Friday, December 5, 2014

​কচ্ছপ::ভালোবাসায় বাঁচবে ওরা

‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী।’ প্রাচীন এই প্রবাদে আভাস মেলে হরিণের মতো নিরীহ-সুন্দর বন্য প্রাণী কতটা বিপন্ন। আর সুস্বাদু মাংসের লোভে অতিনিধনে দুনিয়া থেকেই হা
​​
রাতে বসেছে বেশ কয়েক প্রজাতির কচ্ছপ। নদ-নদী আর জলাশয়ের অস্তিত্ব সংকটে সারা দেশেই আজ বিলুপ্তির পথে কয়েক প্রজাতির কচ্ছপ। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে কোনোক্রমে টিকে থাকা ‘সাদা কাটা’ বা ‘কালো কাটা’ কচ্ছপ আবার সারা বিশ্বেই মহা বিপন্ন প্রাণী। এটির ইংরেজি নাম ‘রিভার টেরাপিন’। আর বৈজ্ঞানিক নাম ‘বাটাগুর বাস্কা’। বাংলাদেশে অঞ্চল ভেদে এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত।


আশার কথা, বিরল প্রজাতির ‘বাটাগুর বাস্কা’ কচ্ছপের অস্তিত্ব রক্ষায় একদল গবেষক কয়েক বছর ধরে নিভৃতে চেষ্টা করে চলেছেন। তাঁদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ঢাকার উপকণ্ঠ গাজীপুরের জাতীয় উদ্যানে গড়ে উঠেছে বাটাগুর বাস্কা কচ্ছপ প্রজননকেন্দ্র। এই কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিশিষ্ট প্রাণী বিজ্ঞানী এ জি জে মোরশেদ। তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচার’ (আইইউসিএন) নামের আন্তর্জাতিক সংস্থার কচ্ছপ গবেষক। বন বিভাগের পাশাপাশি প্রকল্প সহযোগী সংস্থা হিসেবে রয়েছে ক্যারিনাম এবং ‘প্রকৃতি ও জীবন’। উদ্যোগটি অর্থ সহায়তা দিয়ে এগিয়ে নিচ্ছে ‘টার্টেল সারভাইভাল অ্যালায়েন্স’ (টিএসএ) এবং ‘ভিয়েনা জু’ নামের দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থা।
কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে এ জি জে মোরশেদ জানান, বিরল এই কচ্ছপ রক্ষায় তাঁদের সাফল্য ও স্বপ্নের কথা। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগে কচ্ছপ বিশেষজ্ঞদের এক জরিপে বলা হয়, রিভার টেরাপিন বা বাটাগুর বাস্কা প্রজাতির কচ্ছপটি হারিয়ে গেছে বাংলাদেশ থেকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রাণী গবেষকরা নিবিড় অনুসন্ধান করে জানতে পারেন, প্রাণীটি এখনো দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে কারো কারো ব্যক্তিগত সংগ্রহে বংশপরম্পরায় পালিত হচ্ছে। ২০১০ সালের শেষ ভাগে টিএসএর আর্থিক সহায়তায়  ‘ক্যারিনাম’-এর উদ্যোগে সাতটি পুরুষ ও তিনটি মাদি কচ্ছপ সংগ্রহের পর শুরু হয় এই কচ্ছপ হ্যাচারি ও প্রজননকেন্দ্রের পথচলা। আন্তর্জাতিক কচ্ছপ বিশেষজ্ঞ ড. পিটার প্রাসাগ (অস্ট্রিয়া) ক্যারিনামকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ বন বিভাগের অনুমতিসাপেক্ষে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্মাণ করেন এই কেন্দ্র।
