Saturday, March 26, 2016

বেতারে ‘অপারেশন সার্চলাইট’

বিপ্লব রহমান, ঢাকা: ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কারফিউ জারি করে বিদ্রোহ দমন করার নামে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, এর সামরিক অভিধা ছিল— ‘অপারেশন সার্চলাইট’।
এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে মুক্তিকামী বাঙালি জনতার স্বাধীনতার সংগ্রামকে মেশিনগানের গুলিতে স্তব্ধ করে দেয়ার ঘৃণ্য প্রচেষ্টা। পাশাপাশি মুক্তিকামী বাঙালি জনতার প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধও হয়েছিল ওই রাতে।

প্রচণ্ড গোলাবর্ষনের ভেতর জীবন ঝুঁকি নিয়ে ২৫ মার্চ রাতে ঢাকার খিলগাঁর চৌধুরীপাড়ার বাসায় বসে নিজস্ব প্রযুক্তিতে আণবিক শক্তি কেন্দ্রের পদার্থ বিজ্ঞানবিদ ড. এম এম হোসাইন রেকর্ড করেছিলেন পাকিস্তানি সেনাদের বেতারবার্তা। সেদিন রাত দেড়টা থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত ধারণকৃত এই বেতারবার্তা এখন পাক বর্বরতার আরো এক জীবন্ত দলিল। ২৫ মার্চের গণহত্যার খণ্ডচিত্রের অনেকটাই স্পষ্ট ধরা পড়ে খোদ পাক সেনাদের বেতারের কথোপকথনে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এম-২৪ ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যান, কামান, মেশিনগান, রিকোয়েলস রাইফেল নিয়ে পাক সামরিক জান্তা সে রাতে অভিযান চালিয়েছিল ঘুমন্ত নগরবাসীর ওপর। ভয়াল ওই কালো রাতে অন্তত পাঁচ হাজার বেসামরিক জনতাকে প্রাণ দিতে হয়েছিল।
স্বাধীনতার এতো বছর পর কিছুদিন আগে ইংরেজি-উর্দুতে মেশানো দীর্ঘ এই বেতারবার্তাটি সংগ্রহ ও পাঠোদ্ধার করেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও ব্লগার অমি রহমান পিয়াল।

ড. এম এম হোসাইনের রেকর্ডকৃত বেতারবার্তার ধারাভাষ্যে দেখা যায়, পাকসেনারা নিজস্ব কিছু সামরিক সংকেত ব্যবহার করে কথোপকথন চালাচ্ছেন। উর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা নির্দেশ দিচ্ছেন ‘জয় বাংলা’র আন্দোলন নির্মমভাবে দমন করতে। বেতার বার্তার ধারাভাষ্যে বিদ্রোহে বিক্ষুব্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানায় অপারেশনের দায়িত্বে থাকা সেনা ইউনিটগুলোর বাঙালি নিধনের খণ্ডচিত্র ধরা পড়ে। একই সঙ্গে স্পষ্ট হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধের লড়াইও।

পাক সেনাদের বেতারবার্তার কথোপকথনে 'ইমাম' বলতে গ্রুপ কমান্ডার ও 'মেইন বার্ড' বলতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বোঝানো হয়েছে।
ওই বেতারবার্তার ধারাভাষ্যে দেখা যায়, কন্ট্রোল রুম ২৬, ৭৭, ৮৮ ও ৯৯ নম্বর ইউনিটকে নির্দেশ দিয়ে বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ও ইকবাল হলসহ (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক ছাত্রাবাস) ক্যাম্পাস এলাকার বড় বড় ভবন গুঁড়িয়ে দিতে। এই ছাত্রাবাস দুটি থেকে আসা পাল্টা প্রতিরোধ যুদ্ধ স্তব্ধ করার জন্যও ইউনিটগুলোকে বারবার নির্দেশ দেওয়া হয়।

একই সঙ্গে বেতারে বার বার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয় যে, সামরিক ইউনিটগুলো যেন মাইকে কারফিউ জারির ঘোষণা অব্যহত রাখে। পাশাপাশি তারা যেন সতর্ক থাকে, কোথাও যাতে স্বাধীন বাংলার পতাকা বা কালো পতাকা না ওড়ে। আর পতাকা ওড়ানো বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়।

