Monday, December 28, 2015

মুক্তচিন্তায় আঘাতের বছর

  •  
    বিপ্লব রহমান, ঢাকা: ২০১৫ সাল ছিল মুক্তচিন্তার ওপর সশস্ত্র আক্রমণের বছর। এ বছর জঙ্গিরা নৃশংস হামলা চালিয়ে খুন করেছে মুক্তমনা লেখক ও ব্লগার, প্রকাশক, বিদেশি নাগরিক, পুলিশ, পীরসহ বিরুদ্ধ মতের অন্তত ১০ জনকে। বছর জুড়ে অন্তত ডজন দুয়েক নাশকতামূলক জেহাদী তৎপরতার অংশ হিসেবে জঙ্গিরা হামলা করেছে সংখ্যালঘুদের ১২টি উপাসনালয়ে। দৃশত এসব ঘটনার কোনোটিরই এখনো সুবিচার হয়নি।
    একই বছর ঢাকার মিরপুরে অভিযান চালিয়ে পুলিশ সন্ধান পায় গ্রেনেড তৈরির কারখানার। সেখান থেকে হাতেনাতে আটক করা হয় সাতজজনকে। চট্টগ্রামের আরেকটি ঘাঁটি থেকে উদ্ধার করা হয় সেনা বাহিনীর পোশাক, স্নাইপার রাইফেল ও অস্ত্র-শস্ত্র। গাজীপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চলাকালে র‍্যাবের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতে মারা যায় সন্দেহভাজন দুজন। সারাদেশে যৌথবাহিনীর অভিযানে গ্রেফতার হয়েছে অর্ধশতাধিক সন্দেহভাজন জঙ্গি।

    সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হচ্ছে, দেশের জঙ্গিগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এছাড়া দেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী – ‘ইসলামিক স্টেট’ (আইএস) এর কোনো অস্তিত্ব নেই।

    অন্যদিকে, বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের উচিৎ হবে দেশে নতুন করে উত্থান ঘটা জঙ্গিগোষ্ঠীর ক্ষমতাকে খাটো করে না দেখে কঠোর হাতে তাদের দমন করা। অন্যথায় জঙ্গি তৎপরতাকে হালকা দৃষ্টিতে দেখার জন্য দেশকে বড় ধরনের মাশুল গুণতে হতে পারে।

    রোববারই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সাংবাদিকদের বলেন, ‘একের পর এক জঙ্গি আস্তানার সন্ধান পাওয়ায় আতংকিত হওয়ার কিছু নেই।’ জঙ্গি তৎপরতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠুভাবেই হবে।’

    ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের মুখপাত্র, উপ-কমিশনার মারুফ হোসেন সরদার নিউজনেক্সটবিডি ডটকম’কে বলেন একই কথা। তিনি বলেন, ‘জঙ্গিগোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে, এটি যেমন সত্য, তেমনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তৎপর রয়েছে।’

    ডিসি (মিডিয়া) মারুফ দাবি করে বলেন, ‘২০১৫ সাল ছিল জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাফল্যের বছর।’

    এদিকে, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ব্লগার মাসকাওয়াথ আহসান নিউজনেক্সটবিডি ডটকম’কে বলেন, ‘বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি ‘জামায়াতুল মুজাহেদীন’, ‘বাংলাদেশ—জেএমবি’সহ আরো কয়েকটি জঙ্গি গ্রুপের উত্থান গত বিএনপি-জামাতের সময় ঘটে। এসব গ্রুপ ভেতরে ভেতরে সব সময়ই সক্রিয় ছিল। বিএনপি এই জঙ্গিবাদকে যেমন মিডিয়ার সৃষ্টি বলেছিল, আওয়ামী লীগ ঠিক সেই একই ভাষ্য বজায় রেখেছে। এই ধারাবাহিক ডিনাইয়াল বা অস্বীকার প্রবণতা জঙ্গিদের আরো উৎসাহিত করেছে।’

    বিশ্লেষক মাসকাওয়াথ বলেন, ‘বর্তমান সরকার বাংলাদেশে ‘আইএস’ শাখার উপস্থিতির কথা অস্বীকার করার কারণ, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল বিষয়ক সমঝোতায় স্বাক্ষর করেছে; তাতে যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গি দমনের নামে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়ে সিরিয়ার মতো একটি পরিস্থিতি তৈরী করতে পারে। একই কারণে বিগত বিএনপি সরকার বাংলাদেশের জঙ্গিবাদকে আঞ্চলিক বলেছিল। এই কৌশলগত সরকারি অবস্থানে জঙ্গিরা বেশ কিছুটা আত্মবিশ্বাস পেয়েছে। কারণ সরকার তাদের শক্তিমত্তাকে ছোট করে দেখালে আখেরে জঙ্গিদেরই লাভ।’

