Thursday, February 25, 2010

পাহাড়ে কেন এত সহিংসতা?

ন’ সাঙ যেবার এই জাগান ছাড়ি/ইদু আগং মুই জনমান ধরি/এই জাগান রইয়েদে মর মনান জুড়ি…চাকমা গান…এই জায়গা ছেড়ে আমি যাব না/এখানেই জন্ম-জন্মান্তর থেকে আমি আছি/এই জায়গা আমার মন জুড়ে রয়েছে।…
১। কিছুদিন আগে বান্দরবানের দুর্গম নাইক্ষ্যংছড়ির উপজেলা চেয়ারম্যান তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি গর্ব করে নিজ পরিচয় দিয়ে বললেন, আমার বাড়ি চট্টগ্রামে। বেশ কয়েক বছর আগে আমি ব্যবসায়িক কাজে নাইক্ষ্যংছড়িতে এসে আর ফিরে যাইনি। সেখানেই বসতি গড়েছি, বিপুল ভোটে উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছি। এর আগে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানও হয়েছিলাম। ইনশাল্লাহ, আমার এলাকায় আগামী পাঁচ-ছয় বছরে সব কয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি পদে বাঙালিরাই নির্বাচিত হবেন, কোনো পাহাড়ি নন। এলাকায় বাঙালি ভোটারের সংখ্যাও বাড়ছে।

তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল পার্বত্য শান্তিচুক্তির কথা। ত্রিশোর্ধ্ব তোফায়েল আহমেদ জানালেন, এটি তিনি পড়েননি। চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল’ হিসেবে স্বীকার করে নেওয়ার কথাও তাঁর জানা নেই। এমন কথা তিনি বিশ্বাসও করেন না। বললেন, আরে রাখুন আপনার শান্তিচুক্তি! সন্তু লারমার মহাফেজখানাতেই চুক্তির দলিল এখন ইঁদুরে কাটছে। কোনো সরকারই এই চুক্তি এখন আর মানে না!


চট্টগ্রামের সাবেক বাসিন্দা, নাইক্ষ্যংছড়ির বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান কাম সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান তোফায়েল আহমেদ নিজের অজান্তেই বলেছেন পার্বত্য রাজনীতির দিক-দর্শনের গূঢ় কথা। গত সপ্তাহে রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে জায়গা-জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া পাহাড়ি-বাঙালির রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং এর জের ধরে খাগড়াছড়ি সহিংতার কারণ যাঁরাই জানতে চেয়েছেন, তাঁদের বিনীতভাবে বলা হয়েছে ওই জনপ্রতিনিধির বয়ান।


১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, এ-সংক্রান্ত নানা গেজেট ও আইন এবং শান্তিচুক্তিতে উলি্লখিত আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল-চিরচেনা পাহাড়, অরণ্য, ঝরনাধারায় নয়নাভিরাম পার্বত্য চট্টগ্রামে একই দখলদারিত্বের মানসিকতায় দিনের পর দিন দখল বাড়ে। শান্তিচুক্তির আগে ও পরে সেনা বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে পাহাড়ে নতুন বসতিস্থাপনকারী (সেটেলার) বাঙালিদের হিংসার কোপানলে প্রাণ হারান নাম জানা বা অজানা কত শত পাহাড়ি নারী-পুরুষ। জমির দখলকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি সহিংসতায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রক্তের ধারা মিশে যায় কাচালং, চেঙ্গি, শঙ্খ, মাইনি, মাতামুহুরী নদীতে। উন্নয়নের নামে ছয়ের দশকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ বাঁধ নিমেষেই তলিয়ে দেয় প্রায় ৫৪ হাজার একর জমি।


স্বাধীনতার পর ১৯৭২-এর আদি সংবিধানে উপেক্ষিত হয় পাহাড়ের সাংসদ এম এন লারমার ‘আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি’র দাবি। সবুজ ছেলেরা অস্ত্র হাতে ফেরে শান্তিবাহিনী গেরিলা গ্রুপের নামে। আটের দশকে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের পাহাড়কে সামরিকায়ন ও উগ্র জাতীয়তাবাদী বাঙালীকরণের ধারাবাহিকতায় দেশের এক-দশমাংশ পাহাড়ে গড়ে ওঠে ছয়-ছয়টি সেনানিবাস, সাড়ে ৫০০ অস্থায়ী সেনাছাউনি। বিডিআর, ড়্যাব, পুলিশ, আনসার, বনরক্ষীদের শত শত নিবাস ও ছাউনির কথা না হয় বাদই থাক।

