Wednesday, July 8, 2015

চাকমা ভাষা এখন মোবাইলে



 
 বিপ্লব রহমান, ঢাকা : এবার চাকমা ভাষায় লেখালেখির জন্য তৈরি হচ্ছে মোবাইল অ্যাপস। বাংলা ও ইংরেজীর পর দেশে তৃতীয় কোনো ভাষায় মোবাইল ফোন থেকে লেখালেখি সম্ভব। আর মোবাইল ফোনে ভাষাগত সংখ্যালঘুর ভাষার সংযোজন এটি প্রথম।


একটি বেসরকারি এফএম রেডিও’র প্রকৌশলী জ্যোতি চাকমা এবং আরেকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সুজ মরিজ চাকমা মোবাইলে চাকমা ভাষায় লেখালেখির এই প্রযুক্তির উদ্ভাবক। তারা জানিয়েছেন, বছর দুয়েক আগে ‘রিবেং ইউনি’ নামে এ ভাষার ইউনিকোড ফন্ট তৈরী করেন। এতে করে ইতোমধ্যে বিলুপ্ত প্রায় লেখ্য ভাষাটি প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করেছে।

উৎসাহী চাকমা ভাষাভাষীরা এখন এই ফন্ট ব্যবহার করে কম্পিউটারে বইপত্রসহ সব ধরণের লেখালেখি করছেন। ফেসবুক, ব্লগ, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেও তারা নিজ ভাষাতেই লিখতে পারছেন।

সব মিলিয়ে ক্রমেই বাড়ছে প্রাচীণ এ ভাষার প্রসার। এর আগে ইউনিকোডে চাকমা ফন্ট না থাকায় সংশ্লিষ্টরা বাধ্য হয়ে অন্তর্জালে বাংলা বা ইংরেজি হরফে চাকমা ভাষায় লেখালেখি করতেন।

চাকমা ইউনিকোড ফন্ট ‘রিবেং ইউনি’র নির্মাতা জ্যোতি চাকমা ও তার বন্ধু সুজ মরিজ চাকমা নিউজনেক্সটবিডি ডটকম-কে জানান, এ কাজে তাদের সহায়তা করেন পোল্যান্ডের গবেষক জান জুরাস্কি। প্রথমে তারা ভাষা গবেষকদের সহায়তায় প্রাচীন চাকমা লিপিটিকে সুসংহত করে এর নাম দেন ‘আলাম’। বছর খানেক চেষ্টা চালানো হয় ফন্টটিকে ইউনিকোডে রূপান্তরের জন্য। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তারা চাকমালিপি ইউনিকোডে রূপান্তরে সক্ষম হন।

তারা আরো জানান, ইউনিডট হিলএডু ডটকম – ওয়েবসাইটটি থেকে বিনামূল্যে ‘রিবেং ইউনি’ চাকমা ইউনিকোড ফন্ট ও কিবোর্ড লে-আউট সফটওয়্যার ডাউনলোড করা যাবে। সাইটটি থেকে একই সঙ্গে পাওয়া যাবে কম্পিউটারে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে সেটিংস এবং ফন্টটির নানা খুঁটিনাটি তথ্যও। সাইটটিতে ‘রিবেং ইউনি’ ফন্ট ব্যবহারের নির্দেশাবলিও দেওয়া আছে। এছাড়া প্রযুক্তিগত সহায়তা ও ফন্ট নিয়ে আলোচনার জন্য সাইটে যোগ করা হয়েছে একটি বিশেষ পাতা।

মোবাইলে চাকমা ভাষা : ‘চাকমা ভাষা কম্পিউটারে সীমাবদ্ধ না রেখে হাতের মুঠোয় আনার চেষ্টা অনেকদিনের’, এ তথ্য জানিয়ে রাঙামাটির যুবক জ্যোতি চাকমা নিউজনেক্সটবিডি ডটকম’কে বলেন, ‘এ জন্য আমরা বিভিন্ন সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করেছি। তরুণ প্রজন্ম তথ্য আদান-প্রদানে এন্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টমের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল বলে চেয়েছিলাম আমাদের মাতৃভাষা চাকমাকে অ্যানড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমে আনতে। অ্যান্ড্রয়েড এপস নির্মাতা যুক্তরাষ্ট্রের হেনসো’র (ইউএস) সহায়তায় আমরা প্রথম চাকমা অ্যান্ড্রয়েড কি-বোর্ড তৈরিতে সক্ষম হই।’