    তিনি কঠোর হস্তে জঙ্গি তৎপরতা নির্মূল করার জন্যও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

    বিপন্ন মুক্তচিন্তা ২০১৫ সালের শুরুতেই ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে হত্যা করে বিজ্ঞানলেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী অভিজিৎ রায়কে। একইসঙ্গে গুরুতর জখম হন অভিজিতের স্ত্রী, মুক্তমনা ব্লগার বন্যা আহমেদ। পরদিনই এর দায় স্বীকার করে ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’। ফেসবুকে হত্যার হুমকি দেয়ায় পুলিশ শফিউর রহমান ফারাবি নামে এক যুবককে গ্রেফতার করা ছাড়া এ হত্যা মামলার আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।

    ৩০ মার্চ রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার বেগুনবাড়িতে ব্লগার ওয়াশিকুর রহমানকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পালানোর সময় কয়েকজন শিখণ্ডি (হিজড়া) দুই হত্যাকারীকে আটক করে পুলিশে দেয়। গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’।

    ১২ মে সিলেটে খুন হন মুক্তমনা ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস। পুলিশ জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ড আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের স্লিপার সেলের কাজ। হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয় দৈনিকের ফটোসাংবাদিক ইদ্রিস আলীকে গ্রেফতার করে সিআইডি পুলিশ।

    ৭ আগস্ট ঢাকার দক্ষিণ গোড়ানে বাসায় ঢুকে সন্ত্রাসীরা একই কায়দায় খুন করে আরেক মুক্তমনা ব্লগার নীলাদ্রী চট্টোপাধ্যায়কে (২৭)। এ ঘটনায় ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’র দুই অভিযুক্ত জঙ্গি নাহিয়ান ও মাসুদ রানাকে গ্রেফতার করে ডিবি। তবে নভেম্বরে এক সংবাদ সম্মেলনে ব্লগার নিলাদ্রী হত্যায় ‘ছাত্রশিবির’ জড়িত বলে জানায় পুলিশ।

    ৩১ অক্টোবর বিকেলে ঢাকার আজিজ সুপার মার্কেটের কার্যালয়ে ঢুকে ‘জাগৃতি’ প্রকাশনার স্বত্ত্বাধিকারী ফয়সাল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একই দিন সকালে লালমাটিয়ার কার্যালয়ে কুপিয়ে ও গুলি করে সন্ত্রাসীরা গুরুতর জখম করে ‘শুদ্ধস্বর’ এর প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল, ব্লগার রণদীপম বসু ও ব্লগার তারেক রহিমকে। দীপেন ও টুটুল দুজনেই মুক্তমনা অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশক। এই দুই ঘটনাতেও আনসারুল্লাহ বাংলা টিম দায় স্বীকার করে বিবৃতি দেয়। দীপন হত্যার ঘটনায় মুফতি জাহিদ হাসান মারুফ নামে এক মাদ্রাসাশিক্ষককে আটক করা ছাড়া এ ঘটনায় আর কোনো অগ্রগতি নেই।

    নিশানায় বিদেশি
    ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কূটনীতিক পাড়া গুলশানে ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেল্লাকে গুলি করে খুন করে দুর্বৃত্তরা। পরে এ ঘটনায় দায় স্বীকার করে ‘ইসলামিক স্টেট’ (আইএস)। কিন্তু সিজার তাভেল্লা হত্যায় বিএনপির এক শীর্ষ নেতা জড়িত বলে জানান ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘তাভেলাকেই হত্যা করা হবে এমন টার্গেট ছিল না। টার্গেট ছিল যেকেনো সাদা চামড়ার বিদেশি নাগরিক হত্যা। ওই কথিত বড় ভাইয়ের উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে বেকায়দায় ফেলা।’

    এ ঘটনায় মো. রাসেল চৌধুরী ওরফে চাক্কি রাসেল ওরফে বিদ্যুৎ রাসেল, মিনহাজুল আরিফিন রাসেল ওরফে ভাগিনা রাসেল ওরফে কালা রাসেল, তামজিদ আহমেদ রুবেল ওরফে মোবাইল ওরফে শুটার রুবেল এবং শাখাওয়াত হোসেন ওরফে শরীফ নামে কয়েকজনকে গ্রেফতারও করে পুলিশ।