৩। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, শান্তিবাহিনীর বিদ্রোহ দমনের সময় ১৯৭৯ থেকে শুরু করে ১৯৮২ সালে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সমতল এলাকা থেকে বাঙালিদের নিয়ে গিয়ে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার ৮৮টি গ্রামে ৩১ হাজার ৬২০ পরিবারের এক লাখ ৩৬ হাজার ২৫৭ জন সেটেলার বাঙালিকে পাহাড়ে অভিবাসিত করা হয় । এ ছাড়া ১৯৮০ থেকে ১৯৮৩ সালের দিকেও সমতল থেকে কয়েক হাজার বাঙালিকে সরকারি উদ্যোগে পাহাড়ে দেওয়া হয় অভিবাসন। ১৯৮৬ সালের দিকে সরকারি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের দেওয়া হয় খাস জমি হিসেবে পাহাড় ও টিলা। এসব সেটেলারের প্রায় সবাই ছিলেন নদীভাঙা এলাকার এবং হতদরিদ্র।


পরে সেনাবাহিনীর সঙ্গে শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র বন্দুকযুদ্ধের কবল থেকে সেটেলারদের সেনাছাউনির আশপাশে গুচ্ছগ্রামে ব্যারাক তৈরি করে দেওয়া হতে থাকে রেশন। তখন থেকেই তালিকাভুক্ত সেটেলাররা সরকারি রেশন হিসেবে পরিবারপ্রতি মাসে পাচ্ছেন ৮৫ কেজি চাল। জানা যায়, গুচ্ছগ্রামবাসীর জন্য সরকার প্রদত্ত খয়রাতি রেশনের মাসিক বরাদ্দ ২২৩০ দশমিক ৫৮৬ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য। এ খাতে প্রতিবছর সরকারের ব্যয় প্রায় ৩৬ কোটি টাকা।



ইতিহাস সাক্ষী, সেনা বাহিনীর নেতৃত্বে শান্তিচুক্তির আগে পাহাড়ে লোগাং, নানিয়ারচর, লংগদু, কাউখালী, বরকল, পানছড়ি, দীঘিনালা গণহত্যা হয়েছে। সেই সময় একের পর এক উজাড় হয়েছে আদিবাসী গ্রাম। ৭০ হাজার আদিবাসী শুধু জীবনটুকু সম্বল করে ত্রিপুরার শরণার্থী শিবিরে কাটিয়েছেন একযুগের গ্লানিময় জীবন। আর বরাবরই প্রতক্ষ্য সেনা মদদে পাহাড়ি গণহত্যা, গণধর্ষণ ও লুটপাটে ধারালো অস্ত্র নিয়ে সরাসরি অংশ নিয়েছেন সেটেলাররাই। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক কল্পনা চাকমার বাঘাইছড়ির নিজ গ্রাম নিউ লাইল্ল্যাঘোনা থেকে অপহৃত ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এরই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা মাত্র।


১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রত্যাগত শরণার্থীদের অধিকাংশই বসতভিটাটুকু বাদে চাষবাসের জমি ফেরত পাননি। উপরন্তু গেরিলা গ্রুপ শান্তিবাহিনীর অবসান হওয়ায় পাহাড়ে চলাচল হয়েছে অবাধ। এ সুযোগে সেখানে গড়ে উঠেছে আরো অসংখ্য নতুন বাঙালি বসতি। জমির দখলকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি বনাম সেটেলার বাঙালিদের দ্বন্দ্ব-সংঘাত তথা পারস্পরিক সন্দেহ-অবিশ্বাস রয়েই গেছে। শুধু গত ১৯-২০ ফেব্রুয়ারি বাঘাইছড়ি ও ২২-২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ির সহিংস ঘটনাই শান্তিচুক্তির পরের প্রথম সংঘাত নয়।


৪। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে এ পর্যন্ত মোট ১১টি সংহিস ঘটনা ঘটেছে পাহাড়ে। পাহাড়ি-বাঙালি সশস্ত্র সংঘাতে আদিবাসী পাহাড়িরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত সাত পাহাড়ি, নিখোঁজ হয়েছেন চার, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১৬ আদিবাসী নারী, পাহাড়ি ও বাঙালির ৮০০রও বেশি ঘরবাড়ি হিংসার লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আহত ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে অসংখ্য।


