস্কটপ কম্পিউটার আনা হয়। আর এটিই আমার কাছে খুলে দেয় সাইবার ওয়ার্ল্ড  নামক অপার বিস্ময়। আমি একের পর এক নেট ব্রাউজ করে ফটোশপে গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ শিখতে থাকি। অনেক সাইটে এ-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ নেই। আর পুরো কাজটি আমি এগিয়ে নিতে থাকি একাই। একসময় খোঁজ পাই আউট সোর্সিং বা আমার তৈরি অনলাইন পণ্য বিক্রির বাজার। আমি বিভিন্ন ওয়েবসাইটের জন্য ইন্টারফেস (প্রচ্ছদ), টেম্পপ্লেট বা থিম (নেপথ্য নকশা) তৈরি করি। এনভাটো ডটকম [envato.com] নামক ক্রিয়েটিভ মার্কেট প্লেসে নিজস্ব গ্রাফিক্স ডিজাইন নিয়ে অংশ নিতে থাকি নিয়মিত। একেকটি পণ্য একবার বিক্রির জন্য কমিশন পেতে থাকি ন্যূনতম ৫০ ভাগ ইউএস ডলার। আর পণ্যটি সারা বিশ্বে যতবার বিক্রি হবে ততবারই আমার আয়ের পাল্লা ভারী হবে। প্রতিবার বিক্রির জন্যই রয়েছে কমিশন। এখন ঘরে বসেই আমি মাসে আয় করছি গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা।’
আকবর বলে চলেন, “শুরুতে আমার বাসার লোকজন জানতেন না এত সব কথা। আমি অনলাইনে নিজে নিজে গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখেছি, আবার এ থেকে আয়ও করছি- এমন খবরে বাবা-মা খানিকটা চমকে গিয়েছিলেন। একই সঙ্গে পরিবারের সবাই হয়েছিলেন ভীষণ খুশি। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলার পর প্রতিনিয়ত অ্যাকাউন্টে প্রচুর টাকা জমা হতে থাকে। আর এ সময় আমি ফেসবুকে খুঁজে পাই প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার আদায়ের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য চেঞ্জ অ্যাডভোকেসি নেক্সাস’ (বি-স্ক্যান)। এর দুজন প্রধান উদ্যোক্তা সাবরিনা সুলতানা ও সালমা মাহবুব আপা আমাকে প্রচুর উৎসাহ দেন। বি-স্ক্যানের মাধ্যমে আমি বেশ কিছু বন্ধু-বান্ধবও পাই। সংগঠনটিতে সক্রিয় হয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ঘরের বাইরে বেরোতে শুরু করি। ক্রমেই আমার সামনে উন্মোচিত হয় বিশাল জগৎ। আর এখন আমি গ্রাফিক্স ডিজাইনে আরো মেধার স্বাক্ষর রাখতে চাই। পেরোতে চাই একজন প্রতিবন্ধী মানুষের সব বাধা।”
আকবর এখন কাজ করছেন ওয়ার্ডপ্রেস থিম নিয়ে। প্রথমদিকে একাই কাজ করলেও এখন অনলাইনে দলবদ্ধভাবে কাজ করেন। কিছুদিন আগেই কপিরাইটসহ একটি গ্রাফিক্স ডিজাইন বিক্রি করে আকবর এক হাজার ৪০০ ইউএস ডলার পর্যন্ত আয় করেছেন! আগ্রহীরা তাঁর কাজগুলো খুঁজে পাবেন [themeforest.net/user/bigpsfan] এবং [facebook.com/bigpsfan] ওয়েব ঠিকানায়।
বি-স্ক্যানের সভাপতি ও তারকা ব্লগার সাবরিনা সুলতানা কালের কণ্ঠকে বলেন, পারিবারিক সহযোগিতার পাশাপাশি সামান্য সুযোগ পেলেই প্রতিবন্ধী মানুষগুলো যোগ্য নাগরিক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারেন। আর আকবর এর অনন্য উদাহরণ। ঘরের বাইরে বেরোনোর সুযোগ তথা যানবাহন সুবিধা পেলে আকবরের মতো অদম্য মেধাবীদের কর্মক্ষেত্র হতে পারে আরো প্রসারিত। প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তিনি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রতিবন্ধীদের প্রতিনিধিত্ব দাবি করেন। পাশাপাশি জাতিসংঘ ঘোষিত ৩ ডিসেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবসের’ বদলে ‘প্রতিবন্ধী মানুষের আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে পালনের দাবি তাঁর।

___
- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2014/12/04/158725#sthash.NFqhH16D.dpuf

​​