জ্যোতি চাকমা জানান, অ্যাপসটি পরীক্ষামূলকভাবে চলতি মাসের প্রথমদিন গুগল প্লে স্টোরে অবমুক্ত করা হয়েছে। আগ্রহী যে কেউ এটি বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারবেন। ভবিষ্যতে এটিকে আরো উন্নত করা হবে।

তিনি বলেন, ‘এছাড়া আমরা আরেকটি অ্যান্ড্রয়েড ফনেটিক অ্যাপস তৈরি করছি। শিগগিরই এটিও অবমুক্ত করবো। ভবিষ্যতে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে আইফোন, ম্যাক অপারেটিং সিস্টেমে সফটওয়্যার তৈরি করার।’

অন্তর্জালে ক্ষুদ্রজাতির ভাষা : গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ৭৫টি ভাষাগত সংখ্যালঘু ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠি বসবাস করেন। তাদের জনসংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ। এর মধ্যে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর পরই চাকমারা সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি। পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি ও ১৩টি পাহাড়ি জনগোষ্ঠি মিলিয়ে প্রায় ১৬ লাখ লোকের বাস। এদের প্রায় অর্ধেকই পাহাড়ি। আবার তাদের মধ্যে চার লাখেরও বেশি চাকমা জনগোষ্ঠী। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, অরুণাচল, মিজোরামসহ অন্যান্য অঞ্চলে রয়েছে অল্প কিছু চাকমা জাতিগোষ্ঠির বাস।

বর্তমানে বিশ্বে ১০০টি লিপি ইউনিকোডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নানা ভাষার এক লাখ দশ হাজার ১৮১টি অক্ষর স্থান পেয়েছে ইউনিকোডে। চাকমা ভাষায় ইউনিকোড ‘রিবেং ইউনি’ব্যবহার করে এখন মুক্ত বিশ্বকোষ ইউকিপিডিয়া লেখার কাজও চলছে। বাংলা ভাষাতে ইউকি নির্মাণ হয়েছে আগেই। বাংলাদেশের অপর দুই আদিবাসীর ভাষা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা ও সাঁওতালী উইকিতে যুক্ত হওয়ার কাজ এখন দ্রুত এগিয়ে চলছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কম্পিউটার বিজ্ঞানী ড. রাগিব হাসান নিউজনেক্সটবিডি ডটকম’কে বলেন, ‘অনলাইনে ও মোবাইলে চাকমা ভাষা বিস্তারের এই উদ্যোগকে স্বাগতম জানাই। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে যে সব ভাষায় মোবাইলে বা ইন্টারনেটে কথা বলা, লেখালেখি করা, এসবের সুযোগ নেই, সে সব ভাষা বেশ হুমকির মুখে রয়েছে। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে অনেক সমৃদ্ধ ভাষার সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ঐতিহ্যকে হারাবার ভয় থাকে।’

বাংলা ইউকিপিডিয়া’র অন্যতম উদ্যোক্তা রাগিব হাসান আরো বলেন, ‘তাই চাকমা ভাষায় লেখালেখি করার এই ব্যবস্থাটি চাকমা ভাষার বিকাশ, ব্যবহার ও প্রসারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। আশা করি বাংলা ও চাকমা ছাড়াও দেশের অন্যান্য সব ভাষাতে এভাবে লেখার সুযোগ সেসব ভাষাভাষীরা পাবেন। নিজের ভাষায়, নিজের হরফে লেখার আনন্দই তো আলাদা।’

নিউজনেক্সটবিডি ডটকম/বিআর/এসএ

- See more at: http://bangla.newsnextbd.com/article176660.nnbd/#sthash.MwjauDEY.dpuf