এর আগে এ বছর ২৫ জানুয়ারি বাঘাইছড়ির সাজেক ইউনিয়নের বাঘাইহাটে নতুন করে বসতিস্থাপনকারী বাঙালিদের সহিংসতার জের ধরে পরদিন সেখানে বাঙালিদের সাতটি বাড়িতে অগি্নসংযোগ করা হয়। হামলার আশঙ্কায় ভাইভাইছড়া, এমএসপাড়া ও হাজাছড়া নামক তিনটি পাহাড়ি গ্রাম জনশূন্য হয়ে পড়ে। ২০০৮ সালের ২০ এপ্রিলও অজ্ঞাত পরিচয় সন্ত্রাসীরা একই এলাকার গঙ্গারাম মুখের বাঘাইহাট নার্সারি এলাকায় সাতটি গ্রামে আগুন দিয়ে ১৩২টি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। এতে ধ্বংস হয় বাঙালিদের ৭৯টি এবং পাহাড়িদের ৫৩টি ঘরবাড়ি। ২০০৬ সালের ৩ এপ্রিল মাইসছড়িতে প্রায় ১০০ পাহাড়ির বাড়িঘর তছনছ ও লুটপাট হয়। ২০০৩ সালের ২৬ আগস্ট মহালছড়িতে সংঘাতে নিহত হন দুই পাহাড়ি, ধর্ষিত ও যৌন হয়রানির শিকার হন ১০ আদিবাসী নারী। আহত হন প্রায় ৫০ জন।


এ ছাড়া ২০০৩ সালের ১৯ এপ্রিল ভুয়াছড়া, ২০০২ সালের ১০ অক্টোবর রাজভিলা, ২০০১ সালের ১৮ মে বোয়ালখালী ও মেরুং; একই বছর ২৫ জুন রামগড়, ১৯৯৯ সালের ১৬ অক্টোবর বাবুছড়া, ১৯৯৯ সালের ৪ এপ্রিল বাঘাইহাটে সহিংসতা হয়েছে। এর মধ্যে বাবুছড়ার সহিংসতায় তিন পাহাড়ি নিহত হন, ধর্ষিত হন এক আদিবাসী নারী।


পাহাড়ের একাধিক সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ি-বাঙালিদের জায়গা-জমির বিরোধ মেটানোর কথা পার্বত্য ভূমি কমিশনের। শান্তিচুক্তির ৫ নম্বর শর্ত অনুযায়ী এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে চেয়ারম্যান করে ২০০১ সালে গঠন করা হয় ৯ সদস্যের পার্বত্য ভূমি কমিশন। কমিটির অন্য সদস্যরা হচ্ছেন : চাকমা, বোমাং ও মং সার্কেল চিফ (রাজা), পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান অথবা তাঁর একজন প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার অথবা একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার এবং বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের তিন চেয়ারম্যান। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ কমিশন আইনি সীমাবদ্ধতা, অর্থ ও লোকবল সংকটের কারণে ৯ বছরে কাজই শুরু করতে পারেনি। দফায় দফায় কমিশনের কাঠামোর রদবদল হয়েছে মাত্র। এক-এগারোর পরে সর্বশেষ বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে গঠিত হয় নতুন ভূমি কমিশন। খাগড়াছড়িতে এর সদর দপ্তর এখনো নির্মাণাধীন। অন্য দুই জেলা_রাঙামাটি ও বান্দরবানে এর সাব-অফিসের তেমন কোনো কার্যক্রম নেই।



৫। পার্বত্য ভূমি কমিশন প্রতিষ্ঠার ৯ বছরেও সক্রিয় না হওয়ায় পাহাড়ে ভূমি সমস্যা জটিল হওয়ার পাশাপাশি সেখানে বেআইনিভাবে ভূমির ইজারা ও বন্দোবস্ত দেওয়ার অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। গত বছর আগস্টেই সংসদীয় স্থায়ী কমিটি পাহাড়ে প্রায় ১২ হাজার একর জমি বেআইনিভাবে ইজারা ও বন্দোবস্ত দেওয়ার ঘটনা শনাক্ত করে। গত সেপ্টেম্বরে বান্দরবানে প্রায় সাড়ে আট হাজার একর এ ধরনের জমির ইজারা ও বন্দোবস্ত বাতিল করা হয়। আদিবাসী পাহাড়িদের এসব জমি সমতল থেকে পাহাড়ে যাওয়া প্রভাবশালী বিভিন্ন বাঙালির নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।


পাহাড়ের শীর্ষ রাজনীতিবিদ, পার্বত্য বিশ্লেষকসহ সংশ্লিষ্ট সবার অভিমত,শান্তিচুক্তির মৌলিক শর্ত বাস্তবায়ন তথা পার্বত্য ভূমি কমিশনকে শক্তিশালীকরার মাধ্যমেই পাহাড়ে জমির বিরোধ নিষ্পত্তির যৌক্তিক সমাধান খুঁজতে হবে। এ লেখকের সঙ্গে আলাপচারিতায় সেসব কথাই বলেন তাঁরা।


