Thursday, December 15, 2011

পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধ: অন্য আলোয় দেখা





[সাবেক চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধকে বহুবছর ধরে বিভ্রান্তির ঘেরাটোপে রাখা হয়েছে। খাটো করে দেখা হয়েছে পাহাড়ি জনগণের মুক্তিযুদ্ধ তথা ১৯৭১ সালে তাদের সব ধরণের চরম আত্নত্যাগের ইতিহাস। একই সঙ্গে সারাদেশে আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের আত্নত্যাগকেও অনেক ক্ষেত্রে অবমূল্যায়ন করার অপপ্রয়াস চালানো হয়। এ কারণে লেখার শিরোনামে 'অন্য আলোয় দেখা' কথাটি যুক্ত করা হয়েছে। বলা ভালো, এটি মুক্তিযুদ্ধের ওপর কোনো গুঢ় গবেষণাকর্ম নয়; এটি নিছকই পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি আলোচনার অবতারণা মাত্র।]


প্রথম পর্বপাহাড়ের হত্যাযজ্ঞ পর্ব: একটি অপ্রকাশিত দলিল১৯৬০ কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে কাপ্তাই জলবিদ্যুত নির্মাণ করা হলে প্রায় এক লাখ পাহাড়ি মানুষ সহায়-সম্বল হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে পড়েন। তাদের অনেকেই প্রধানত ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরামে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পরে ১৯৭২ সালে তখনকার ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ত্রিপুরা রাজার সঙ্গে সাাতে এলে ত্রিপুরার পাহাড়ি শরণার্থীরা আট পৃষ্ঠার পুস্তিকা আকারে তাকে একটি স্মারক লিপি হস্তান্তর করেন। সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ১৯৭১-৭২ সালে পাকিস্তানী বাহিনী, কতিপয় বিপথগামী মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ রাইফেলস, বিডিআর (এখন বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ, বিজিবি) সদস্য কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরস্ত্র পাহাড়ি জনপদে চালানো একাধিক একাধিক হত্যাযজ্ঞ, লুঠতরাজ ও অপারেশনের রোমহর্ষক বর্ণনা দেওয়া হয়।

১৯৭১ সালে তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় যেমন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, তেমনি মং রাজা মং প্র“ সেইন আবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। সে সময় রাজা মং প্র“ সেইন মুক্তিবাহিনীর জন্য নিজ প্রাসাদ উজাড় করে দেন। মুক্তিযোদ্ধারা তার প্রাসাদে থেকেই যুদ্ধ করেছিলেন, বহু সাহায্য পেয়েছিলেন। এছাড়া পাহাড়ি নেতা এমএন লারমা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন। চাকমা রাজার কাকা শ্রী কেকে রায়ও ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক। কিন্তু শুধু সন্দেহের বশে তাকে ত্রিপুরায় আটক করা হয়েছিল। স্মারকলিপিটিতে এসব বিষয়ও তুলে ধরা হয়। এই অধ্যায়টি আমরা পরের পর্বগুলোতে আলোচনা করবো।

এই লেখক ১৯৯৬-৯৭ সালে এপারের পাহাড়ি শরণার্থীদের ওপর সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরির জন্য তথ্য-সাংবাদিকতার পেশাগত কাজে একাধিকবার ত্রিপুরা রাজ্য সফর করেন। সে সময় ত্রিপুরার স্থায়ী বাসিন্দা, স্কুল শিক ও বর্ষিয়ান পাহাড়ি নেতা শ্র“তরঞ্জন (এসআর) খীসা লেখককে দুর্লভ স্মারকলিপির একটি কপি হস্তান্তর করেন। এসআর খীসার ছোট ভাই ভবদত্ত খীসা ছিলেন রাঙামাটির একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক।

প্রসঙ্গত, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে পাহাড়িদের যে প্রতিনিধি দল ওই স্মারকলিপিটি দিয়েছিলেন, তার মধ্যে এসআর খীসা নিজেও ছিলেন। সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিলেও পরে তা আর কখনোই পূরণ হয়নি। দৃশ্যত, তিনি হয়তো এ নিয়ে তখন সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে বিব্রত করতে চাননি। পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের পাশাপাশি চাপা পড়ে গেছে ওই চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন পর্বটিও।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে দেওয়া ইংরেজী স্মারকলিপিটির প্রচ্ছদে লেখা হয়:

MEMORANDUM OF THE TRIBAL PEOPLE OF TRIPURA TO THE PRIME MINISTER OF INDIA.

ON

POLITICAL DEVELOPMENT IN THE CHITTAGONG HILL TRACTS FROM 1947-1972.

ON

Killing, raps, arson and loot committed by the MUKTIBAHINI and the BANGLADESH RIFELS before and the after liberation of Bangladesh. The forceful occupation of Tribal lands by the Muslim of Bangladesh.

ON

Violation of the CHARATER OF HUMAN RIGHTS and the Principals of Secularism

ON

Stoppage of rising the height of the ‘KAPTAI HYDEL PROJECT DAM’ to supply electricity to Tripura and Mizoram.

ON

Humble suggestion put forth by the Tribals of Tripura for implementation in the Chittagong Hill Tracts.


এতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের প্রত্য মদদে ১৯৭১ সালের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দেওয়া হয়। যেখানে দেখা যায় রাজাকার নিধনের নামে চাকমাদের সে সময় স্রেফ জবাই করা হয়েছিল! এতে বলা হয়:

…. During this time Mr. KK Roy, an uncle of Chakma Chief and an Awami League nominee to the provincial Assembly from from Chittagong Hill Tracts crossed into India with an intention of contacting Awami League hierarchy and explaining matters. But he was apprehended and arrested by Tripura police at Subrum on April 22, on the instruction of HT IMAM and B. Rahman, the SP of Chittagong Hill Tracts.

