Thursday, June 27, 2013

অভিনন্দন আসিফ। কুপমণ্ডুকতা নিপাত যাক।।

সহব্লগার ও অন লাইন অ্যাক্টিভিস্ট আসিফ মহিউদ্দীন অবশেষে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এ জন্য তাকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। আবারো আসিফ মুক্তচিন্তা ও শুভবুদ্ধির পক্ষে অবিরাম লিখে যাবেন; নিঃশঙ্ক চিত্তে ফিরে আসবেন ব্লগিং জগতে এটিই কাম্য।

তার অনেক লেখাই হয়তো অনেকে পছন্দ না-ও করতে পারেন, কিংবা তার অনেক লেখার সঙ্গে হয়তো দ্বিমত পোষণ করার সুযোগও রয়েছে। কিন্তু লেখার জবাব লেখা দিয়েই হতে হবে, কারাবন্দিত্ব কখনোই লেখনির জবাব হতে পারে না। তাছাড়া কোনও সভ্যদেশের আদালত নির্ধারণ করে দেবে, অমুকে আস্তিক বা তমুকে নাস্তিক, কোনমতেই এটি মেনে নেওয়া যায় না।

সব রকম শাররীক ও মানসিক ক্ষতি কাটিয়ে আসিফের লেখনি আগের মতোই সব ভয়-ভীতি উপেক্ষা করার সাহস রাখবে, আমরা এটিই চাই। রাষ্ট্রের উচিত হবে আমাদের সহব্লগারকে সব রকম নিরাপত্তা প্রদান করা।

আসিফের মুক্তির বিষয়ে কিছুক্ষণ আগের এক খবরে বলা হয়:

অবশেষে জামিন পেলেন ব্লগার আসিফ মহীউদ্দিন
বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক জহুরুল হক তার জামিন মঞ্জুর করেন।
ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গত ৩ এপ্রিল তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
একই সাথে গ্রেপ্তার করা হয় মশিউর রহমান বিপ্লব, রাসেল পারভেজ, ও সুব্রত শুভ নামের তিনজন ব্লগারকে।
গ্রেপ্তারের পর ১৭ মে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক সাজ্জাদ হোসেন ও মাইনুল ইসলাম ঢাকার মূখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে দুটি মামলার প্রতিবেদন দাখিল করেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, “ব্লগার আসিফ নিজেকে আল্লাহ দাবি করে ইসলাম ও হযরত মোহাম্মদ (সা.) কে ব্যঙ্গ করে অশ্লীল মন্তব্য করেছেন। যা মুসলিম সমাজ তথা সমগ্র মুসলমান জাতির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। এছাড়া আসিফ প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি করে এবং নারীদের সম্পর্কে চরম অশ্লীল ভাষায় মন্তব্য করেন।” [লিংক]
সন্দেহ হয়, ডিবি পুলিশের ওই প্রতিবেদনটি কপ্টার শফির মক্তবে লিখিত কি না, যারা “ইন্টারনেট দিয়া বলগ লেখা” আসিফের একটি লেখাও হয়তো পড়ে দেখেননি বা পড়ে দেখলেও এগুলোর বিন্দু- বিসর্গ গলধকরণের ক্ষমতাই আসলে যাদের নেই।
স্মরণ করা ভালো, শাহবাগের গণজাগরণ বিস্ফোরণের বিপরীতে বিপরীতে বিএনপি-জামাত-হেফাজত যখন মতিঝিল কাঁপিয়ে “নারায়ে তাকবির” ধ্বণীতে ঢাকা নগরীতে দেদার তাণ্ডব চালায়, তখন আমাদের লিজেন্ড ব্লগাররা সে সময় টিভি টক শো, প্রিন্ট মিডিয়া, অন লাইন নিউজ মিডিয়া, ফেবু ও ব্লগে মহা মহা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অনর্গল জ্ঞানের ঝাঁপি উজাড় করে দিতে থাকেন। সরকারও হেফাজতিদের হেফাজতে নেওয়ার হীন কৌশল হিসেবে মোল্লাতন্ত্রের কাছে নিঃশর্ত আত্ন সমর্পন । মুর্খ ডিবি পুলিশের ওই প্রতিবেদনে গ্রেফতার হয় আসিফ মহিউদ্দীন, মশিউর রহমান বিপ্লব, রাসেল পারভেজ, ও সুব্রত শুভ নামের চারজন সহ-ব্লগার।


আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে সময় বাণীতে বলেছিলেন, দেশ নাকি মদিনা সনদে চলবে! এর আগে অবশ্য খুন হওয়া ব্লগার রাজিবের বাস ভবনে ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। নিহত রাজিবকে “শহীদ” উল্লেখ করে খুনীদের কোনও ছাড় দেওয়া হবে না বলেও অঙ্গিকার করেছিলেন। আর তিনি সে সময় সংসদে এ-ও বলেছিলেন, মন ছুটে যায় শাহবাগে! …[লিংক]


কিন্তু ডিজিটাল সরকারের এনলাগ বিটিআরসি এখন উল্টোগীত গাইছে। ইন্টারনেট ফিল্টারিং-এর পাশাপাশি তারা এখন গলা টিপে ধরতে চাইছে বাংলা ব্লগের নিঃশঙ্ক চিত্ত। [লিংক]


