Tuesday, January 28, 2014

কবিগুরুর স্মৃতিধন্য শাহজাদপুর: অধিদপ্তরই বদলে দিল রবীন্দ্র কাছারিবাড়ি


বিপ্লব রহমান ও আতাউর রহমান পিন্টু, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) থেকে ফিরে
‘ভালবেসে সখী নিভৃত যতনে, আমার নামটি লিখ, তোমার মনেরও মন্দিরে...।’ অমর এই গীতসহ শতাধিক অমূল্য রচনা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন শাহজাদপুরের কাছারিবাড়িতে বসে, ১৮৯০ থেকে ১৮৯৬- এই সাত সালে। ১৮৯৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর শাহজাদপুর থেকে লেখা এক চিঠিতে বলেন, ‘এখানে যেমন আমার মনে লেখার ভাব ও ইচ্ছা আসে, এমন কোথাও না।’ কবিগুরুর প্রিয় শাহজাদপুরের কাছারিবাড়ির স্মৃতিও এখন সুরক্ষিত নয়।
 


‘কোন ব্যক্তি এই পুরাকীর্তির কোন রকম ধ্বংস বা অনিষ্ট সাধন করলে বা এর কোন বিকৃতি বা অঙ্গচ্ছেদ ঘটালে বা এর কোন অংশের উপর কিছু লিখলে বা খোদাই করলে বা কোন চিহ্ন বা দাগ কাটলে, ১৯৬৮ সালের ১৪ নং পুরাকীর্তি আইনের ১৯ ধারার অধীনে তিনি সর্বাধিক এক বৎসর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা অথবা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।’ কাছারিবাড়ির ফটকে টিনের ছোট ফলকে লেখা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নোটিশ এটি। কিন্তু অধিদপ্তর নিজেই কি মানছে এ নির্দেশনা?

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অধিদপ্তর কয়েক দফা বাড়ির মূল কাঠামো ও নকশার পরিবর্তন করেছে। ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্য শৈলীর দোতলা ভবনের লাল রং গত সাতের দশকে পরিবর্তন হলুদ রঙে চুনকাম করা হয়েছে। আটের দশকে দেয়াল তুলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে দোতলার পশ্চিম দিকের অন্তত তিনটি জানালা (ফ্রেঞ্চ উইন্ডো)। সে সময় একই অংশের নিচতলার একটি জানালার গ্রিক প্যাটার্নের খিলানেও আনা হয়েছে পরিবর্তন। দোতলার উত্তরাংশের আরেকটি ফ্রেঞ্চ উইন্ডো এবং পূর্ব দিকের দরজাও ঢেকে ফেলা হয়েছে দেয়াল দিয়ে। একইভাবে বাড়ির পূর্ব দিকে রবীন্দ্রনাথের খোঁড়া সুপেয় পানির পাতকুয়াটি বুজিয়ে ফেলা হয়েছে সিমেন্ট ঢালাই করে। ভবনের পশ্চিম দিকের মূল সীমানাপ্রাচীরের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে বাড়তি দেয়াল।

বর্ষাকালে কবিগুরু বজরা নৌকায় চড়ে করতোয়া নদীর শাখা ‘ছোট নদী’ বা ‘খোনকারের জোলা’ দিয়ে কাছারিবাড়ির উত্তরাংশের ঘাটে এসে নামতেন। গত নয়ের দশকে পৌরসভা কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) প্রকল্পের নামে ট্রাকে করে মাটি ফেলে উধাও করে দিয়েছে নদীটি। এদিকে বাড়ির আঙিনায় ব্রিটিশ নীলকরদের প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত কুঠিবাড়ি ও এর আশপাশে কয়েকটি ঝুপড়িঘর তুলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মচারীরা বাস করছেন সপরিবারে।

কাছারিবাড়ির গ্রন্থাগারের পরিচালক মোশাররফ হোসেন ১৯৮৮ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি যখন কাজে যোগ দিই তখনো নদীটি দিয়ে প্রচুর নৌকা চলাচল করত। কিন্তু ১৯৯৫-৯৬ সালে দ্বারিয়াপুর বাজার সম্প্রসারণের নামে পৌরসভা এটি ভরাট করে ফেলে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আপত্তিও তারা শোনেনি।’

