Saturday, March 7, 2015

শব্দসৈনিক আশফাকুর রহমানের স্মৃতিচারণা:: ভাষণটি ধর্মঘটের কারণে বেতারে প্রচার হয় পরদিন



বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি ওই দিন বেতারে সরাসরি সম্প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। আর সঙ্গে সঙ্গে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন মুক্তিকামী শব্দসৈনিকরা। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে বেতারকর্মীরা পর দিন কাজে যোগ দিয়ে দিনভর প্রচার করেন ২১ মিনিটের ভাষণটি। এটি সরাসরি রেসকোর্স ময়দান থেকে হুবহু রেকড করা হয়েছিল। পরে এর একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ করে ছড়িয়ে দেওয়া হয় দেশ-বিদেশে।
ওই ভাষণটি পূর্ব পাকিস্তান বেতারে প্রচারের এসব নেপথ্য কথা জানান সে সময়ের তরুণ বেতারকর্মী আশফাকুর রহমান খান। কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে এই মুক্তিযোদ্ধা আরো জানান, পরে স্বাধীন বাংলা বেতারেও তাঁরা একাধিকবার ভাষণটি প্রচার করেন। এ ছাড়া ২৪ মার্চও তাঁরা ভাষণটির একাংশ প্রচার করেন। তাঁর মতে, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটিই বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা। আর এটি ‘জয় বাংলা’ জয়োধ্বনি দিয়েই শেষ হয়েছিল, অন্যকোনো স্লোগানে নয়।
রমনা রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক জনসমুদ্রে আরো কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে আশফাকুর রহমানও অংশ নিয়েছিলেন। ওই ঘটনার স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘২১ মিনিটের পুরো ভাষণটি হুবহু সংরক্ষণ করে আমরা তা পর দিন ৮ মার্চ সারা দিন ধরে প্রচার করি। ভাষণটি প্রচারে পাকিস্তানিদের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে বেতারকর্মীদের ধর্মঘটের কারণে সেটি ওই দিনই সরাসরি প্রচার করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া সে সময় ভাষণটি পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র অধিদপ্তরের এম এ খায়ের হুবহু চলচ্চিত্র আকারে ধারণ করেন। এটি এখনো আর্কাইভ থেকে টেলিভিশনগুলোয় প্রচার করা হয়।
আশফাকুর রহমান আরো বলেন, ‘তখন আমরা যাঁরা তরুণ বেতারকর্মী, তাঁদের নেতৃত্ব দিতেন শাহবাগ বেতার কেন্দ্রের আঞ্চলিক পরিচালক আশফাকুজ্জামান খান। তিনিই গোপনে আমাদের জানান যে আমরা সেনা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বেতারে সরাসরি বঙ্গবঙ্গুর ভাষণ প্রচার করব। সে কী উত্তেজনা আমাদের মধ্যে! রমনা রেসকোর্স ময়দানের যে মঞ্চ থেকে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেবেন, ৬ মার্চ রাতেই বেতার প্রকৌশলীরা সেখানে টেলিফোনের তার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি বসান। ৭ মার্চ দুপুর ২টায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণ দেওয়ার কথা; দুপুর ১২টা থেকে আমরা রেডিওতে কিছুক্ষণ পর পর বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণ সরাসরি প্রচার করার বিষয়ে ঘোষণা দিতে থাকি। সেদিন শেখ মুজিব একটু দেরিতে দুপুর ২টা ২০ মিনিটের দিকে মঞ্চে আসেন। এদিকে একই সময় বেতার কেন্দ্রে পাকিস্তানি মেজর সিদ্দিক সালেক টেলিফোনে মেসেজ পাঠান, ‘নাথিং অব শেখ মুজিবুর রহমান উইল নট গো অন দ্য এয়ার আনটিল ফারদার অর্ডার (পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো কিছুই প্রচার হবে না)।’
আশফাকুর রহমান বলেন, ‘এর প্রতিবাদে আমরা সব কাজ ফেলে রেসকোর্সে ভাষণ শুনতে চলে যাই। সাভারে একটি বিকল্প শক্তিশালী রেডিও ট্রান্সমিটার ছিল। সেখান থেকেও যাতে কোনো অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা না হয়, সে জন্য সেখানে টেলিফোন (ট্রাংকল) করে খবর দেওয়া হয়। সেদিন পূর্ব পাকিস্তান বেতারের ঢাকা কেন্দ্র থেকে আর কোনো অনুষ্ঠান প্রচার হয়নি। ওই রাতে এক গোপন বৈঠকে আমাদের নেতৃত্বদানকারী আঞ্চলিক পরিচালক আশফাকুজ্জামান খবর নিয়ে আসেন যে ধর্মঘট প্রত্যাহারের শর্তে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভাষণটি প্রচারে রাজি হয়েছে। আমরা শর্ত মেনে ৮ মার্চ সকালে কাজে যোগ দিয়ে সারা দিন ধরে বেতারে বাজাই সেই ভাষণ। ২৪ মার্চ রাতেও আমরা ‘ঈশা খাঁ’ নামে একটি সংগ্রামী নাটকে এই ভাষণের একাংশ প্রচার করি।
বঙ্গবন্ধু রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ভাষণটি দিয়েছিলেন প্রায় ১০ লাখ মুক্তিকামী মানুষের উপস্থিতিতে- এ কথা উল্লেখ করে আশফাকুর রহমান আরো বলেন, এতে তাঁর শেষ কথাটি ছিল, ‘মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিব। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ তাঁর মতে, ভাষণের শেষে যদি বঙ্গবন্ধু কোনো ক্রমে ‘জয় বাংলা’র বদলে বা একই সঙ্গে ‘জয় পাকিস্তান’ অথবা ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ বলতেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তা তখনই মানুষের মুখে মুখে ফিরত। এ ছাড়া ওই ময়দানে সেদিন দেশি-বিদেশি অংসখ্য সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। সে ক্ষেত্রে নানা দেশের পত্র-পত্রিকায় তখনই এ নিয়ে সংবাদের পাশাপাশি সমালোচনার ঝড় বয়ে যেত। কিন্তু তা হয়নি। কারণ বঙ্গবন্ধু ‘জয় বাংলা’ বলেই ভাষণ শেষ করেছিলেন। ঐতিহাসিক ভাষণটি বিশ্বের অনেক দেশে সে সময়ই বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ হিসেবে প্রচারিত হয়। কিন্তু একটি স্বার্থান্বেষী মহল ইতিহাসকে বিকৃত করতে স্বাধীনতার এত বছর পর নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে।’ - See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2015/03/07/195773#sthash.4UGz1hCw.dpuf