Mr. Imam after crossing into the India became the administrator of the Bangladesh Eastern Zonal office in Tripura. In absolute violation of the principals of secularism he unleashed in India a vicious anti-Chakma campaign. Leading dailies published at random his fabricated stories openly denouncing the Chakma and their chief as Pak-Mizo collaborators. He malicious propaganda incited and encouraged the Mukti Bahini to adopt the inhuman slogan ‘SLAUGHTER THE CHAKMAS’. As a result of this policy hundreds of tribals, mainly Chakmas, have been butchered, their homes burned, their place of religion ransacked, their women raped and their land forcibly occupied…
এরপর স্মারকলিপিতে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয় আওয়ামী লীগ, মুক্তিবাহিনী, বিডিআর নামধারী কতিপয় সন্ত্রাসীরা একের পর এক গণহত্যা, গণধর্ষণ, লুণ্ঠন ও জ্বালাও-পোড়াও অপারেশনের সব নৃশংস ঘটনা।

এর মধ্যে ১৯৭১ এর মে মাসে ক্যাপ্টেন খালেক ও জমাদার খায়রুজ্জামানের নেতৃত্বে রাঙামাটির তবলছড়ি, তনদাং, রামসিরা, দেওয়ানপাড়া এবং রামগড় অপারেশন, ৫ ডিসেম্বর পানছড়ির শীলাছড়ি অপারেশন (৩২ জন নিহত), ১৪ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি অপারেশন (২২জন নিহত), ২১ ডিসেম্বর দীঘিনালার তারাবনিয়া অপারেশন ( নয়জন নিহত) উল্লেখ যোগ্য। ১৯৭২ সালের ফেব্র“য়ারিতে রাঙামাটি থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করা হলে বিডিআর সদস্যরা বিস্তৃর্ণ পাহাড়ে দফায় দফায় অপারেশন চালিয়ে হত্যা, ধর্ষন ও লুঠতরাজ করে। এরমধ্যে ২২ মার্চ ধালিয়া গ্রামে, ২২ ও ২৩ এপ্রিল বরইরাগি বাজারে, ৩০ এপ্রিল মাইচছড়িতে, ৮ মে খাগড়াছড়ির তারাবনিয়া, লোগাং বাজার অপারেশন উল্লেখযোগ্য। ২৯ মার্চ ১৯৭২ সালে প্রায় ২০০ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী রামগড়ের মানিকছড়ি, চিকনপাড়া, সাঙ্গুপাড়া, পাক্কামুড়া ও গোদাতলা গ্রামে একযোগে অপারেশন চালায়। ঘটনার তদন্তের নামে ২ এপ্রিল পুলিশ বাহিনী একই গ্রামগুলোতে আবারো তল্লাসী অভিযান চালায়। …

রাঙামাটি মুক্ত হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতারা রাজকার আখ্যা দিয়ে বহু সংখ্যক পাহাড়ি জনসাধারণকে আটক করে। সে সময় মং রাজা ও সরকারের আদিবাসী উপদেষ্টা প্রু সেইন আটকৃতদের মুক্তি দাবি করে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে টেলিগ্রাম করেন। স্মারকলিপিতে উল্লেখিত টেলিগ্রামটি নিম্নরূপ:

‘VISITED RANGAMATI ON SIXTH INSTANT STOP EXTREMELY AGGRIEVED TO FIND INNOCENT TRIBAL PEOPLE ARRESTED INDISCRIMINATELY AS ALLEGED COLLABORATORS STOP EARNESTLY REQUESTED INSTRUCT CIVIL ADMINISTRATION IMMEDIATE RELEASE OF ALL TRIBALS SO FAR ARRESTED WITHOUT PREJUDICE AND FURTHER ARREST BE CEASED STOP= MONG RAJA AND THE TRIBAL ADVISOR TO BANGLADESH’


ছবি: শহীদ খগেন্দ্র নাথ চাকমা, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লার মুরাদনগরে সার্কেল ইন্সপেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পাকিস্তানী বাহিনীর কর্তৃক নিহত হন, তন্দ্রা চাকমা। ইন্দিরা গান্ধীকে দেওয়া স্মারকলিপির ইমেজ, লেখক।
দ্বিতীয় পর্ব

ত্রিদিব রায়ের ভূমিকা, ১৯৭১লেখার শুরুতেই বিশিষ্ট মুক্তিযুদ্ধ গবেষক অমি রহমান পিয়ালকে উদ্ধৃত করা যাক। এই লেখকের পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি খসড়া নোটে তথ্য ঘাটতি দেখা দেওয়ায় অরপিকে ইমেল করে ১৯৭১ সালে সাবেক চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের ভূমিকাসহ এ সংক্রান্ত মতামত জানাতে অনুরোধ করা হয়েছিল। ওই ইমেইল বার্তার জবাবে তিনি একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে খুব চমৎকার করে তুলে ধরেন পুরো বিষয়। অরপি বলছেন:



অমি রহমান পিয়াল
জুন ২৫, ২০১১ at ৮ : ৫৯ অপরাহ্ণ লিঙ্ক

সুপ্রিয় বিপ্লব রহমান, আপনার মেইল পেয়ে পোস্টটি পড়লাম এবং অনুরোধ রাখতেই আমার বক্তব্য রাখলাম। বিব্রতবোধ করছি এইজন্য যে সে বক্তব্য আপনার পোস্টের বক্তব্য সমর্থন নাও করতে পারে। তার আগে বলে নিচ্ছি যে আমি আরাফাতুর রহমানের লেখাটা পড়িনি। আপনারটা পড়েই আমার যা বলার বলছি। কোনো বাতুলতা নিজগুণে ক্ষমা করবেন।

প্রথমে আসি আদিবাসী রাজাকার প্রসঙ্গে।অবাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলো। পক্ষে এবং বিপক্ষে। এখানে লক্ষণীয় তাদের বসবাসের জায়গাটা সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় সেখানে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং মুক্তিবাহিনী- দুইপক্ষই ছিলো ভীষণভাবে ত্ৎপর। এই পর্যায়ে এসে আদিবাসীরা গোষ্ঠীগতভাবে সিদ্ধান্ত নেয় তারা কোন পক্ষে যাবে। সাওতাল এবং গারোরা সরাসরি পাকিস্তানের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। চাকমারা পক্ষে।(মগরা নিরপেক্ষ অবস্থান নিলেও তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছে আবার পাকিস্তানীদের বার্মায় পালাতেও সাহায্য করেছে।)এটা গোষ্ঠীগত সিদ্ধান্ত, গোষ্ঠী প্রধানের নির্দেশ। এখানে সমর্থন অর্থে বলা হয়েছে। এই সমর্থনের অর্থ ইনটেলিজেন্স, আশ্রয় এবং লোকবল দিয়ে সহায়তা।
 
প্রত্যক্ষ লড়াইয়ে মুক্তিবাহিনীর হয়ে গারোরা লড়েছেন, সাওতালরা লড়েছেন। ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ এবং ইপিআরের সদস্য যেসব আদিবাসী ছিলেন তারা লড়েছেন। এদের মধ্যে মারমা-মুরং-গারো-লুসাই সব গোষ্ঠীই ছিলেন,ছিলেন চাকমারাও। তারা তাদের সম্প্রদায়গত সিদ্ধান্তের বদলে প্রায়োরিটি দিয়েছেন কর্তব্যবোধ এবং ক্যামোরেডরিকে।

