Friday, April 24, 2015

উদ্ভাবন: আগাছায় ফসলের বিষ দূর


ভূগর্ভস্থ পানিতে চাষবাস করায় খাদ্যদ্রব্যের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আমাদের দেহে প্রবেশ করছে মারাত্মক বিষ আর্সেনিক। আর ঘাতক ব্যাধি ক্যান্সারসহ নানা রোগবালাইয়ের কারণ এই আর্সেনিকের দূষণ। সরকারি হিসাবে দেশের ৫৯টি জেলারই ভূগর্ভস্থ পানিতে রয়েছে অতিমাত্রায় আর্সেনিক। শুধু শেরপুর, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এখন পর্যন্ত এই বিষমুক্ত রয়েছে। এমনই যখন ভয়াল কৃষিচিত্র, তখন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শোনাচ্ছে আশার কথা। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের নিরলস গবেষণায় দেখা গেছে, এক ধরনের ফার্ন জাতীয় আগাছা ফসলকে সহজেই আর্সেনিকমুক্ত করতে সক্ষম।

গবেষণায় দেখা গেছে, 'টেরিস ভিটাটা' (Pteris Vittata) নামের অতি পরিচিত ফার্ন গাছ কৃষিজমি থেকে প্রচুর পরিমাণে আর্সেনিক শোষণ করে জমি ও ফসলকে আর্সেনিকমুক্ত করতে সক্ষম। চাষের জমিতে ফসলের পাশাপাশি এই 'আগাছা'র চারাও ছিটিয়ে দিতে হয়। আর পরে নিড়ানি দিয়ে জমিকে 'আগাছা'মুক্ত করলেই হলো। এতে বাড়তি খরচ প্রায় নেই। প্রথম দিক ২০০৯ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল উৎসাহী ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের ছাত্র-শিক্ষক যৌথভাবে গবেষণার কাজ শুরু করেন। তাঁরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, চীন, থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা ধইঞ্চাসহ আরো কয়েক রকমের গাছগাছড়ায় কৃষিজমিকে আর্সেনিকমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এর মধ্যে কয়েক ধরনের ফার্নও রয়েছে। তখন দেশীয় গবেষকরা বাংলাদেশের আবহাওয়ায় খুব সহজে দ্রুত বেড়ে ওঠে- এমন ফার্ন ও লতাগুল্ম নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তাঁরা সন্ধান পান 'টেরিস ভিটাটা' নামের অতি পরিচিত ফার্ন গাছের। এটি সাধারণত ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে জায়গায় জন্মে। বীজের বদলে এটি সরাসরি গোড়া থেকে জন্মানো চারাগাছের মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধি করে।

বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (হু) মতে, খাদ্যদ্রব্যে দৈনিক মাত্র এক পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) আর্সেনিক আমাদের শরীরের জন্য সহনশীল। আর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বেরিয়ে আসে যে টেরিস ভিটাটা নামের পরিচিত ফার্নটি ফসলের জমিতে ছড়িয়ে দিলে এটি জমির পানি থেকে ন্যূনতম ২৩ হাজার ৮৩৭ পিপিএম পর্যন্ত আর্সেনিক শুষে নিয়ে ফসলকে রাখে বিষমুক্ত। নব এ উদ্ভাবনের নেতৃত্বদানকারী বিভাগীয় সহযোগী অধ্যাপক ড. এ এফ এম জামাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমরা টানা তিন বছর গবেষণায় এই কাজে সাফল্য পেয়েছি। এখন চেষ্টা করছি সারা দেশের কৃষিতে এ সাফল্য ছড়িয়ে দিতে। এ জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন পড়বে। তিনি জানান, গবেষণার জন্য প্রথম দিকে ছোট প্লাস্টিকের ঝুড়ি ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিজমিতে ধান, আলু ও অন্যান্য ফসলেও আর্সেনিক-দূষিত পানিতে চাষ করে এসেছে একই সাফল্য। ফসলকে আর্সেনিকমুক্ত করতে কৃষকদের প্রতি বর্গফুটে অন্তত চারটি টেরিস ভিটাটা গাছের চারা লাগাতে হবে। এই ফার্নের চারা আবাদি জমিতে প্রচুর পরিমাণে ছড়িয়ে দিলেই হলো। ফার্নগুলো আকারে বাড়লে জমিকে আগাছামুক্ত করার মতো নিড়ানি দিতে হবে। এরপর 'আগাছা' তথা সংগৃহীত ফার্নগুলোকে মাটিতে পুঁতে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। যথেষ্ট চাষবাসের জন্য বাণিজ্যিকভাবে চাষ করার প্রয়োজন পড়বে টেরিস ভিটাটা নামের ফার্ন। আর এর উৎপাদন ব্যয় নামমাত্র।

আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) গবেষণায় জানা যায়, শুধু বাংলাদেশ নয়; পুরো এশিয়াই মারাত্মক আর্সেনিক-দূষিত ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষের ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ শুধু এশিয়াতেই জলে ভাসা জমিতে (৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটার পানিতে) ধানের চাষাবাদ হয়। ইরির জরিপে দেখা গেছে, প্রতি কেজি ধানে সর্বোচ্চ এক মিলিগ্রাম আর্সেনিক সহনশীল বলে গণ্য হলেও বাংলাদেশে আর্সেনিক উপদ্রুত এলাকার ধানে এর পরিমাণ অনেক বেশি। - See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2015/04/24/214067#sthash.nyFh4eWD.dpuf