মূল ভবনের কাঠামো পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে চাইলে মোশাররফ হোসেন জানান, ১৯৬৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর জরাজীর্ণ অবস্থায় ভবনটিকে অধিগ্রহণ করে। এরপর দফায় দফায় এর সংস্কার হয়েছে। প্রথম দফায় একতলা ও দোতলার ছাদ পুনর্নির্মাণসহ সংস্কার করা হয় এর বেশ কিছু অংশ। সম্ভবত সে সময়ই ভবনের মূল লাল রং বদলে ফেলা হয়; বুজিয়ে ফেলা হয় কয়েকটি দরজা-জানালা ও পাতকুয়া। দ্বিতীয় দফায় ১৯৮৮ থেকে ১৯৯০ সালে আবারও সংস্কার করা হয় ভবনে। সব শেষে দুই বছর আগে ভবনটিতে হলুদ চুনকাম করা হয়েছে।

কাছারিবাড়ির কাস্টডিয়ান মুজিবুর রহমান অধিদপ্তরের উদ্যোগে ঐতিহাসিক জগদল বিহার খননকাজের জন্য অবস্থান করছেন নওগাঁয়। তিনি টেলিফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার দায়িত্বকালে রবীন্দ্র ভবন বা এর কোনো অংশে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। বহু আগে সংস্কারের সময় এটি হতে পারে। ভবন বা এর অন্যান্য স্থাপনায় মূল নকশার পরিবর্তন কোথায়, কতটুকু করা হয়েছে, তা নিবিড় গবেষণার বিষয়। এ সম্পর্কে যথেষ্ট খোঁজখবর নিয়ে তবেই মন্তব্য করা সম্ভব।’

কাছারিবাড়ির প্রাঙ্গণে অধিদপ্তরের কর্মচারীদের বসবাস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেশ কয়েক বছর আগে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত নীলকরদের কুঠিবাড়ির একাংশে একতলা কয়েকটি পাকা ঘর তুলে পৌর ভূমি অফিসের কার্যক্রম চলেছে। তারা সেখান থেকে শাহজাদপুরের অন্যত্র অফিস স্থানান্তরের পর কর্মচারীরা পরিত্যক্ত ঘরগুলো আবাসনের জন্য ব্যবহার করছেন। তাঁরা নতুন করে কোনো ঘরবাড়ি তৈরি করেননি।

একনজরে : ১৯৬৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনটিকে পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। কাছারিবাড়ির ভবনটি এখন রবীন্দ্র জাদুঘর হিসেবে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। নিচতলায় কবির বেশ কিছু দুর্লভ আলোকচিত্র ও পাণ্ডুলিপির অনুলিপি প্রদর্শিত হচ্ছে। দোতলায় রয়েছে কবির ব্যবহৃত লেখার চেয়ার-টেবিলসহ অর্ধশতাধিক দর্শনীয় সামাগ্রী। স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং ১৯৭৪-৭৫ সালে রক্ষীবাহিনী কাছারিবাড়িটিকে দুই দফায় ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করে। সে সময় লুট হয় বেশ কিছু মূল্যবান সামগ্রী।

ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত দোতলা এ বাড়ি দৈর্ঘ্যে ২৬ দশমিক ৮৫, প্রস্থে ১০ দশমিক ২০ এবং উচ্চতায় ৮ দশমিক ৭৪ মিটার। সিঁড়িঘর ছাড়া প্রতি তলায় বিভিন্ন মাপের সাতটি করে কক্ষ রয়েছে। ভবনের উত্তর ও দক্ষিণাংশে রয়েছে একই মাপের চওড়া বারান্দা। বাড়ির গোলাকৃতি জোড়া থামের ওপরাংশে অলংকরণ, বড় মাপের দরজা-জানালা এবং ছাদের ওপরে প্যারাপেট ও দেয়ালে পোড়ামাটির কাজ রয়েছে। ঠাকুর পরিবারে জমিদারি ভাগাভাগির ফলে শাহজাদপুরের জমিদারি চলে যায় রবীন্দ্রনাথের অন্য শরিকদের হাতে। তাই ১৮৯৬ সালে কবিগুরু শেষবারের মতো শাহজাদপুর থেকে চলে যান।

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2014/01/28/45973#sthash.sIPIGnd6.dpuf