চাকমাদের জন্য এই সিদ্ধান্তটা এসেছে রাজা ত্রিদিব রায়ের তরফে।অতিনি গোষ্ঠীপ্রধান। এপ্রিলের শুরুতেই রাঙ্গামাটিতে পাকিস্তান থার্ড কমান্ডো ব্যাটেলিয়ান অবস্থান নেয়। স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপের এলিট কমান্ডোদের প্রধান মেজর জহির আলম খান (শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করেছিলেন তিনিই) ত্রিদিব রায়ের সঙ্গে দেখা করে সবধরণের সহায়তার প্রতিশ্রুতি পান। সঙ্গে যোগ দেয় লালডেঙ্গার নেতৃত্বাধীন মিজোদের একটি ব্রিগেড। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে মুক্তিবাহিনী এবং বিএসএফের সম্ভাব্য ত্ৎপরতা এবং তা ঠেকানোর জন্য সহায়তার কথা ছিলো সে প্রতিশ্রুতিতে। শুধু ত্রিদিব রায়ের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী দলই নয়, রাঙ্গামাটিতে ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সেস (ইপিসিঈফ) প্রাথমিকভাবে যোগ দেয় প্রায় শ ’ তিনেক চাকমা। যুদ্ধশেষে গোটা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের সংখ্যাটা এক মাসে ছিলো দেড় হাজারের ওপর। যদিও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আওতায় তাদের সবাইকেই পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এমনকি দুর্গমতার কারণে পাহাড়ের অধিকাংশ এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের কোনো ঢেউই লাগেনি- আপনার এই কথাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। ৩ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণার অনেক আগে থেকেই পাহাড় ছিলো উত্তাল। এখানে অপারেশনাল ছিলো মেজর জেনারেল সুজয় সিং উবানের তত্বাবধানে থাকা মুজিব বাহিনীর একটা অংশ (শেখ মনির নেতৃত্বাধীন) এবং উদ্বাস্তু তিব্বতীদের নিয়ে গড়া স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স। চেহারায় সাদৃশ্য থাকার কারণে (মঙ্গোলয়েড) তিব্বতীরা নভেম্বরের শুরু থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রামে অপারেশনে নামে (অপারেশন মাউন্টেন ঈগল)। এই লড়াইয়ে পাকিস্তানীদের পাহাড়ে গাইড এবং ইন্টেলিজেন্স দিয়ে সহায়তার দায়িত্ব পালন করে ইপিসিঈফের চাকমারা।

এখন ত্রিদিব রায়কে আপনি স্রেফ পাকিস্তানের একজন দেশপ্রেমিক নাগরিক বা যে তকমাই দিতে চান না কেনো, তার প্রাথমিক পরিচয় তিনি চাকমাদের রাজা। এমন যদি হতো তিনি শুধু রাঙ্গামাটির চাকমাদের রাজা, বা অন্যরা তাকে রাজা বলে স্বীকার করতো না তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু রাজার দায় তার গোষ্ঠীর ওপর খানিকটা বর্তায় বৈকি!পার্বত্য চট্টগ্রামের দুয়েকটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদে (সেগুলো বেশ চমকপ্রদ একদিন শেয়ার করা যাবে) চাকমারা তাই রাজার নির্দেশই পালন করেছে। কিংবা সে নির্দেশের বিপক্ষে যায়নি। ত্রিদিব রায় শুধু তার গোষ্ঠীকেই সহায়তার নির্দেশ দিয়ে বসে থাকেননি। নিজে মাঠে নেমেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করতে গেছেন কলম্বো, সেখানে সিংহলীজ ছাত্রদের ধিক্কার শুনে ফিরেছেন। স্বাধীনতার পরপর পাকিস্তানকে সহায়তার জন্য যে ১২ জনের নাগরিকত্ব বাতিল এবং সহায়সম্পত্তি ক্রোক করা হয় আদালতের নির্দেশে সে তালিকায় গোলাম আজমের সঙ্গে রাজা ত্রিদিব রায়ও আছেন। তিনি নাগরিকত্ব ফিরে পেতে কোনো তদবির করেননি। যদিও সহায়সম্পত্তি ফিরে পেয়েছেন।

প্রশ্ন উঠতে পারে যে যুক্তিতে গোলাম আজমের বিচার করা যায়, সেই একই যুক্তিতে ত্রিদিব রায়কেও আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় কিনা। আমার ধারণা যায়, যদিও তিনি পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে সে দেশেই রয়ে গেছেন, কয়েকদফা মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ধরাছোয়ার বাইরেই। বাকি থাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহায়তাকারী অক্সিলারি ফোর্সের চাকমারা। এরা সাধারণ ক্ষমা পেয়েছে। এদের কারো বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ এব লুটপাটের অভিযোগ ছিলো না। দে জাস্ট মার্চড এলং ফলৈং দেয়ার কিং। তবে সেরকম কোনো প্রমাণ নিয়ে কেউ যদি আসে, তাহলে নিশ্চয়ই তাদেরও বিচার করা যাবে। ব্যাস এটুকুই।









আগেই বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে ত্ৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় যেমন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, তেমনি মং রাজা মং প্রু “ সেইন আবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। সে সময় রাজা মং প্র “ সেইন মুক্তিবাহিনীর জন্য নিজ প্রাসাদ উজাড় করে দেন। মুক্তিযোদ্ধারা তার প্রাসাদে থেকেই যুদ্ধ করেছিলেন, বহু সাহায্য পেয়েছিলেন। এছাড়া পাহাড়ি নেতা এমএন লারমা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন। চাকমা রাজার কাকা শ্রী কেকে রায়ও ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক। কিন্তু শুধু সন্দেহের বশে তাকে ত্রিপুরায় আটক করা হয়েছিল। পাহাড়িদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অধ্যায়টি আমরা তৃতীয় ও শেষ পর্বে আলোচনা করবো।


ব্রিগেডিয়ার (অবঃ) জহির আলম খান পাকিস্তান ডিফেন্স জার্নালে একটি সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের কথাও ছিলো (একাত্তরের মাঝপথে তাকে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়)। সেখানে ত্রিদিব রায়ের অনুসারী চাকমাদের একাংশের সহায়তার বিষয়ে মতামত হচ্ছে :

The Chakma and the Mizo tribesmen co-operated with the Pakistan Army in 1971. You were closely associated with them. How was the experience?

We landed in Rangamati just after nightfall, the next morning I called on Raja Tridiv Roy, the Chakma Chief, He lived in an old bungalow on an island separated from the mainland by a channel about fifty yards wide.