এ জি জে মোরশেদ জানান, কচ্ছপের মহাবিপন্ন এই প্রজাতিকে এই কেন্দ্রে রেখে বদ্ধ পরিবেশে তথা কৃত্রিম উপায় কী করে প্রজননের মাধ্যমে বংশ বিস্তার করা যায় তা নিয়ে বন বিভাগ, আইইউসিএন, টিএসএ ও ভিয়েনা জু যৌথভাবে গবেষণা করছে। তাঁর কাছ থেকে জানা গেল, ভাওয়াল গড়ের জাতীয় উদ্যানের এক কোণে দুটি পুকুরকে ঘিরে গড়ে ওঠা কচ্ছপ প্রজননকেন্দ্রটিকে আরো সমৃদ্ধ করেন প্রকল্প সমন্বয়কারী রূপালী ঘোষ (ভারত)। তিনি অনুসন্ধান চালিয়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল থেকে ২২টি পূর্ণবয়স্ক বাটাগুর বাস্কা সংগ্রহ করেন। প্রাণীটি দক্ষিণাঞ্চলে সাদা কাটা ও কালো কাটা,  গোপালগঞ্জে শালগম, ফেনী অঞ্চলে মান্দারী, মুখপোড়া কাইট্টা বা সাদামুখী কাইট্টা ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। এদের পিঠের খোলার দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ৬০-৬১ সেন্টিমিটার, বুকের কঠিন আবরণের দৈর্ঘ্য খোলার দৈর্ঘ্যরে চেয়ে কম। গায়ের রং জলপাই-ধূসর বা জলপাই-বাদামি। লিঙ্গভেদে একেকটির ওজন ৮ থেকে ৩৫ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। পরিণত বয়সে পুরুষের চেয়ে মাদিগুলো আকারে বড় হয় বলে বেশি মাংসের লোভে এগুলোই হয় শিকারের প্রধান লক্ষ্য। প্রজনন মৌসুমে পুরুষ কচ্ছপগুলোর মাথা কুচকুচে কালো এবং গলা গোলাপি বর্ণের হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বদ্ধ পরিবেশে মা কচ্ছপ এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২৮টি ডিম পেড়েছে। এই প্রজাতির কচ্ছপের আয়ুষ্কাল এখনো পর্যন্ত সঠিকভাবে জানা যায়নি। আরো কয়েক প্রজন্ম গবেষণার পর তবেই তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হবে। তবে গবেষকদের ধারণা, এসব প্রাণী হয় শতায়ু। প্রাণীটির খাদ্য তালিকায় রয়েছে কচুরিপানা, টোপা পানাসহ বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি, শামুক, কেঁচো, ছোট চিংড়ি, কলা, কাঁঠাল, কেওড়াসহ বিভিন্ন ফলমূল। তবে ওদের সবচেয়ে পছন্দের খাবার কলমি শাক।
জানা গেল, জাতীয় উদ্যানের এই প্রজননকেন্দ্রে প্রথম বছরে ২০১১ সালে কৃত্রিম পরিবেশে একটি মা কচ্ছপ  ডিম পেড়েছিল ২৮টি। এর মধ্যে ছয়টি ডিম গুইসাপ খেয়ে ফেলে। আর গবেষণালব্ধ জ্ঞানের অভাবে বাকি ডিমগুলো থেকে ছানা ফোটানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু ২০১২ সাল থেকে বদলাতে থাকে পরিস্থিতি। প্রজননকেন্দ্রে নানা গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সাফল্য ধরা দিতে থাকে। কচ্ছপগুলোর গতিবিধি দিন-রাত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি পুকুরপাড়ে বালু ঢেলে ও ইটের তৈরি প্রাচীর দিয়ে সীমানা টেনে সুরক্ষিত করা হয়। তারের তৈরি জালের