Wednesday, February 17, 2016

‘চিন্তা-চর্চা খুন হবে কেন’

বিপ্লব রহমান, ঢাকা: জঙ্গি হামলায় নিহত মুক্তমনা ব্লগার অভিজিৎ রায় ও তার প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দিপনের নামে এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলা উৎসর্গ করা উচিত ছিল বলে মনে করেন ‘সংহতি’র প্রকাশক দীপক কুমার রায়।

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম’এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ‘একুশের বইমেলা অভিজিৎ-দিপনকে উৎসর্গ করা উচিৎ ছিল। অন্তত ভাষা আন্দোলন, আর তার স্পিরিট আমাদের তাই বলে। একুশের চেতনা হচ্ছে ‘মাথা নত না করা’। মেলা কর্তৃপক্ষ কেন তাদের উপেক্ষা করছেন, তাদের সে প্রশ্ন করা দরকার।’
মুক্তচিন্তার ওপর জঙ্গিগোষ্ঠীর ধারাবাহিক আঘাতের প্রসঙ্গে দীপক রায় বলেন, ‘দেশজুড়ে সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে নিরাপত্তাহীনতা। আমরা লেখক-শিল্পী-প্রকাশকসহ সাধারণ মানুষ এসব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান চাই। হত্যা-গুম-খুন বন্ধ চাই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব খুনের সংস্কৃতি বন্ধ করতে উদ্যোগ নেয়া। মানুষের মত প্রদান, চিন্তা-চর্চা রূদ্ধ হবে কেন? খুন হবে কেন?’
‘কারা, কোথা থেকে মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে, অবিলম্বে তা খুঁজতে হবে’- সোচ্চার দাবি তোলে তরুণ এই প্রকাশক আরো বলেন, ‘যতটুকু ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, তা বন্ধ করতে হবে এখনই, সকল পক্ষকেই। জ্ঞানী-সাধারণ, শিল্পী-অশিল্পী, অভিজাত-অনভিজাত, প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক, তথাকথিত আধুনিক বা রক্ষণশীল– সকলকে উপলব্ধি করতে হবে যে, আমরা মানুষ।’
প্রগতিশীল ও মান সম্পন্ন বই প্রকাশে সংহতি প্রকাশন দায়বদ্ধ’- উল্লেখ করে দীপক রায় জানান, তারা একুশের মেলায় বই প্রকাশের ক্ষেত্রে এবার ইতিহাস, দর্শন, সমাজতত্ত্ব, রাজনীতি, ধর্মতত্ত, মুক্তিযুদ্ধ, নারী, শিল্পকলা, ফোকলোর, চিরায়ত বিশ্ব সাহিত্য এবং বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক অনুবাদকে প্রাধ্যন্য দিচ্ছেন।
তিনি জানান, মেলায় ‘সংহতি’র ৪১৩-৪১৪ নম্বর স্টলে এ পর্যন্ত তারা নতুন যেসব বই এনেছেন, সেগুলো হচ্ছে: চিঙ্গিজ আইতমাতভের ‘জামিলা’ [অনুবাদ-খালেদ চৌধুরী, প্রচ্ছদ-অমল আকাশ, দাম ১৩০ টাকা], মজনু-নুল-হকের বিলেতে বাংলার যুদ্ধ [প্রচ্ছদ-শতাব্দী জাহিদ, দাম-২০০টাকা], আইজ্যাক সিঙ্গারের ছোটগল্প [প্রচ্ছদ-সব্যসাচী হাজরা, দাম-৩৫০টাকা], বিরঞ্জন রায়ের ‘সামাজিক চেতনার মনস্তত্ত্ব’ [প্রচ্ছদ-অমল আকাশ, দাম-৩৭৫টাকা], সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘জাতীয়তাবাদ সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি’ [পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ, প্রচ্ছদ-সব্যসাচী হাজরা, দাম-এক হাজার টাকা]। এছাড়া প্রায় প্রতিদিনই নতুন বই প্রকাশ করছেন তারা।