I explained to the Raja that the army had come to re-establish the control of the Pakistan Government on the Hill Tracts and asked for his co-operation in maintaining peace and to keep me informed about any rebel movement, concentration and activity, the Raja agreed and co-operated right upto the surrender. At the request of our government Raja Tridiv Roy came to West Pakistan before our surrender in East Pakistan, he was our ambassador in a number of countries and now lives in Islamabad.

[লিংক]
সাবেক চাকমা রাজা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে বিদেশেও সক্রিয় ছিলেন। ২৬ সেপ্টেম্বর মার্কিন দূতাবাসের গোপন তারবার্তায় জানায়, রাজা ত্রিদিব রায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বিশেষ দূত হিসেবে শ্রীলঙ্কা যান। তারবার্তাটি নিম্নরূপ:

Department of State
TELEGRAM
CONFIDENTIAL 444
COLOMB 03360 270603 Z
19
ACTION NEA-11

INFO : OCT-01 EUR-14 CIAE-00 DODE-00 PM-06 H-02 INR-06 L-03 NSAE-00 NSC-10 P-03 RSC-01 PRS-01 SS-14 USIA-12 10-12 SP-02 ORM-03 AID-20 RSR-01 EA-11 /133 W

……….060184

P 261110 Z NOV 71
FM AMEMBASSY COLOMBO

TO SECSTATE WASHDC 7259
INFO AMEMBASSY ISLAMABAD
AMEMBASSY LONDON
AMEMBASSY NEW DELHI
USMISSION USUN

CONFIDENTIAL COLOMBO 3360

SUBJ : PRESIDENT YAHYA KHAN’S SPECIAL ENVOY TO CEYLON

1. SUMMARY: Raja Tridiv Roy in Ceylon as representative of GOP President Khan. Main thrust of mission seems aimed at Ceylon’s Buddhist majority. Roy suggests Pakistan would welcome Bandaranaike’s involvement in Indo-Pak dispute. Local interest in dispute running quite high. End summary.

2. Raja Tridiv Roy, identified by press reports as quote Pres Yahya Khan’s special envoy to ceylon unquote arrived Colombo Nov 25 and is scheduled meet with PM Bandaranike on Nov 26. Roy accompanied on visit by S.L. Leghari, director of Foreign Affairs, GOP. Roy identified as hereditary chief Chakma community in Chittagong hills, quote one of the largest Buddhist groups in East Pakistan unquote. In addition to scheduled meetings with PM and other cabinet members he has met with representatives of All-Ceylon Buddhist Congress and Young Men’s Buddhist Association.

3. Main reason for Roy visit reportedly is to convey to PM Bandaranaike President Khan’s assessment quote of the serious threat to peace posed by the full¬scale assaults on Pakistan’s borders …and to explain to Mrs Bandaranaike the treatment meted out to minorities, particularly to Buddhists in East Pakistan. Unquote.

4. In Nov 26 Sun Roy stated that quote all countries have high regard or Prime Minister Bandaranaike. Any formula put forward by her to ease the situation in East Pakistan would be most welcome. Unquote. With regard refugee problem, Roy stated that quote Pakistan has opened the door for the refugees to return to their homeland,

but India is trying to discourage them from going home in order to increase tensions in the area. Unquote. Published itinerary calls for him to visit Thailand, Nepal and Burma following visit here.

5. Roy visit seems to be bringing Pakistan question back to front burner in local debates. Group calling itself Ceylon Committee for Human Rights in Bangla Desh was refused interview with Roy and promptly branded him quote an outcast.. .who cannot reconcile the teachings of the compassionate Buddha with murder, rape and pillage by the military clique whose cause he had come here to espouse. Unquote. Nov 26 Daily News editorial roundly criticized both sides in the conflict but placed major blame for military activity on India, arguing that quote anybody who believes that Pakistan, in her present plight, would launch a war against India should surely have his brains washed again in the holy Ganges. Unquote.

6. Comment: Roy’s suggestion that intervention by PM Bandaranaike would be welcomed by Pakistan raises possibility that such role may be attempted again. As shown by Indian Ocean Peace Zone proposal, PM Bandaranaike is seeking new prestige in international arena. Successful involvement in Indo-Pak dispute could earn for her that prestige as well as score domestic points because of the increased interest in the conflict here in Ceylon. GP-3

STRAUSZ-HUPE

Source: The American Papers – Secret and Confidential India.Pakistan.Bangladesh Documents 1965-1973, University Press Limited, p.73 – 733

[লিংক]
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দৈনিক বাংলায় একটি তালিকা ছাপা হয় যেখানে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে সহায়তার অভিযোগে দালাল আইনে অভিযুক্তদের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়; নুরুল আমিন, সবুর খান, গোলাম আযমসহ দালালদের সে তালিকায় ৮ নম্বরে ছিলো ত্রিদিব রায়ের নাম।
[লিংক]



এদিকে জনৈক আরাফাতুর রহমান জানাচ্ছেন:

চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের সহযোগিতায় রাঙামাটিতে গণহত্যা চলে। এই সময়ে রাঙামাটি মুক্ত করতে যাওয়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের ছাত্র এবং এফ রহমান হলের আবাসিক ছাত্র ইফতেখারসহ ৮-১০ জনের একদল মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করা হয়।

চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় তার বির্তকিত বই The Departed Melody-তে লেখেন, ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল সকালে তিনি (রাজা ত্রিদিব রায়) তার ভগ্নিপতি কর্নেল হিউম, ম্যাজিট্রেট মোনায়েম চৌধুরী, মোঃ হজরত আলী এবং আরো কয়েকজন বাঙালি মুসলিম লীগ নেতাসহ চট্টগ্রামের নতুন পাড়ায় অবস্থিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেন্টার-এর পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন। পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় যে ম্যাজিস্ট্রেট মোনায়েম চৌধুরী এবং রাজা ত্রিদিব রায়ের সঙ্গে আসা আরো কয়েকজন বাঙালি ঢাকা থেকে আসা জুনিয়র অফিসারকে সঙ্গে করে কাপ্তাইয়ে যাবেন। ঠিক সেদিনই বিকেলে কাপ্তাই থেকে সেনাবাহিনীর একটি দল কয়েকটি লঞ্চ এবং স্পিডবোট নিয়ে রাঙামাটি আসে এবং বিনা প্রতিরোধে দখল করে নেয়।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রামের বলাকা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত (ফেব্রু-২০১১) ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস’ বইয়ে জামালউদ্দিন লেখেন, ‘…অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পাক দালাল খ্যাত চিহ্নিত এক উপজাতীয় নেতার (রাজা ত্রিদিব রায়) বিশ্বাসঘাতকতায় ঐ দিনই পাকিস্তানি বর্বর বাহিনী রাঙামাটিতে এসে চুপিসারে অবস্থান নেয়, যা মুক্তিযোদ্ধাদের জানা ছিল না। ভারত প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের বাংলোর কাছাকাছি পৌঁছার সাথে সাথে সেখানে ওৎ পেতে থাকা পাকিস্তানি সৈনিকেরা মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ফেলে। এই দলের মধ্যে ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইফতেখার।’ [পৃষ্ঠা ৩৭৯-৩৮০]

