Thursday, March 28, 2013

বাংলা ব্লগের ওপর খড়গহস্ত বিটিআরসি

০১. ফেসবুক, ইউটিউব-এর পর এবার বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-- বিটিআরসি'র খড়গ নেমে এসেছে বাংলা ব্লগের ওপর। শীর্ষ স্থানীয় ব্লগ সাইটগুলোর ওপর সরকারি এ হস্তক্ষেপে ব্লগে ব্লগে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষোভ। এ নিয়ে ব্লগ সাইটগুলোতে লেখা হচ্ছে অসংখ্য প্রতিবাদী নোট। ব্লগাররা সরকারি খবরদারিকে মুক্ত চিন্তা ও স্বাধীন মত প্রকাশের ওপর হস্তক্ষেপ বলেই মনে করছেন। বিটিআরসি'র পক্ষ থেকে ব্লগারদের ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি কিছু 'আপত্তিকর পোস্ট' সরিয়ে ফেলার নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ব্লগে এ অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

প্রধান সারির ব্লগ সাইটগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা সরকারের এই 'বেআইনী' আদেশ তো মানবেই না, বরং দেশের সংবিধান, প্রচলিত আইন এবং আন্তর্জাতিক সাইবার আইন অনুসরণ করে প্রতিটি ব্লগারের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাদানের পাশাপাশি ব্লগারের স্বাধীন মত প্রকাশকে তারা যে কোনো মূল্যে সমুন্নত রাখবে। বিটিআরসি বা অন্য কোনো সংস্থা স্বাধীন ব্লগিং তথা মুক্ত চিন্তা ও স্বাধীন মত প্রকাশের ওপর কোনো রকম খবরদারির চেষ্টা করলে তারা এর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে। এছাড়া কোনো ব্লগারকে কোনো রকম হয়রানী করা হলেও তারা তাকে প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা দান করবে।

অন্যদিকে, বিটিআরসি বলছে, তথ্য প্রযুক্তির যথাযথ ব্যাবহার নিশ্চিতকরণের লক্ষে বিটিআরসি, টেলিযোগাযোগ লাইসেন্সধারী,ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার এখতিয়ার রাখে এবং উক্ত তথ্য চাহিদানুযায়ী প্রদানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইন অমান্যকারীর আর্থিক জরিমানা ও শাস্তির বিধান রয়েছে।

'বাংলা ব্লগ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে প্রেস বিজ্ঞপ্তি' শীর্ষক এক পোস্টে আমারব্লগ ডটকম-এর তথ্যকেন্দ্র জানাচ্ছে:

আমারব্লগ ডট কম (www.amarblog.com) ২১ মার্চ ২০১৩ সকালে বাংলাদেশ বিটিআরসি (www.btrc.gov.bd) থেকে একটি ইমেইল নির্দেশ পেয়েছে। সহকারী পরিচালক স্বাক্ষরিত এ নির্দেশনায় আমার ব্লগকে বেশ কয়েকজনের ব্লগ অ্যাকাউন্ট বাতিল এবং উল্লেখিত ব্লগারদের ব্যাক্তিগত তথ্যাদি- আই পি এড্রেস, লোকেশন, ইমেইল, মোবাইল নম্বর এবং ব্যাক্তিগত নাম পরবর্তী ২৪ ঘন্টার মধ্যে বিটিআরসি কার্যালয়ে ইমেইলে জমা দিতে বলা হয়েছে! নির্দেশনামায় বিটিআরসির সহকারী পরিচালক কোন আইন কিংবা আদালতের আদেশের ভিত্তিতে এ নির্দেশ দিচ্ছেন তা উল্লেখ করেননি!