বেষ্টনী দিয়ে গুইসাপের কবল থেকে রক্ষা করা হয় প্রাণীগুলোর বাসা ও ডিম। মা কচ্ছপ ডিম পাড়লে বালু খুঁড়ে ডিমগুলোকে বের করে নির্দিষ্ট গভীরতায় কৃত্রিম বাসা বানিয়ে বালুভর্তি প্লাস্টিকের বাক্সে সারি বেঁধে রাখা হয়। প্রতিটি বাক্সে বিশেষ ধরনের থার্মোমিটার ব্যবহার করে পর্যবেক্ষণ করা হয় বাসাগুলোর তাপমাত্রা। আর প্রতিটি বাক্সের তাপমাত্রা লিখে রাখা হয় একটি চার্টে। পাশাপাশি টিনশেডের নিচে তারের জাল দিয়ে ঘেরা বালুভর্তি একটি চৌবাচ্চাতেও চলে ডিম ফোটানোর কাজ। সেখানেও রাখা হয় তাপমাত্রার রেকর্ড। গবেষক মোরশেদকে সবসময় সহায়তা করে চলেছেন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক নুরুল হক। সে বছর ৯২টি ডিমের ভেতরে মোট ২৬টি থেকে বাচ্চা ফুটেছিল।
গবেষক মোরশেদ বলেন, ‘আমরা কিছুটা অবাক হয়েই দেখি, প্রজননকেন্দ্রে প্রাকৃতিক পরিবেশের চেয়ে কৃত্রিম পরিবেশেই সাফল্য আসছে বেশি। এই প্রাপ্তি আমাদের উৎসাহ বাড়িয়ে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ ও ২০১৪ সালে প্রজননকেন্দ্রের সাফল্য বাড়ে আরো। গত বছর মোট ৯৯টি ডিমের মধ্যে ছানা ফুটে বেরিয়েছে ৬১টি। আর চলতি বছর ১১১টি ডিম থেকে পাওয়া গেছে ৪৮টি ছানা। এ ছাড়া কৃত্রিম পরিবেশে ডিমের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে মাদি ছানা তৈরিতেও এসেছে সাফল্য।’
এদিকে সব গবেষণাকে চমকে দিয়ে পাওয়া গেছে আরো চমকপ্রদ তথ্য। এ বছরই বাগেরহাট অঞ্চলে মৎস্য ব্যবসায়ী ও নানা সূত্র থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে একই প্রজাতির দুটি স্ত্রী কচ্ছপ। ২০১৩ সালে তিনটি শিশু কচ্ছপ পাওয়া গেছে প্রকৃতিতে। এ থেকে গবেষকরা অনুমান করছেন, চরম প্রতিকূলতার ভেতরেও কুয়াকাটা ও সুন্দরবন এলাকার নদীতে একই প্রজাতির অল্পসংখ্যক কচ্ছপের বাস রয়েছে।
গত পাঁচ বছরে সারা বিশ্বে অস্ট্রিয়া, ভারত ও বাংলাদেশে এই প্রজাতির কচ্ছপের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ২০১০ সালে অস্ট্রিয়ায় ৮, ভারতে ১৩ ও বাংলাদেশে ৯টি; ২০১১ সালে কেবল বাংলাদেশে ২টি, ২০১২ সালে ভারতে ৩৩ ও বাংলাদেশে ২৬টি; ২০১৩ সালে অস্ট্রিয়ায় ৮, ভারতে ১৩ ও বাংলাদেশে ৬২টি এবং ২০১৪ সালে ভারতে ৫৫ ও বাংলাদেশে ৫০টি বাটাগুর বাস্কা কচ্ছপের সন্ধান পাওয়া যায়।
প্রাণীবিজ্ঞানী এ জি জে মোরশেদ আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের গবেষণার নতুন নতুন সাফল্য বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের প্রাণীসম্পদকেই সমৃদ্ধ করছে। বিরল প্রজাতির কচ্ছপটি আমরা হয়তো আবারও ফিরিয়ে দিতে পারব প্রকৃতিতে। আর গবেষণালব্ধ জ্ঞান অন্য কচ্ছপসহ সরীসৃপ প্রাণীদের বিলুপ্তি ঠেকাতে সাহায্য করবে।