এর আগে রাঙামাটি মহকুমা সদরের এসডিও আবদুল আলী কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে দুটি স্পিডবোটে করে মহালছড়ি থেকে রাঙামাটি আসেন। স্পিডবোটে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা এস এম কালাম, আবদুল শুকুর, শফিকুল ইসলাম, মামুন, সামসুল হক মাস্টার এবং রাঙামাটি হাইস্কুলের তদানীন্তন হেডমাস্টার রহমান আলীর ছেলে ইফতেখার। এর মধ্যে স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করার জন্য আবদুল আলীকে রাঙামাটিতে পুলিশ লাইনের এক ব্যারাকে আটক করে রেখে তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্লেড দিয়ে আঁচড় দেয়া হয়েছিল। এরপর সেসব জায়গায় লবণ দেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া তাকে একটি জিপের পিছনে বেঁধে টেনে রাঙামাটির বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানো হয়েছিল। সূত্র : ‘মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রাম’ শরবিন্দু শেখর চাকমা, (অঙ্কুর প্রকাশনী, জানু-২০০৬ পৃষ্ঠা ২৫]।

[লিংক]
তবে ওই লেখক তার লেখায় মুক্তিযুদ্ধে পাহাড়িদের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা বেমালুম চেপে যান। এমনকি লেখাটি যে কেউ পড়লে ধারণা জন্মাতে পারে যে, ১৯৭১ এ আদিবাসী মাত্রই ত্রিদিব রায়ের অনুসারি তথা রাজাকার ছিলেন! তিনি ভুলে যান কথিত ‘আদিবাসী রাজাকারের বংশধর’, বর্তমান চাকমা রাজা দেবাশীষ রায় ১৯৭১ এ মাত্র ১১ বছরের বালক ছিলেন এবং পিতার কৃতকর্মের দায়ভার কোনোভাবেই তার ওপর বর্তায় না এবং চাকমা রাজা হিসেবে তার এ পর্যন্ত সমস্ত কর্মকাণ্ড আদিবাসী তথা বাংলাদেশের স্বার্থই রক্ষা করে। বিশিষ্ট আদিবাসী গবেষক রাজা দেবাশীষ পার্বত্য সমস্যা নিয়ে লিখেছেন অসংখ্য গবেষণাগ্রন্থ, প্রবন্ধ, নিবন্ধ; এমনকি ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির খসড়াটিও তারই করা। চাকমা ভাষায় রয়েছে তার লেখা ও সুর করা অসংখ্য গান এবং গুনি এই ব্যক্তি বাঁশির সুরে ধরেছেন পাহাড়ি লোক ঐতিহ্য। সংক্ষেপে, রাজপরিবারের আশিবার্দে নয়, নিজস্ব যোগ্যতায় বর্তমান চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় পরিনত হয়েছেন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বে।

কিন্তু আরাফাতুর রহমান উগ্র জাতিগত বিদ্বেষজনিত কারণে আরো লেখেন:

এই যুদ্ধাপরাধীদের বংশধররা বংশপরম্পরায় বাংলাদেশের বিরোধিতা করে আসছে। বর্তমান আমরা তাদেরই আবার দেশের প্রতিনিধি বানিয়েছি বিশ্বদরবারে, জাতিসংঘে। যুদ্ধাপরাধী চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় এবং বিচারপতি সায়েমের উপদেষ্টা ত্রিদিব রায়ের মা বিনীতা রায়ের বংশধর এবং উত্তরাধিকারী দেবাশীষ রায় বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজামী ও মুজাহিদের মতো তার গাড়িতেও বাংলাদেশের পতাকা উড়েছে। তিনি সম্প্রতি মেক্সিকোর কানকুনে শেষ হয়ে যাওয়া জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি দলের পক্ষে কাজ করেছেন। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সংগঠন ইউএনএফসিসিসি (UNFCCC) এবং ইউ এন পার্মানেন্ট ফোরাম অন ইনডিজিনাস ইস্যুর বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। (সূত্র : প্রথম আলো, ০২ জানুয়ারি ২০১১)

রাজাকার ফজলুল কাদের চৌধুরীর পুত্র হিসেবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী যদি ওআইসির (ঙওঈ) মহাসচিব পদের জন্য নির্বাচন করে দেশের ভাবর্মূতি নষ্ট করতে পারে তাহলে কেন ত্রিদিব রায়ের মতো প্রমাণিত রাজাকারের পুত্র বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে? এখন তো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উজ্জীবিত সরকার। তাদের অপরাধের কেন বিচার হবে না?

[লিংক]
এ যেনো আমতত্ত্ব। আম গাছে তো আমই ফলে নাকি? ফকাচৌ’র পুত্র সাকাচৌ যুদ্ধাপরাধী হলে ত্রিদিব পুত্র দেবাশীষ কেনো বালক রাজাকার হবেন না? লা জবাব গরলীকরণ!!


ছবি: ত্রিদিব রায়, ১৯৭০, জুলফিকার আলী ভূট্টোর সঙ্গে, ১৯৭২, চট্টগামে দ্বিতীয় রাণী এলিজাবেথের সঙ্গে, ১৯৬১ এবং বর্তমান সময়ে, আন্তর্জাল।
শেষ পর্ব
পাহাড়িদের প্রতিরোধ লড়াই, ১৯৭১
পুনর্বার বলা ভালো, ১৯৭১ সালে ত্ৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় যেমন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, তেমনি মং রাজা মং প্রু “ সেইন আবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন। সে সময় রাজা মং প্রু “ সেইন মুক্তিবাহিনীর জন্য নিজ প্রাসাদ উজাড় করে দেন। মুক্তিযোদ্ধারা তার প্রাসাদে থেকেই যুদ্ধ করেছিলেন, বহু সাহায্য পেয়েছিলেন। এছাড়া পাহাড়ি নেতা এমএন লারমা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন। চাকমা রাজার কাকা শ্রী কেকে রায়ও ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক। কিন্তু শুধু সন্দেহের বশে তাকে ত্রিপুরায় আটক করা হয়েছিল। পাহাড়িদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অধ্যায়টি আমরা চলতি তৃতীয় ও শেষ পর্বে আলোচনা করছি।