বইমেলার স্টল বিন্যাস নিয়েও কথা বলেন দীপক রায়। বলেন, ‘বই মেলা সবসময়ই প্রেরণাদায়ক। তবে এবারের বইমেলার স্টল বিন্যাসে ও বিস্তৃর্ এলাকাজুড়ে গুচ্ছ গুচ্ছ কাঠামো সাজানোয় বড় ধরনের অসামঞ্জস্য ঘটেছে। মেলায় ঢুকে ফোয়ারা পার হলেই, কিংবা ইটের রাস্তা ধরে কিছুদুর এসে মানুষ খেই হারিয়ে ফেলছেন। কেমন যেন খোপ খোপ একটা ব্যাপার। ফলে ভেতরের দিকের, আর প্রান্তের দোকানগুলোয় ক্রেতারা আসছেন না। এছাড়া আলোর ঘাটতি মেলার সৌন্দর্যই কমিয়ে দিয়েছে; বসার জন্য জায়গা নেই; আড্ডা দেয়ার পরিবেশ নেই; ক্রেতারা ক্লান্ত হয়ে পুরো মেলা না ঘুরেই ফিরে যাচ্ছেন। সর্বত্রই একটি বিশৃঙ্খল, এলামেলো অবস্থা।
‘সংহতি প্রকাশক’ মনে করেন, এখন সময় এসেছে প্রকাশনাকে শিল্প হিসেবে গড়ে তোলার। তিনি বলেন, ‘শুধু একুশের বইমেলা কেন্দ্রীক নয়, বছর জুড়ে বই কেনাবেচার পরিকল্পিত আয়োজন থাকতে হবে। সারা বছর সরকার কেনে মাত্র এক কোটি টাকার বই। এটি চলবে না। দেশব্যাপী শিক্ষা ও জ্ঞান বিস্তারে কিনতে হবে অনেক টাকার বই। ভূয়া লাইব্রেরির নামে বই কেনা বন্ধ করতে হবে।’
‘বইমেলা ও বইয়ের সংস্কৃতিকে দেশজুড়ে ছড়াতে হলে লেখকদের কাজ করার পাশাপাশি দিতে হবে গবেষণার পরিবেশ। প্রকাশনাকে শিল্প হিসাবে দাঁড় করাতে মূদ্রণ ও কাগজের খাতে দিতে হবে ভর্তুকি। সর্বপরি চাই ‘বই ও প্রকাশনা’ নিয়ে যথাযথ নীতিমালা’, যোগ করেন তিনি।
দীপক জানান, তাদের প্রকাশিত বইগুলোর কদর সব বইমেলাতেই থাকে। পুরনো বইগুলোও অনেক পাঠক তালিকা ধরে খুঁজে কেনেন। আর এই বইমেলায় বেশি চলছে- ‘সোফির জগত’, ‘বিদায় গুলসারি’, ‘নিজের একটি কামরা’, ‘হাত বাড়িয়ে দাও’, ‘ক্রুসেডস্: দ্য ফ্লেইম অভ ইসলাম’, ‘রবীন্দ্রনাথ: অন্য ভাষায় অন্য আলোয়’, ‘নজরুলকে চিনতে চাওয়া’, ‘নারী-পুরুষ বৈষম্য’, ‘নারী, পুরুষ ও সমাজ’, ‘সভ্যতার অসন্তোষ’, ‘পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ’ ‘একটি দৃষ্টিভ্রমের ভবিষ্যৎ’ ‘লেখক মানস: দাম্পত্য সম্পর্ক’ ইত্যাদি বই।
পাঠক চাহিদার কথা চিন্তা করে মূদ্রিত বইয়ের পাশাপাশি ইলেক্ট্রনিক বুক বা ই-বুকের দিকে ঝুঁকছে ‘সংহতি প্রকাশন’ উল্লেখ করে দীপক রায় বলেন, ‘আমাদের ওয়েবসাইট [samhati.com] এ বই, বইয়ের প্রচ্ছদ এবং বই সম্পকির্ত অন্যান্য তথ্য পাঠক সহজেই পাবেন। সাইটটিকে আরো আকর্ষণ করার চেষ্টা চলছে।’
নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/বিআর/এফআর
- See more at: http://bangla.newsnextbd.com/article218411.nnbd/