___
- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2014/12/05/159100#sthash.woMmV3Q5.Gm5UYgGA.dpuf

‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী।’ প্রাচীন এই প্রবাদে আভাস মেলে হরিণের মতো নিরীহ-সুন্দর বন্য প্রাণী কতটা বিপন্ন। আর সুস্বাদু মাংসের লোভে অতিনিধনে দুনিয়া থেকেই হারাতে বসেছে বেশ কয়েক প্রজাতির কচ্ছপ। নদ-নদী আর জলাশয়ের অস্তিত্ব সংকটে সারা দেশেই আজ বিলুপ্তির পথে কয়েক প্রজাতির কচ্ছপ। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে কোনোক্রমে টিকে থাকা ‘সাদা কাটা’ বা ‘কালো কাটা’ কচ্ছপ আবার সারা বিশ্বেই মহা বিপন্ন প্রাণী। এটির ইংরেজি নাম ‘রিভার টেরাপিন’। আর বৈজ্ঞানিক নাম ‘বাটাগুর বাস্কা’। বাংলাদেশে অঞ্চল ভেদে এটি বিভিন্ন নামে পরিচিত।
আশার কথা, বিরল প্রজাতির ‘বাটাগুর বাস্কা’ কচ্ছপের অস্তিত্ব রক্ষায় একদল গবেষক কয়েক বছর ধরে নিভৃতে চেষ্টা করে চলেছেন। তাঁদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ঢাকার উপকণ্ঠ গাজীপুরের জাতীয় উদ্যানে গড়ে উঠেছে বাটাগুর বাস্কা কচ্ছপ প্রজননকেন্দ্র। এই কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিশিষ্ট প্রাণী বিজ্ঞানী এ জি জে মোরশেদ। তিনি ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচার’ (আইইউসিএন) নামের আন্তর্জাতিক সংস্থার কচ্ছপ গবেষক। বন বিভাগের পাশাপাশি প্রকল্প সহযোগী সংস্থা হিসেবে রয়েছে ক্যারিনাম এবং ‘প্রকৃতি ও জীবন’। উদ্যোগটি অর্থ সহায়তা দিয়ে এগিয়ে নিচ্ছে ‘টার্টেল সারভাইভাল অ্যালায়েন্স’ (টিএসএ) এবং ‘ভিয়েনা জু’ নামের দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। 
কালের কণ্ঠের সঙ্গে আলাপকালে এ জি জে মোরশেদ জানান, বিরল এই কচ্ছপ রক্ষায় তাঁদের সাফল্য ও স্বপ্নের কথা। তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগে কচ্ছপ বিশেষজ্ঞদের এক জরিপে বলা হয়, রিভার টেরাপিন বা বাটাগুর বাস্কা প্রজাতির কচ্ছপটি হারিয়ে গেছে বাংলাদেশ থেকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রাণী গবেষকরা নিবিড় অনুসন্ধান করে জানতে পারেন, প্রাণীটি এখনো দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে কারো কারো ব্যক্তিগত সংগ্রহে বংশপরম্পরায় পালিত হচ্ছে। ২০১০ সালের শেষ ভাগে টিএসএর আর্থিক সহায়তায়  ‘ক্যারিনাম’-এর উদ্যোগে সাতটি পুরুষ ও তিনটি মাদি কচ্ছপ সংগ্রহের পর শুরু হয় এই কচ্ছপ হ্যাচারি ও প্রজননকেন্দ্রের পথচলা। আন্তর্জাতিক কচ্ছপ বিশেষজ্ঞ ড. পিটার প্রাসাগ (অস্ট্রিয়া) ক্যারিনামকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ বন বিভাগের অনুমতিসাপেক্ষে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্মাণ করেন এই কেন্দ্র।