ভূমি কমিশনের সদস্য ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা মারমা বলেন, কমিশনের যথাযথ আইনি ক্ষমতা ও লোকবল না থাকায় এটি এখনো পাহাড়ি-বাঙালিদের ভূমির বিরোধ নিষ্পত্তি করতে পারছে না।

ভূমি গবেষক, জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা মঙ্গলকুমারের মতে, ভূমি কমিশন আইনের সঙ্গে শান্তিচুক্তির ১১টি বিরোধাত্নক বিষয় রয়েছে। এর মধ্যে কমিশনের সীমিত কার্যপরিধি ও কমিশন চেয়ারম্যানের একক ক্ষমতা অন্যতম। ভূমি কমিশন সক্রিয় না হওয়ার ফলে পাহাড়ে দিন দিন জমির বিরোধ বাড়ছে। পাহাড়ে নতুন করে বসতি স্থাপনকারী বাঙালিদের সঙ্গে আদিবাসী পাহাড়িদের দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগেই আছে। আটের দশকে সরকারি উদ্যোগে পাহাড়ে বসতিস্থাপনকারী বাঙালি সেটেলারদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সমতল ভূমিতে সন্মানজনক পুনর্বাসন করা যায়। এ-সংক্রান্ত ইউরোপিয়ান কমিশনের আর্থিক সাহায্য করার প্রস্তাবনাটি সরকারের বিবেচনায় আনা উচিত।


মঙ্গলকুমার চাকমা বলেন, শান্তিচুক্তির মৌলিক শর্তসমূহ যথাযথ বাস্তবায়ন করলেই ভূমি কমিশন ও শরণার্থী পুনর্বাসনবিষয়ক টাস্কফোর্স সক্রিয় করা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।


আদিবাসীবিষয়ক গবেষক ও তথ্য কমিশনার অধ্যাপক সাদেকা হালিমের মতে, শান্তিচুক্তির মৌলিক শর্তই হচ্ছে পার্বত্য ভূমি সমস্যার সমাধান। শান্তিচুক্তির এই শর্তটি মেনে ভূমি কমিশনকে কার্যকর করা হচ্ছে না বলে পাহাড়ে জমির বিরোধ বেড়েই চলেছে। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি এবং ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল বলা হলেও নতুন করে বসতি স্থাপনকারী বাঙালিদের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকায় সেখানে পাহাড়িদের সঙ্গে বাঙালিদের জনসংখ্যার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।


বিশিষ্ট আদিবাসী লেখক সঞ্জিব দ্রং বলেন, সরকারের উদাসীনতার কারণে এত বছরেও পাহাড়ে ভূমি কমিশন সক্রিয় হয়নি। ফলে জমিজমার বিরোধকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে নানা অশান্তি লেগেই আছে। শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি ভূমি কমিশন ও আঞ্চলিক পরিষদকে শক্তিশালী করার কথাও বলেন তিনি।


দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রামের আয়তন বাংলাদেশের ১০ ভাগের এক ভাগ। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান — এই তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে বিন্যস্ত পাঁচ হাজার ৯৩ বর্গমাইল এলাকার পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড়ি-বাঙালি মিলিয়ে প্রায় ১৪ লাখ লোক বাস করেন। ১৯৮১ সালে পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড়ির সংখ্যা ছিল ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বাঙালি ৪১ দশমিক ৪ শতাংশ। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, সেখানে ৫১ শতাংশ বাঙালি ও ৪৯ শতাংশ পাহাড়ির বসবাস। সর্বশেষ ২০০১ সালের হিসাবে ৫৯ শতাংশ বাঙালি ও ৪১ শতাংশ পাহাড়ি সেখানকার বাসিন্দা।

ছবি: ১। বাঘাইছড়ির পোড়া ভিটায় সতর্ক সেনা প্রহরা, দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১০, ২। খাগড়াছড়িতে লোগাং গণহত্যার প্রতিবাদ, ১৩ মে, ১৯৯২, সংগ্রহ-লেখক, ৩। বাঘাইছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারের সামনে দেবন্দ্র চাকমার লাশ নিয়ে পাহাড়িদের বিক্ষোভ, দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১০।

আরো পড়ুন: লেখকের ই-বুক: রিপোর্টারের ডায়েরি: পাহাড়ের পথে পথে।