প্রিয় ব্লগার, আন্তর্জালে বাংলায় বাক স্বাধীনতা রক্ষায় শুরু থেকেই দায়বদ্ধ আমারব্লগ। আর তা যে কোনো মূল্যে অক্ষুন্ন রাখতে আমারব্লগ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলো, আছে এবং থাকবে! সেই দায়বদ্ধতা থেকে আমারব্লগ বিটিআরসি উপরের নির্দেশ প্রত্যাখান করছে। আমার ব্লগ কোন ব্লগারের ব্লগ বাতিল করবে না- আন্তর্জাতিক প্রাইভেসি আইন অনুযায়ী কোন ব্লগারের আই পি এড্রেস, লোকেশন, ইমেইল, মোবাইল নম্বর এবং ব্যাক্তিগত নাম প্রকাশ করবে না।

প্রিয় ব্লগার, এ ব্যাপারে আমরা দেশের একাধিক প্রথিতযশা আইনজীবির সঙ্গে যোগাযোগ করেছি এবং কোন আইনবলে বিটিআরসি কোনো ব্লগারের ব্যক্তিগত তথ্য এবং তাঁর লেখার আর্কাইভের কপি দাবি করেছেন সে ব্যাপারটি খতিয়ে দেখছি। জনপ্রশাসনের এখতিয়ার বহির্ভূত যেকোন হস্তক্ষেপকে আমরা আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করব। আমারব্লগ.কম-এ লেখালেখির জন্য যদি কোনো ব্লগার সরকারি রোষাণলে পড়েন তাহলে আমারব্লগ কর্তৃপক্ষ তাঁর সাধ্যমত সকল প্রকার সহায়তা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে। কোনো ব্লগারের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে হয়রানি করা হলে সেই সংক্ষুব্ধ ব্লগার যদি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ সহ যেকোনো আইনগত ব্যবস্থা নিতে ইচ্ছুক হন, আমারব্লগ.কম এর পক্ষে তাঁকে লিগ্যাল সাপোর্ট দেয়ার যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আমারব্লগ ডটকম-এর এই দৃঢ় অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছেন আরেক প্রধান সারির ব্লগ সাইট মুক্তমনা ডটকম-এর নির্মাতা ও বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়। তিনি প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন:
আমি ‘আমার ব্লগ’-এর এই সাহসী পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই। এটা দরকার ছিল। দেশের চরম দুর্দিনে দরকার এই ঋজু মনোভাবের। কেন তারা ব্লগারদের নাম ধাম, লগইন বৃত্তান্ত, ঠিকানা খোঁজার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন? ভয়টা কোথায়? যেখানে লাগা দরকার সেটা তারা করতে পারছেন না।

ফেসবুকে এখনো বাঁশের কেল্লা আর নিউ বাঁশের কেল্লার মতো সাইট উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের এই সাম্প্রদায়িক উস্কানির বলি হয়ে নির্যাতিত হয়েছেন শত শত সংখ্যালঘু পরিবার। ধর্ষিতা হয়েছেন, গুম খুন হয়েছেন। রেল লাইন উপড়ে ফেলা হয়েছে, হয়েছে হাজার হাজার বৃক্ষ কর্তন। চাঁদে সাইদীর মিথ্যা ছবি প্রচার করে গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষকে সম্মোহিত করার প্রচেষ্টা করেছে। তাদের সাইট বন্ধ হয়নি, বন্ধ করা যায়নি তাদের কর্মকাণ্ড।

আর বাঁশের কেল্লাই বা বলি কেন? বাঁশের কেল্লার চেয়েও উগ্র সাইট বহাল তবিয়তে রাজত্ব করে যাচ্ছে। বন্ধ করতে পারেনি হিযবুত তাহরীরের মত উগ্রবাদী দলগুলোর প্রচারণাও।