‘৭১ এর ২৫ মার্চ পাকিস্তানী সামরিক জান্তা গণহত্যা শুধু করলে সারাদেশের মতো পাহাড়েও তরুণ ছাত্র-যুবারা মুক্তিযুদ্ধের সর্বাত্নক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এই প্রতিরোধ লড়াইয়ে সে সময় বাঙালিদের পাশাপাশি পাহাড়ি আদিবাসীরা সমানভাবে অংশ নিয়েছিলেন। কাজেই ত্রিদিব রায় ও তার অনুসারী মুষ্টিমেয়দের পাকিস্তানপন্থী ভূমিকাকে কেন্দ্র করে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম বা সারাদেশের আদিবাসীদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথাকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। বরং কার্যত অমন চেষ্টা উগ্র জাতিগত বিদ্বেষ ও ইতিহাস বিকৃতিকেই উস্কে দেয় মাত্র।

খোদ সরকারের রাঙামাটি জেলার তথ্য বাতায়নে বলা হচ্ছে:

১৯৭১ এর মার্চ মাসে রাঙ্গামাটি জেলা সদরে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল রাঙ্গামাটি সরকারী কলেজের ত্ৎকালীন ছাত্রনেতা গৌতম দেওয়ান এবং সুনীল কান্তি দে এর নেতৃত্বে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়িতে অবস্থিত ফারুয়া ও শুকরছড়ির মোহনায় পাক সামরিক ঘাঁটি ছিল। সেখানে পাঞ্জাবী, রাজাকার, আলবদরসহ ২৫০ জন সৈন্য অবস্থান করত। সেখানে পাক সেনাবাহিনীর কয়েকটি স্টীমার ও গানবোটও ছিল। আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে পাইলট মান্নানসহ মুক্তি বাহিনীর একটি দল পাহাড়ী এলাকায় পথ হারিয়ে রাতের অন্ধকারে ফারুয়াস্থ পাক বাহিনীর ক্যাম্পের অভ্যন্তরে এসে পড়ে। তারা চাকমাদের সহায়তায় নৌকায় করে শুকরছড়ি এলাকায় নিরাপদ স্থানে পৌঁছে যায়।

১৭ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর পূর্বাঞ্চল কমান্ডের অধিনায়ক জেনারেল সিং ওভান এবং শেখ ফজলুল হক মনি ভারতীয় হেলিকপ্টারযোগে রাঙ্গামাটির পুরাতন কোর্ট বিল্ডিং মাঠে অবতরণ করেন। এখানে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান ত্ৎকালীন ছাত্রনেতা গৌতম দেওয়ান, আবদুর রশীদ, মোঃ ফিরোজ আহম্মদ, মনীষ দেওয়ান (পরবর্তীতে কর্ণেল)সহ হাজারো ছাত্র-জনতা।

[লিংক]

এতে পাহাড়িদের প্রতিরোধ লড়াইয়ের পাশাপাশি সাধারণ নিরস্ত্র পাহাড়ি জনতার চরম আত্নত্যাগের কথা তুলে ধরে আরো বলা হয়:

পাক বাহিনীরা পার্বত্য জেলা সদর রাঙ্গামাটি ও মহকুমা সদর রামগড় এবং বান্দরবান দখল করার পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে ঘাঁটি স্থাপন করে এবং ঘাঁটিসমূহ সুদৃঢ় করে নেয়। তারা বিভিন্ন এলাকায় শাখা কমিটি গঠন করে তাদের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকায় রাজাকার বাহিনী ও হিলরাজ বাহিনী গঠন করে এবং বিভিন্ন এলাকায় হানা দিয়ে বর্বর অত্যাচার চালায় ও ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয়। পাকবাহিনী রামগড়, গুইমারা, মানিকছড়িসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে পাহাড়ী রমনীদের জোর পূর্বক ধরে নিয়ে অমানুষিকভাবে ধর্ষণ করে এবং ক্যাম্পে উলঙ্গ অবস্থায় বন্দী করে রাখে।

১নং সেক্টরের আওতায় সর্বপ্রথম ৫ মে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা দল গঠন করা হয়। এই দল গঠনের নেতৃত্ব দেন হেমদা রঞ্জন ত্রিপুরা। এটি পরবর্তীতে একটি পূর্ণাঙ্গ কোম্পানী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। শ্রী ত্রিপুরাকে কোম্পানী কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এই কোম্পানীর অধীনে গ্রুপ নং- ৯১, ৯২, ৯৩, ৯৪ এবং ৯৫ সংযুক্ত করা হয়। উক্ত গ্রুপগুলির ট্রেনিং কেন্দ্র ছিল ভারতের অম্পি নগর এবং ১নং সেক্টর হেডকোয়ার্টার হরিণা। ১নং সেক্টরের অধীনে হরিণা থেকে ৩০ কিঃ মিঃ দূরবর্তী সীমান্ত এলাকা ভারতের বৈষ্ণবপুরে আগস্ট মাসের প্রথম দিকে সাব-সেক্টর স্থাপন করা হয়। সেখানে অবস্থানরত গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় গেরিলা আক্রমণ পরিচালনা করা হয়।

পার্বত্য এলাকায় অবস্থানের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচলের সুবিধা, শত্রুপক্ষের ঘাঁটি আক্রমণ এবং পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত নাকাপা, কুমারীপাড়া, পাগলা পাড়া, মানিকছড়ি, ডাইনছড়ি, যোগ্যাছলা ও গাড়ীটানা এলাকার গহীন অরণ্যে মুক্তিবাহিনীর গোপন ক্যাম্প বা আশ্রয়স্থল করা হয়। এই সমস্ত গোপন গেরিলা ক্যাম্পে ঐ এলাকার হেডম্যান কার্বারীসহ সকল স্তরের জনগণ খাদ্যশস্য সরবরাহ করত এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন ঐ সমস্ত এলাকার জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদেরকে পাকবাহিনীর গতিবিধি এবং তাদের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে সাহায্য করত।

[লিংক]


অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধে গৌরবময় অবদান রাখা এমএন লারমা ও মং রাজা রাজা মং প্রু সাইন প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আদিবাসী গবেষক মঙ্গল কুমার চাকমা তার ‘মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্যাঞ্চলের জুম্ম জনগণ ও প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়’ নামক ’ লেখায় জানাচ্ছেন :

… সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে জুম্ম ছাত্র-যুবকরাও আন্দোলনে যোগ দিতে সংগঠিত হতে থাকে। ত্ৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। জুম্ম ছাত্র-যুবকদেরও উদ্বুদ্ধ করেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য। ১৯৭০ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী-লীগের প্রাথী কোকনদাক্ষ রায়ও (রাজা ত্রিদিব রায়ের কাকা) মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে গিয়েছিলেন। এ-সময় কয়েকশো জুম্ম ছাত্র-যুবকও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ত্রিপুরা রাজ্যে গিয়েছিলো। প্রথম অবস্থায় তারা অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণও করেছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে এইচ টি ইমামের প্ররোচনায় জুম্ম ছাত্র-যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ করে দেয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ-সময় ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় কোকনদাক্ষ রায়কেও কোনো অজুহাত ছাড়াই গ্রেফতার করা হয়। ফলে অনেক জুম্ম ছাত্র-যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পেরে পার্বত্য চট্টগ্রামে ফেরত আসে।…
[লিংক]

মঙ্গল কুমার চাকমা আরো জানান:

মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন মং সার্কেলের ত্ৎকালীন রাজা মং প্র¦ সাইন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে-সাথে যখন শতো-শতো লোক পরিবার-পরিজন নিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে যাচ্ছিল, তখন তিনি খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়িস্থ রাজবাড়ীতে তাদের খাওয়া-দাওয়া-সহ নানাভাবে সহায়তা প্রদান করেন। পাক-সেনারা রামগড় দখল করার পূর্বেই তিনি ত্রিপুরা পালিয়ে যান। সেখানে গিয়েও তিনি বসে থাকেননি। কর্ণেলের ব্যাজ পরে তিনি কুমিল্লার আখাউড়াতে যুদ্ধ করেছিলেন। সেজন্য পাক সেনারা মানিকছড়িতে এসে রাজবাড়ী, ত্ৎসংলগ্ন বৌদ্ধ মন্দির ও গ্রামের জুম্মদের ঘারবাড়ী ধ্বংস ও লুটপাট করে।

ত্ৎসময়ে ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেল (ইপিআর) বাহিনীতে কিছু জুম্ম ছিলো। তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে রমণী রঞ্জন চাকমা রামগড় সেক্টরে পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধে নিহত হন। সিপাহী হেমরঞ্জন চাকমা বগুড়া সেক্টরে নিখোঁজ হন। তার লাশও পাওয়া যায়নি। সিপাই অ্যামি মারমাও বগুড়া সেক্টরে যুদ্ধে শহীদ হন। পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অসম সাহসিকতার জন্য বান্দরবানের অধিবাসী ত্ৎকালীন ইপিআরের রাইফেলম্যান উখ্য জিং মারমাকে যুদ্ধের পরে বীরবিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়। তিনি এখনও বেঁচে আছেন। অভাব-অনটনের মধ্যে কষ্টকর জীবন অতিবাহিত করছেন বান্দরবান শহরে।

সে-সময় পূর্ব পাকিস্তান পুলিস-বাহিনীতেও কিছু জুম্ম চাকরীরত ছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম বিমলেশ্বর দেওয়ান ও ত্রিপুরা কান্তি চাকমা-সহ ২০ / ২২ জন জুম্ম সিভিল কর্মকর্তা ও কর্মচারী ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এঁদের মধ্যে বরেন ত্রিপুরা, কৃপাসুখ চাকমা ও আনন্দ বাঁশী চাকমা ছিলেন অন্যতম।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মেজর জিয়াউর রহমান তাঁর বাহিনী ও ইপিআর বাহিনী নিয়ে রাঙ্গামাটি হয়ে ত্রিপুরা পাড়ি দিয়েছিলেন। জিয়া বাহিনী-সহ রাঙ্গামাটি পৌঁছলে জুম্ম জনগণই তাদেরকে খাদ্য ও অন্যান্য রসদ যুগিয়েছিলো। রাঙ্গামাটি জেলার বন্দুকভাঙ্গায় যেখানে বর্তমানে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের সমাধিক্ষেত্র রয়েছে, সেখানে পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধের পর মেজর জিয়া তাঁর বাহিনী নিয়ে জুম্মদের গ্রামের ভিতর দিয়ে নানিয়ারচর, মহালছড়ি ও খাগড়াছড়ি হয়ে রামগড় সীমান্তে চলে যান। সে-সময় গ্রামে-গ্রামে জুম্ম গ্রামবাসীরা মেজর জিয়ার বাহিনীকে খাদ্য-সহ নানাভাবে সহায়তা করেছিলো। কথিত আছে, খাগড়াছড়ি জেলার কমলছড়ি গ্রামের পাশ দিয়ে চেঙ্গী নদী পার হওয়ার সময় নদীতে হাঁটু পানি থাকায় যাতে জুতা-প্যান্ট ভিজে নষ্ট না হয় সে-জন্য কমলছড়ি গ্রামের জনৈক মৃগাঙ্গ চাকমা মেজর জিয়াকে পিঠে তুলে নদী পার করে দেন। জিয়ার বাহিনীকে সহায়তা দেয়ার জন্য পাক-বাহিনী মহালছড়ির সভ্য মহাজন, গৌরাঙ্গ দেওয়ান ও চিত্তরঞ্জন কার্বারীকে ধরে নিয়ে যায়। পাকবাহিনী তাদেরকে আর ফেরত দেয়নি। তাদের লাশও পাওয়া যায়নি। শুধু তাই নয়, এজন্য অনেক জুম্ম নারী বিভিন্ন জায়গায় পাক সেনা সদস্যের ধর্ষণেরও শিকার হয়।

[লিংক]









পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সে সময় যে অল্প কয়েকজন পাহাড়ি আদিবাসী নিরাপত্তা বিভাগে সরকারি চাকরিতে ছিলেন, তাদের মধ্য অন্যদম শহীদ খগেন্দ্র নাথ চাকমা (দ্রষ্টব্য: সূচনা ছবি, তন্দ্রা চাকমা)। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লার মুরাদনগরে সার্কেল ইন্সপেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে শ্রী খগেন্দ্র নাথ চাকমা পাকিস্তানী বাহিনীর কর্তৃক নিহত হন।

অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশের প্রায় ৭৫ টি ভাষাগত সংখ্যালঘু জনজাতি্‌ আদিবাসী- মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ইউকে চিং হচ্ছেন একমাত্র বীরবিক্রম উপাধিপ্রাপ্ত আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা। তিনিও সীমান্ত রক্ষী বাহিনী, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস– ইপিআর’ এ কর্তব্যরত অবস্থায় ১৯৭১ সালে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ইপিআরের নায়েক হিসেবে তিনি রংপুরের হাতিবান্ধা বিওপিতে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে রংপুর ৬ নম্বর সেক্টরে মেজর বাশারের নেতৃত্বে নয়জন বাঙালি ইপিআর সৈনিককে নিয়ে পাটগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেন। দেশকে পাক হানাদার মুক্ত করতে বিওপিতে কর্মরত একজন বিহারি ও দুজন পাঞ্জাবিকে হত্যা করেন তিনি। টানা নয় মাস সম্মুখ যুদ্ধ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করেন ইউকে চিং। তবে যদিও অভাব-অনটন এখন ৭৭ বছর বয়সী এই বীরবিক্রমের নিত্য সঙ্গী। অসংখ্য পদক বা সরকারি সন্মাননা — কোনটিই এই বীর যোদ্ধার বাকি জীবন ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারছে না (দ্রষ্টব্য ছবি: বাংলানিউজ টোয়েন্টফোর ডটকম)।

[লিংক]

স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে ভাষাগত সংখ্যালঘু জনজাতি গোষ্ঠিগুলো উপেক্ষিত থেকে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় বরাবরই মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের পাতায় উপেক্ষিত থেকে যায় আদিবাসী, উপেক্ষিত থেকে যায় ১৯৭১ এর তাদের প্রতিরোধ লড়াই, সব ধরণের আত্নগ্যাগ, এমন কি মুক্তিযুদ্ধের শেষপ্রান্তেও এসে মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ রাইফেলস — বিডিআর নামধারী কতিপয় বিপথগামী দুর্বৃত্তের হত্যাযজ্ঞ, যা এই ধারাবাহিকের প্রথম পর্বে বর্ণনা করা হয়েছে।

তাই বাংলাদেশ যেমন বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির দেশ, এদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও তেমনি বহু জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের আত্নত্যাগের ইতিহাসে বর্ণিল।
____

সংযুক্ত:
০১. মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী, সংকোলন, গুরুচণ্ডালি ডটকম।
০২. দেশের ৭৫ টি আদিবাসী জাতি: বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহায়তায় সারাদেশে অনুসন্ধান চালিয়ে আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস গত ২৮ নভেম্বর ২০১০ জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের উদ্দেশ্য তাদের সুপারিশ তুলে ধরে। ‘আদিবাসী জাতিসমূহের সাংবিধানিক স্বীকৃতি বিষয়ক সুপারিশমালা’ শীর্ষক বক্তব্যে ককাস ৭৫টি ভাষিক সংখ্যালঘু জনজাতির তথ্য প্রকাশ করে।
এই ৭৫টি আদিবাসী জাতিসমূহ হচ্ছে: ১. অধিকারী, ২. অসম/অহম/অহমীয়া, ৩. ওঁরাও/উঁরাও, ৪. কন্দ/কন্ধ/খন্দ কড়া, ৫. কাউর, ৬. কুর্মি/মাহতো, ৭. কর্মকার, ৮.কড়া/করোয়া, ৯. কর্নিদাস, ১০. কোচ, ১১, কোল, ১২. খারিয়া/ খেরিয়া, ১৩. খুমি/খামি, ১৪.খিয়াং, ১৫. খাসি, ১৬. খারওয়ার, ১৭. গন্ড/ গন্ডি/গঞ্জু, ১৮. গড়াইৎ/গড়াত, ১৯. গারো, ২০. গোর্খা, ২১, গৌড়, ২২. চন্ডাল, ২৩. চাকমা, ২৪. চাক, ২৫. ছত্রী, ২৬. ডালু, ২৭. ডোম, ২৮. ত্রিপুরা/টিপরা, ২৯. তঞ্চগ্যা, ৩০. তুরি/ তুরিয়া, ৩১. তেলী, ৩২. নুনিয়া, ৩৩. পল্ল/পলিয়া, ৩৪. পাত্র, ৩৫. পাহান, ৩৬. পাহাড়িয়া, ৩৭. পাংখু/পাংখোয়া, ৩৮. পুন্ড্র/ পোদ, ৩৯. বম, ৪০. বর্মণ, ৪১. বাউরি, ৪২. বাগদী/ বাকতি, ৪৩. বানাই, ৪৪. বাড়াইক, ৪৫. বাদিয়া/বেদিয়া, ৪৬. বীন/বিন্দ, ৪৭. বোনাজ/বুনা, ৪৮. ভর, ৪৯. ভূমিজ, ৫০. ভূঁইয়া, ৫১. ভূঁইমালী, ৫২. মারমা, ৫৩. মারমি/মুরমি, ৫৪. মালো/মাল, ৫৫. মাহালী, ৫৬. মাহাতো, ৫৭. মনিপুরী, ৫৮. মিরধা, ৫৯. মুন্ডা, ৬০. মুরারি/মুরিয়ারি, ৬১. মুষহর, ৬২. ম্রো/মুরং, ৬৩. রাওতিরা, ৬৪. রবিদাস, ৬৫. রাখাইন, ৬৬. রাজোয়াড়, ৬৭. রাই, ৬৮. রাজবংশী, ৬৯. রানা-কর্মকার, ৭০. লুসাই, ৭১. লোহার/লহরা, ৭২. শবর, ৭৩. সাউ, ৭৪. সান্তাল/সাঁওতাল এবং ৭৫. হাজং।
ককাসের তথ্য অনুযায়ী, এই জনজাতিসমূহের আনুমানিক লোকসংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ।
০৩. একটি প্রাসঙ্গিক দাবিনামা:
সরকারের উদ্দেশ্য মণিপুরী সমাজ কল্যাণ সমিতি’র ১৪ দফা দাবির অন্যতম —
যাচাই বাছাইক্রমে মণিপুরী শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের তালিকাভুক্ত করণ। পর্যায়ক্রমে তা সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্বার জন্য কার্যকর করা।
ঐতিহাসিক বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, মহান ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও অংশগ্রহনকারী বীর মণিপুরী বীর মুক্তিযুদ্ধাদের নাম তালিকা খচিত দৃষ্টি নন্দন ‘স্বাধীনতা স্তম্্ভ’ মণিপুরী অধুøষিত মৌলবীবাজারের কমলগঞ্জস্থ মণিপুরী ললিতকলা একাডেমী প্রাঙ্গনে নির্মাণ। অনুসন্ধানক্রমে অন্যান্য সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্বার এমন গৌরবের কিছু থেকে থাকলে তা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করা।…