তো পাশার দান উল্টে গেলে রাতারাতি মুখোশ নামিয়ে ফেলেন আমাদের সেলিব্রেটি ব্লগার কোম্পানি। নাস্তিক ব্লগার প্রশ্নে আইজু+ইমরান+পিয়াল+জেবতিক কোং সব সমান হয়ে যায় তখন। এরা তখন গ্যাং ব্যাং গ্রুপ খুলে মডারেট ধর্মীয় চ্যাং (পড়ুন ঈমানদণ্ড) দেখিয়ে ফেসবুক থেকে ‘উগ্র নাস্তিক’ তাড়াতে উঠে-পড়ে লাগে । “নাস্তিক” আসিফ এদের কাছে হারাম। হারাম তারাও যারা ফেসবুকে আসিফের মুক্তির কথা বলে। আসিফকে বাদ দিয়েই এরা ব্লগারদের মুক্তি চায়; স্বাধীন বাংলা ব্লগের খোয়াব দেখে।


এসব আর কিছুই নয়, অন্ধত্ব বিচারে মোল্লাদের সঙ্গে এদের তফাৎ লেবাসের মাত্র।…অথবা হেফাজতের সঙ্গে আওয়ামী মুসলিম লীগের যতখানি, ঠিক ততোখানিই। এই তালেবর মুজিব বাহিনী জামাত- হেফাজতের চেয়েও ভয়ংকর। এরা হচ্ছে সিরাজুস সালেহীন, অন লাইন রগকাটা গ্রুপ; ভেতর থেকে ছুরি মারা চক্র।


আসিফের মুক্তির শুভ ক্ষণে, কামনা করি সব কুপমণ্ডুকতার অবসান। জয় হোক মুক্তচিন্তা, শুভ বুদ্ধির। হ্যাপি ব্লগিং।

----

সংযুক্ত: অগ্রসর লেখক অভিজিৎ রায়ের পাঠ প্রতিক্রিয়া:




অভিজিৎজুন ২৮, ২০১৩ সময়: ১:৩৮ পূর্বাহ্ণ লিঙ্কগাধা সবসময়ই পানি খায়, কিন্তু একটু ঘোলা করে।

আসিফ মহিউদ্দীনের জামিনের খবরটা শুনে এটাই মনে পড়ল প্রথমে। গত পয়লা এপ্রিল জামাতি আর হেফাজতি মোল্লাদের তোষামোদ করতে গিয়ে যেভাবে সরকারের পক্ষ থেকে প্রগতিশীল ব্লগারদের হাতকড়া পরিয়ে পাকড়াও করা হয়েছিল, তা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। এর পর থেকেই আমরা চেষ্টা করেছি ব্লগারদের মুক্ত করতে। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বব্যাপী। আমাদের সে আহবানে সাড়া দিয়ে সারা বিশ্বের মুক্তচিন্তক আর মানবতাবাদীরা রাস্তায় নেমেছেন প্ল্যাকার্ড হাতে। অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, সিএফআই, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস সহ বহু সংগঠনই বিবৃতি দিয়েছিল সরকারের বাক স্বাধীনতার উপর এই আগ্রাসনের প্রতিবাদে। আমি নিজেও বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলাম আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। আর বাংলাদেশে ব্লগার এবং অ্যাক্টিভিস্টরা তো কয়েক দফা করে পথে নেমেছেন। কৃতজ্ঞতা জানাই সবাইকে যারা আসিফের এই কঠিন সময়গুলোতে পাশে ছিলেন, আশার খোরাক যুগিয়েছিলেন।

তবে বিপরীত দৃশ্যও যে দেখিনি তা নয়। অনেকে আবার চেয়েছিলেন সাড়া জীবনই আসিফ জেলে থাকুন। রাস্তায় ফেলে আরেকদফা কোপালে কিংবা ফাঁসি দিয়ে দিলে তো আরো ভাল। কেবল ‘কাঁঠাল পাতা চিবানো’ ছাগুরা নয়, ছাগু তাড়ানো সেলেব্রিটি ব্লগার, আম্বালিগার, পর্নস্টার সবাই ছিলেন আসিফের এই কল্লা ফেলার মিশনে অগ্রণী শরিক। ছাগুবাহিনী আর মুজিব বাহিনী গ্যাং ব্যাং গ্রুপ করে মিশনে নেমেছিলেন; আসিফের মুক্তি চেয়ে কেউ স্ট্যাটাস দিলেই মুছে দিতে শুরু করেছিল তারা। আমি অবাক হয়ে ভাবতাম – এরাই নাকি শাহবাগ আন্দোলনের পুরোধা, এরাই নাকি দেবে জাতিকে মুক্তি!

আমি অনেক দিন ধরেই দাঁতে দাঁত চেপে আজকের এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। জানতাম, এক মাঘে শীত যায় না। আসিফ একদিন মুক্তি পাবেন, লেখালিখি শুরু করবেন, শুধু জামিন নয়, সামগ্রিকভাবে মামলা থেকেও মুক্তি পাবেন তিনি। তিনি এখন স্বনামেই পরিচিত দেশে, বহির্বিশ্বে – হয়তো দেশের বাইরেও চলে আসতে পারবেন, চাইলেই, কিন্তু কারাগারে বন্দি অবস্থায় যে বৈমাত্রেয় সুলভ আচরণ তিনি পেয়েছেন সেলিব্রিটি নামধারী কিছু সহব্লগারদের কাছ থেকে সেটা ইতিহাসে লেখা থাকবে।

অভিনন্দন আসিফ মহিউদ্দীন। অভিনন্দন মুক্তচিন্তার বিজয়ে। আমরা পাশে আছি।

ধন্যবাদ বিপ্লবকেও সময়োপযোগী লেখাটির জন্য।




___

ছবি: ফেবু থেকে সংগৃহিত এবং হেফাজতি লিফলেট, মে ২০১৩।