এ জি জে মোরশেদ জানান, কচ্ছপের মহাবিপন্ন এই প্রজাতিকে এই কেন্দ্রে রেখে বদ্ধ পরিবেশে তথা কৃত্রিম উপায় কী করে প্রজননের মাধ্যমে বংশ বিস্তার করা যায় তা নিয়ে বন বিভাগ, আইইউসিএন, টিএসএ ও ভিয়েনা জু যৌথভাবে গবেষণা করছে। তাঁর কাছ থেকে জানা গেল, ভাওয়াল গড়ের জাতীয় উদ্যানের এক কোণে দুটি পুকুরকে ঘিরে গড়ে ওঠা কচ্ছপ প্রজননকেন্দ্রটিকে আরো সমৃদ্ধ করেন প্রকল্প সমন্বয়কারী রূপালী ঘোষ (ভারত)। তিনি অনুসন্ধান চালিয়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল থেকে ২২টি পূর্ণবয়স্ক বাটাগুর বাস্কা সংগ্রহ করেন। প্রাণীটি দক্ষিণাঞ্চলে সাদা কাটা ও কালো কাটা,  গোপালগঞ্জে শালগম, ফেনী অঞ্চলে মান্দারী, মুখপোড়া কাইট্টা বা সাদামুখী কাইট্টা ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। এদের পিঠের খোলার দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ৬০-৬১ সেন্টিমিটার, বুকের কঠিন আবরণের দৈর্ঘ্য খোলার দৈর্ঘ্যরে চেয়ে কম। গায়ের রং জলপাই-ধূসর বা জলপাই-বাদামি। লিঙ্গভেদে একেকটির ওজন ৮ থেকে ৩৫ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। পরিণত বয়সে পুরুষের চেয়ে মাদিগুলো আকারে বড় হয় বলে বেশি মাংসের লোভে এগুলোই হয় শিকারের প্রধান লক্ষ্য। প্রজনন মৌসুমে পুরুষ কচ্ছপগুলোর মাথা কুচকুচে কালো এবং গলা গোলাপি বর্ণের হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বদ্ধ পরিবেশে মা কচ্ছপ এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২৮টি ডিম পেড়েছে। এই প্রজাতির কচ্ছপের আয়ুষ্কাল এখনো পর্যন্ত সঠিকভাবে জানা যায়নি। আরো কয়েক প্রজন্ম গবেষণার পর তবেই তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হবে। তবে গবেষকদের ধারণা, এসব প্রাণী হয় শতায়ু। প্রাণীটির খাদ্য তালিকায় রয়েছে কচুরিপানা, টোপা পানাসহ বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি, শামুক, কেঁচো, ছোট চিংড়ি, কলা, কাঁঠাল, কেওড়াসহ বিভিন্ন ফলমূল। তবে ওদের সবচেয়ে পছন্দের খাবার কলমি শাক। 
জানা গেল, জাতীয় উদ্যানের এই প্রজননকেন্দ্রে প্রথম বছরে ২০১১ সালে কৃত্রিম পরিবেশে একটি মা কচ্ছপ  ডিম পেড়েছিল ২৮টি। এর মধ্যে ছয়টি ডিম গুইসাপ খেয়ে ফেলে। আর গবেষণালব্ধ জ্ঞানের অভাবে বাকি ডিমগুলো থেকে ছানা ফোটানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু ২০১২ সাল থেকে বদলাতে থাকে পরিস্থিতি। প্রজননকেন্দ্রে নানা গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সাফল্য ধরা দিতে থাকে। কচ্ছপগুলোর গতিবিধি দিন-রাত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি পুকুরপাড়ে বালু ঢেলে ও ইটের তৈরি প্রাচীর দিয়ে সীমানা টেনে সুরক্ষিত করা হয়। তারের তৈরি জালের বেষ্টনী দিয়ে গুইসাপের কবল থেকে রক্ষা করা হয় প্রাণীগুলোর