অন্যদিকে সচলায়তন ডটকম'কে বিটিআরসি কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো নির্দেশ না দিলেও তারা আগেভাগেই অনড় অবস্থান নিয়েছে। তারা এক পোস্ট বার্তায় বলেছে:
সচলায়তনে লেখকদের নাম, ইমেইল অ্যাড্রেস এবং প্রকাশিত পোস্টের আইপ অ্যাড্রেস ছাড়া আর কোনো তথ্য সংরক্ষণ করা হয় না। কিন্তু আমরা লেখক এবং পাঠকসহ সংশ্লিষ্টদের এটুকু আশ্বাস দিতে চাই যে সচলায়তন সংশ্লিষ্ট সকলের ব্যক্তিগত তথ্য খুব গুরুত্বের সাথে সংরক্ষণ করে এবং বেআইনী কোনো অনুরোধ বা হুমকিতে সচলায়তন এই তথ্য উন্মুক্ত করবে না।
০২. এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিটিআরসি'র ২৪ মার্চ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে [স্মারক নং-বিটিআরসি/প্রশাঃ প্রচার ও বিজ্ঞাপন/২০১২-৫৫৬] জানায়,
সাম্প্রতিককালে গভীর উদ্বেগের সাথে পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, যেমন ফেসবুক, টুইটার এবং ব্লগ সাইটে ইসলাম ধর্ম ও হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) কে কটাক্ষ করে এক শ্রেণীর কুচক্রী মহল উস্কানিমুলক ও কুরুচিপূর্ণ পোস্ট, কমেন্ট,ছবি, কার্টুন ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলাদেশের সহজ, সরল ও ধর্মভীরু মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক হিসেবে বিটিআরসি এসব ঘটনায় তীব্র ঘৃণা ও নিন্দা প্রকাশ করছে। সরকার এসব বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচারও ধর্মীয় সংহতিতে আঘাতকারী প্রচারণা বন্ধে বদ্ধপরিকর। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কর্তৃক এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠিত হয়েছে, যার সদস্য হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি বিটিআরসির কর্মকর্তাও নিয়োজিত রয়েছেন। তাছাড়াও ইন্টারনেটের অপব্যবহার রোধকল্পে বিটিআরসি কর্তৃক নিয়মিত এস এম এস এর মাধ্যমে জনগণকে অবহিত করা হচ্ছে।

মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার বন্ধে এবং মুক্ত চিন্তা ও স্বাধীন মত প্রকাশের স্বার্থে বিটিআরসি জনগণকে সাথে নিয়ে কাজ করার ব্যাপারে সর্বদা সচেষ্ট এবং এ সম্পর্কিত কোন অপপ্রপচারে বিভ্রান্ত না হয়ে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, যেমন ফেসবুক,টুইটার, এবং বিভিন্ন ব্লগ থেকে প্রাপ্ত ধর্মবিদ্বেষী ও কুরুচিপূর্ণ পোস্ট, কমেন্ট ,ছবি, কার্টুন ইত্যাদি সম্পর্কিত তথ্য বিটিআরসিকে অবহিত করে সহযোগিতা করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা যাচ্ছে।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে এসব অপপ্রচার বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ২৯৫/২৯৫(ক)/২৯৮ ধারা ও আইসিটি অ্যাক্ট ২০০৬ এর ৫৭ ধারা এর পরিপন্থী ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং ২০১২ সালের রিট পিটিশন নং- ৮৮৬ এর নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাছাড়াও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০১ এর ৩০(১)(ছ)/৩১(২)(ণ)/৭৩(২)/৮৪(২)-ধারা অনুসারে তথ্য প্রযুক্তির যথাযথ ব্যাবহার নিশ্চিতকরণের লক্ষে বিটিআরসি, টেলিযোগাযোগ লাইসেন্সধারী,ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার এখতিয়ার রাখে এবং উক্ত তথ্য চাহিদানুযায়ী প্রদানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইন অমান্যকারীর আর্থিক জরিমানা ও শাস্তির বিধান রয়েছে।
০৩. বলা ভালো, অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে 'ব্লগ', 'ব্লগার', 'ফেসবুক' ইত্যাদি এখন সাধারণজনের কাছে অনেক পরিচিত শব্দ। কারণ, স্বাধীন বাংলাদেশের ৪২ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট তরুণরা যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি ও জামাতের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শাহবাগ মোড়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। অভূতপূর্ব এই গণজাগরণটি খুব শিগগিরই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। কারণ ৪২ বছর ধরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়া তথা ১৯৭১ এর অমিমাংসিত অধ্যায়টির যৌক্তিক মিমাংসা না হওয়া জনমনে ব্যপক ক্ষোভের সঞ্চার করেছিলো। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় না হওয়ায় এটি গণবিস্ফোরণে পরিণত হয়। দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে তারুণ্যের এই জাগরণ। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ১৯৯২ সালে প্রধান যুদ্ধাপরাধী ও জামাতে ইসলামের তৎকালীন আমীর গোলাম আজমের বিরুদ্ধে গণআদালত গঠন এবং তাকে প্রতীকী ফাঁসির রায় দিয়ে চলমান আন্দোলনটির প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিলেন।

এদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে অপর পক্ষও বসে নেই। ১৯৭১ এর যুদ্ধাপরাধ বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের বিরুদ্ধে জামাত ও ছাত্র শিবির শুরু থেকেই জঙ্গী জেহাদী ভূমিকায় নেমেছে। তারা আগে থেকেই এই ট্রাইবুন্যালের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে 'দেশে গৃহযুদ্ধ বাঁধানো'র হুমকি দিয়ে আসছিলো। প্রজন্ম শাহবাগের অভাবনীয় উত্থানে তারা ঠিকই বুঝেছে এখন তাদের অস্তিত্ব রক্ষাই দিন দিন কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় তারা শাহবাগ আন্দোলন নস্যাত করতে তাদের নিয়ন্ত্রিত মাদ্রাসাগুলোকে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা, দেলোয়ার হোসেন সাঈদীসহ অপরাপর যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে তারা বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে একের পর এক সহিংস হরতাল দিতে থাকে। দেশজুড়ে জামাতি তাণ্ডবে ছয়জন পুলিশসহ নিহত হন অন্তত ৬০ জন। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে ৩৬ টি জেলায় অসংখ্য হিন্দু জনপদে হামলা চালানো হয়। ধ্বংস করা হয় মন্দিরসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অন্তত দুহাজার বাড়িঘর।

দৃশ্যতই এসব সহিংসতায় ১৯৭১ সালের মতোই ধর্মীয় উস্কানিকে সমাবেশ, লিফলেট, ফেসবুক ও জামাত নিয়ন্ত্রিত ব্লগ সাইট ব্যবহার করা হয়েছে। প্রধানত ব্লগাররাই যেহেতু শাহবাগ আন্দোলনের নেতৃত্ব দানকারী, তাকে জামাত ও হেফাজত ইসলাম নামক দুই দলের পক্ষ থেকে এই আন্দোলনকে 'নাস্তিক মুরতাদ'দের আন্দোলন বলে জেহাদী জোয়ার তৈরি করা হয়। গলা কেটে খুন করা হয় আন্দোলনের দুজন সংগঠক ব্লগারকে। গণজাগরণের সংগঠক দুজনের ঘনিষ্ট আত্নীয়কেও জীবন দিতে হয় নৃশংস কায়দায়। জামাতি এই প্রচারণাটি আরো হালে পানি পায় যখন বিএনপি চেয়ারপরসন খালেদা জিয়া নিজেই শাহবাগ আন্দোলনটিকে 'নাস্তিক-নষ্টদের আন্দোলন' বলে চিহ্নিত করেন

তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ‘আন্তর্জাতিক মান’ বজায় রেখে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে।
“আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই। তা হবে আন্তর্জাতিক মানের। ক্ষমতায় গেলে সে বিচার করব।”

“এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই রাজাকার, আওয়ামী লীগেও বহু রাজাকার আছে, তাদের ধরতে হবে, আওয়ামী লীগের ‘এক’ থেকে সবাইকে।”

যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আন্দোলনরত গণজাগরণ মঞ্চের দিকে ইঙ্গিত করে খালেদা বলেন, “সরকার একদিকে শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি করছে, অন্যদিকে ‘বিধর্মী-নাস্তিকদের’ পাহারা দিয়ে লালন-পালন করছে।