    ৩ অক্টোবর সকালে রংপুরের কাউনিয়ায় মাহিগঞ্জ আলুটারি এলাকায় অজ্ঞাতপরিচয় দুই বন্দুকধারীর গুলিতে জাপানি নাগরিক হোসি কুনিও নিহত হন। পরে আইএসের টুইটার বার্তায় হত্যার দায় স্বীকার করে। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের জানান, হোসি কুনিও হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে আটক জেএমবি নেতা ইসহাক আলী (২৫)।

    হিটলিস্টে পুলিশ ও পীর
    ২২ অক্টোবর ঢাকার গাবতলীর পর্বত সিনেমা হলের সামনে চেকপোস্টে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন এএসআই ইব্রাহিম মোল্লা। এ ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে আনা হয়। পরে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, এ ঘটনাতেও জঙ্গি সংগঠন জড়িত।

    ৪ নভেম্বর সকালে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে আশুলিয়ায় নন্দন পার্কের সামনের চেকপোস্টে দুর্বৃত্তদের চাপাতির কোপে নিহত হন কনস্টেবল মুকুল হোসেন (২৪)। আরেক কনস্টেবল নূরে আলমকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। এ ঘটনাতেও পরদিন দায় স্বীকার করে ‘আইএস’। এ ঘটনার তদন্তেও নেই অগ্রগতি।

    ৫ অক্টোবর রাজধানী মধ্যবাড্ডার এক বাড়িতে পিডিবি’র সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খানকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি ছিলেন ইসলাম ধর্মের নকশাবন্দিয়া মুজাদ্দেদিয়া তরিকার একজন পীর। রহমতিয়া খানকা শরীফের ঢাকার শাখাটিও পরিচালনা করতেন তিনি। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন জেএমবির দুজনকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ।

    তিন মাসে ১২ উপাসনালয়ে হামলা
    ২০১৫ সালের অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে ১২টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা করেছে জঙ্গিরা। এসব হামলায় নিহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন, আহত প্রায় দেড় শতাধিক। পুলিশ তৎপর হয়ে বেশ কয়েকজন অভিযুক্ত জঙ্গিকে আটকও করেছে।

    ২৩ অক্টোবর রাজধানীর পুরান ঢাকায় মহররম উপলক্ষে তাজিয়া মিছিল বের করার সময় রাত আড়াইটার দিকে হোসনি দালান এলাকায় শক্তিশালী বোমা হামলায় সানজুম (২৮) এক যুবক খুন হন। আহত হন অন্তত ৬০ জন। এ ঘটনায় রাজনৈতিকভাবে জামায়াত শিবিরের দিকে ইঙ্গিত করা হলেও জঙ্গি সংশ্লিষ্টতাকেই গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে ডিবি পুলিশ।

    ১০ নভেম্বর মধ্যরাতে রংপুরে কাউনিয়া উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের চেতার মোড়ে মাজারের খাদেম রহমত আলীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়।

    ১৮ নভেম্বর দিনাজপুর শহরের মির্জাপুর বিআরটিসি বাস ডিপোর সামনে ফাদার পিয়ারো পারোলারি নামে এক ইতালীয়কে গুলি করে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

    ২৬ নভেম্বর বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার হরিপুর গ্রামে শিয়া মুসলিমদের আল মোস্তফা মসজিদে দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলিতে মসজিদের মুয়াজ্জিন নিহত এবং তিনজন আহত হন।

    ৫ ডিসেম্বর দিনাজপুরের কান্তজিউর মন্দির প্রাঙ্গণে রাসমেলার একটি যাত্রা প্যান্ডেলে দুর্বৃত্তের ছোড়া হাতবোমা বিস্ফোরণে আহত হন নয়জন।

    ১০ ডিসেম্বর দিনাজপুরের কাহারোলে ইসকন মন্দিরে গুলি ও বোমা ছুড়ে পালানোর সময় স্থানীয় জনতা এক জঙ্গিকে আটক করে পুলিশে দেয়।

    ২৫ ডিসেম্বর জুমার নামাজের সময় রাজশাহীর বাগমারার সৈয়দপুরের মজমইল চকপাড়া আহমদিয়া মুসলিম জামাত জামে মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় এক যুবক নিহত হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন সাতজন।

    নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/বিআর/এনআই/জেডএইচ

    - See more at: http://bangla.newsnextbd.com/article208203.nnbd/#sthash.TrMkqNUY.dpuf