বাসা ও ডিম। মা কচ্ছপ ডিম পাড়লে বালু খুঁড়ে ডিমগুলোকে বের করে নির্দিষ্ট গভীরতায় কৃত্রিম বাসা বানিয়ে বালুভর্তি প্লাস্টিকের বাক্সে সারি বেঁধে রাখা হয়। প্রতিটি বাক্সে বিশেষ ধরনের থার্মোমিটার ব্যবহার করে পর্যবেক্ষণ করা হয় বাসাগুলোর তাপমাত্রা। আর প্রতিটি বাক্সের তাপমাত্রা লিখে রাখা হয় একটি চার্টে। পাশাপাশি টিনশেডের নিচে তারের জাল দিয়ে ঘেরা বালুভর্তি একটি চৌবাচ্চাতেও চলে ডিম ফোটানোর কাজ। সেখানেও রাখা হয় তাপমাত্রার রেকর্ড। গবেষক মোরশেদকে সবসময় সহায়তা করে চলেছেন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক নুরুল হক। সে বছর ৯২টি ডিমের ভেতরে মোট ২৬টি থেকে বাচ্চা ফুটেছিল।
গবেষক মোরশেদ বলেন, ‘আমরা কিছুটা অবাক হয়েই দেখি, প্রজননকেন্দ্রে প্রাকৃতিক পরিবেশের চেয়ে কৃত্রিম পরিবেশেই সাফল্য আসছে বেশি। এই প্রাপ্তি আমাদের উৎসাহ বাড়িয়ে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ ও ২০১৪ সালে প্রজননকেন্দ্রের সাফল্য বাড়ে আরো। গত বছর মোট ৯৯টি ডিমের মধ্যে ছানা ফুটে বেরিয়েছে ৬১টি। আর চলতি বছর ১১১টি ডিম থেকে পাওয়া গেছে ৪৮টি ছানা। এ ছাড়া কৃত্রিম পরিবেশে ডিমের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে মাদি ছানা তৈরিতেও এসেছে সাফল্য।’
এদিকে সব গবেষণাকে চমকে দিয়ে পাওয়া গেছে আরো চমকপ্রদ তথ্য। এ বছরই বাগেরহাট অঞ্চলে মৎস্য ব্যবসায়ী ও নানা সূত্র থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে একই প্রজাতির দুটি স্ত্রী কচ্ছপ। ২০১৩ সালে তিনটি শিশু কচ্ছপ পাওয়া গেছে প্রকৃতিতে। এ থেকে গবেষকরা অনুমান করছেন, চরম প্রতিকূলতার ভেতরেও কুয়াকাটা ও সুন্দরবন এলাকার নদীতে একই প্রজাতির অল্পসংখ্যক কচ্ছপের বাস রয়েছে।
গত পাঁচ বছরে সারা বিশ্বে অস্ট্রিয়া, ভারত ও বাংলাদেশে এই প্রজাতির কচ্ছপের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ২০১০ সালে অস্ট্রিয়ায় ৮, ভারতে ১৩ ও বাংলাদেশে ৯টি; ২০১১ সালে কেবল বাংলাদেশে ২টি, ২০১২ সালে ভারতে ৩৩ ও বাংলাদেশে ২৬টি; ২০১৩ সালে অস্ট্রিয়ায় ৮, ভারতে ১৩ ও বাংলাদেশে ৬২টি এবং ২০১৪ সালে ভারতে ৫৫ ও বাংলাদেশে ৫০টি বাটাগুর বাস্কা কচ্ছপের সন্ধান পাওয়া যায়।
প্রাণীবিজ্ঞানী এ জি জে মোরশেদ আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের গবেষণার নতুন নতুন সাফল্য বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের প্রাণীসম্পদকেই সমৃদ্ধ করছে। বিরল প্রজাতির কচ্ছপটি আমরা হয়তো আবারও ফিরিয়ে দিতে পারব প্রকৃতিতে। আর গবেষণালব্ধ জ্ঞান অন্য কচ্ছপসহ সরীসৃপ প্রাণীদের বিলুপ্তি ঠেকাতে সাহায্য করবে।
- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2014/12/05/159100#sthash.woMmV3Q5.Gm5UYgGA.dpuf