“এইসব মঞ্চ-ফঞ্চ বন্ধ না হলে জনগণের মঞ্চ তৈরি হবে।"

০৪. এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের বিটিআরসি এখন ব্লগারদের তথ্য-তালাশে মাঠে নেমেছে। শাহবাগ আন্দোলনের চাপে প্রথমে তারা জামাত নিয়ন্ত্রিত ব্লগ সোনারবাংলা ডটকম-সহ ফেসবুকের কিছু পেজ ব্লক করে দিয়েছে। এখন আবার বিএনপি-জামাতের চাপে ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি সামরিক জান্তার মতো বিটিআরসি ব্লগারদের লুঙ্গি খুলে মুসলমানিত্ব পরীক্ষায় নেমেছে। স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান না নিয়ে সরকারের এই ভ্রান্তনীতি ও দ্বি-চারিতা মৌলবাদী হাতকেই শক্তিশালী করবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্লগাররা মনে করছেন।

সরকার পক্ষ একদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলা, মুক্তি চিন্তার চর্চা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ -- ইত্যাদি গালভাড়ি কথা বলছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীকে কটাক্ষ করায় তারা ২০১০ সালে বেশ কিছুদিনের জন্য বাংলাদেশে ফেসবুক দেখা বন্ধ করে দেয়্। হয়রত মোহাম্মদকে (দ.) নিয়ে অসন্মানজনক চলচ্চিত্র প্রকাশের দোহাই দিয়ে গত ছয় মাস ধরে বন্ধ রাখে টুইটার। এখন আবার অযাচিতভাবে ব্লগের ওপর নেমে আসছে নিত্য নতুন খবরদারি। অবশ্য বাংলা ব্লগ সাইটগুলোকে নিজ নিজ নীতিমালার বাইরে সরকারি শেকলে বাঁধার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে বেশ আগেই। এক বর্ণ ব্লগ না বুঝেই সরকারি আমলারা বরাবরই এর অন্তর্নিহিত অমিত শক্তিতে ভীত-সন্ত্রাস


২০১১ সালের ২১ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন-বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম এক আলোচনা সভায় প্রথম বলেন, কোনো ওয়েবসাইটে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে অশ্লীল বা কুরুচিপূর্ণ কোনো ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করা হলে সেই সাইটটি বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

অন্যদিকে, দেশের প্রথম অনলাইন দৈনিক বিডিনিউজ টোয়েন্টফোর ডটকম-এর প্রধান তৌফিক ইমরোজ খালিদীও সরকারি এই মতটিকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। তিনি বলেন,
একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, দায়িত্বশীল আচরণ করতে ব্যর্থ হলে মাশুল গুণতে হবে সবাইকে। আইন বা বিধিবিধানের বিষয়টি তখনই সামনে আসে যখন স্বাধীনতার অপব্যবহার হয়। স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা হয়। আমাদের সতর্ক থাকবার প্রয়োজন আছে। ইন্টারনেটে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অসতর্কতার পরিণতিতে সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। বেশি দূর যেতে হবে না, বাংলাদেশের গত ৪০ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই দেখা যাবে বিভিন্ন সময়ে কিভাবে গণবিরোধী কাজে কিংবা আইনের শাসনবিরোধী কাজে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমরা ইতিহাস থেকে শিখি না, শিখতে চাই না।
সে সময়ও শৃঙ্খলার নামে সরকারি নিয়ম-নীতিতে বাংলা ব্লগকে বেঁধে ফেলার সুপ্তফনার বিরুদ্ধে ব্লগাররা ব্যপক সোচ্চার হন। এখন অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সব জনমতকে উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত নানান আইনের ধারা-উপধারায় ব্লগিং-কে বন্দী করার পথেই সরকার হাঁটছে। মুখে তাদের যতোই গণতন্ত্র, বাক স্বাধীনতা, মুক্ত চিন্তা, স্বাধীন মত প্রকাশ ইত্যাদি সুমিষ্ট বচন থাকুক না কেন। ...