পাক সেনাবাহিনীর কন্ট্রোল রুম থেকে ইউনিটগুলোকে আরো নির্দেশ দেয়া হয়, ঢাকার প্রধান সড়কগুলো থেকে ব্যারিকেড সরিয়ে ফেলার জন্য। সেনাদের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়, যেখানেই ব্যারিকেড দেখা যাবে, এর আশপাশের ঘরবাড়িতে যেন গুলি চালানো হয়।

বেতারবার্তার ধারাভাষ্যে দেখা যায়, একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানায় সামরিক অভিযান চালানোর সময় পাকিস্তানি সেনারা পাল্টা প্রতিরোধ লড়াইয়ের মুখোমুখি হন।

কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে ৪১, ৫৫, ৮৮, ৯৯ ও ২০০০ নম্বর ইউনিটের কথোপকথনে দেখা যায়, অভিযানের শুরুতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা এই তিনটি স্থান দখল করতে পারেনি। বরং রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানায় কঠিন প্রতিরোধ যুদ্ধ চলেছে।

পুলিশের ও তৎকালীন সীমান্তরক্ষী ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস—ইপিআর’র মুক্তিকামী বাঙালিরা প্রধানত থ্রি নট থ্রি রাইফেল ও হালকা অস্ত্র-শস্ত্র সম্বল করে পাকিস্তানি সেনাদের ভারী অস্ত্রশস্ত্রের বিরুদ্ধে আমরণ লড়াই করেন। এমনকি একপর্যায়ে হামলাকারীরা শক্তি বৃদ্ধি করতে সেনানিবাস থেকে গোলন্দাজ বাহিনীও তলব করতে হয়। স্থানীয় সেনা ইউনিটগুলো আহত বেশ কজন পাকিস্তানি সেনাকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করার বিষয়েও কন্ট্রোল রুমকে অবহিত করে।

অন্যদিকে কন্ট্রোল রুম ৪১ নম্বর ইউনিটকে নির্দেশ দেয়, আক্রমণের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার (পলাশী, ফুলবাড়িয়া) রেললাইন দিয়ে যেন কেউ পালাতে না পারে।

তেমন কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই পাকিস্তানি সেনারা ওই রাতে টেলিভিশন ও রেডিও’র সদর দপ্তর, রমনা থানা, কমলাপুর থানা এবং টেলিফোন এক্সচেঞ্জ দখল করে। একই সঙ্গে তারা বুড়িগঙ্গা নদীতেও নামায় গানবোট।

পাকিস্তানি সেনাদের ওই বেতারবার্তায় ধরা পড়ে, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, শাহবাগের পিপলস ডেইলি সংবাদপত্র ধ্বংস করে দেওয়া হয়। 'সেখানে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে', কন্ট্রোল রুমের কাছে স্থানীয় ৯৯ ও ৮৮ নম্বর সেনা ইউনিট এমন রিপোর্টও করে। ৪১ নম্বর ইউনিট কন্ট্রোল রুমের কাছে জানতে চায়, মোহাম্মদপুরের শারীরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (পরে সেখানে আলবদর সদর দপ্তর ও রাজাকারদের টর্চার সেল বসানো হয়) এলাকায় রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টিকারী যেসব 'দুষ্কৃতকারী'কে আটক করা হয়েছে, তাদের মেরে ফেলা হবে কি না। জবাবে বলা হয় তাদের দিয়ে ব্যারিকেড সরিয়ে ফেলতে। 'খতম'-এর বিষয়ে পরে জানানো হবে।

অপর বার্তায় দেখা যায়, কন্ট্রোল রুম ২৬ নম্বর ইউনিটের কাছে জানতে চায় আলফা-লিমা (আওয়ামী লীগ-এর সামরিক সংকেত) কার্যালয় দখল করা হয়েছে কি না। জবাবে বলা হয়, সেটি ভোর বেলায় দখল করা হবে। কন্ট্রোল রুম বারবার ২৬ ও ৭৭ নম্বর ইউনিটকে নির্দেশ দেয়, ভোর হওয়ার আগেই যেন সব লাশ সরিয়ে ফেলা হয়। এই বার্তা উর্দুতে অন্যান্য ইউনিটের কাছে পুনঃপ্রচার করার জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়।

নিউজনেক্সটিবিডি ডটকম/বিআর--
More: http://bangla.newsnextbd.com/article225992.nnbd/