Saturday, January 8, 2011

খাসিয়া গ্রামে গাছ কাটার মহোৎসব!


বিপ্লব রহমান, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার থেকে ফিরে
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের প্রত্যন্ত খাসিয়া আদিবাসী দুটি গ্রাম নাহার পুঞ্জি-১ ও নাহার পুঞ্জি-২-এর প্রায় চার হাজার প্রাকৃতিক গাছ কেটে ফেলতে শুরু করেছেন সংশ্লিষ্ট চা বাগানের মালিক। গাছগুলো রক্ষায় আদিবাসীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে এবং প্রশাসনের কাছে ধরনা দিয়েও কোনো সুফল পায়নি। আদিবাসীরা বলছে, এসব গাছ না থাকলে খাসিয়াদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন পান জুম (পাহাড়ের ঢালে বিশেষভাবে পানচাষ) ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন গ্রাম থেকেই উচ্ছেদ হয়ে যেতে হবে তাদের। অন্যদিকে নাহার চা বাগান কর্তৃপক্ষ বলছে, চা উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারি বাধ্যবাধকতা থাকায় গাছগুলো কেটে চা বাগান সম্প্রসারণ করা জরুরি। তাই উচ্চ আদালত, প্রশাসন ও বন বিভাগের অনুমতি নিয়েই তারা গাছ কাটতে শুরু করেছে।


সম্প্রতি সরেজমিন শ্রীমঙ্গল সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে ভারতের আসাম সীমান্তের খাসিয়া গ্রাম ঘুরে নির্বিচারে বন ধ্বংসের পাশাপাশি আদিবাসীদের বিপন্নতার চিত্র দেখা গেছে। প্রতিদিন পেশাদার করাতিরা বিস্তীর্ণ বনের গামারি, শিরীষ, কড়ই, জাম, বনাক, আলপিন, নেউর, মসকন, রঙ্গিসহ নানা ধরনের চিহ্নিত গাছের পাশাপাশি নাম না জানা অসংখ্য গাছ কেটে চলছেন। এমনকি বন আইন উপেক্ষা করে ইচ্ছামতো তিন ফুট বেড়ের চেয়েও কম মাপের গাছও কাটা হচ্ছে। আবার বড় বড় গাছ কেটে ফেলার সময় ওই গাছের ডালপালার আঘাতে ধ্বংস হচ্ছে পানের জুমসহ বিভিন্ন চারা ও কিশোর বয়সী ছোট ছোট
গাছ। পাহাড় ও টিলার এসব কাটা গাছ ৯টি পোষা হাতি দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে করাতকলে। গাছ টানার সময় আরেক দফা ক্ষতি হচ্ছে পানের জুমের।
নাহার পুঞ্জি-২-এর গ্রামপ্রধান (মন্ত্রী) ফ্রেন্ডলি দুরং কালের কণ্ঠকে বলেন, �নাহার চা বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ১৯৮০ সালে আমরা জঙ্গল পরিষ্কার করে খাসিয়া গ্রাম দুটি প্রতিষ্ঠা করি। সেই থেকে আমরা পাহাড় ও টিলায় পান চাষ করে আসছি। চাষবাসের জন্য ২০০৬ সাল পর্যন্ত চা বাগান কর্তৃপক্ষকে প্রতিবছর ৫০ হাজার থেকে শুরু করে প্রায় এক লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদাও দিয়েছি। আর এখন আমাদের মতামত উপেক্ষা করে অমানবিকভাবে আদিবাসীদের ভোগদখলের গাছ ও পানের জুম ধ্বংস করা হচ্ছে।
নাহার পুঞ্জি-১-এর খাসিয়া নেতা ডিবারমিন পংতাম বলেন, কেটে ফেলা গাছগুলো বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাঠ ব্যবসায়ীরা হাতি ব্যবহার করছেন। স্পর্শকাতর লতা গাছ বলে হাতির সংস্পর্শে পানের জুম পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া কাটা গাছ মাটিতে পড়ার সময়ও আশপাশের পানগাছের ব্যাপক ক্ষতি করছে।
আদিবাসী যুবক রেয়াং টম ডায়ার জানান, খাসিয়ারা কোনো রকম সার ও কীটনাশক ছাড়া পান চাষ করেন বলে সমতলের পানের চেয়ে এর চাহিদা অনেক বেশি। এক কুড়ি (প্রায় তিন হাজার) খাসিয়া পানের দাম এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। এসব পান পাইকাররা চড়াদামে স্থানীয় বাজারে তো বটেই, এমনকি বিদেশেও রপ্তানি করেন।
খাসি ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সভাপতি এন্ড্র সোলমার বলেন, বনাঞ্চল ও পান জুম ধ্বংস করার অর্থ হচ্ছে খাসিয়াদের জীবিকা কেড়ে নেওয়া। এর ফলে নাহার খাসিয়া পুঞ্জি-১ ও ২-এর প্রায় ৬০টি পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে। তখন হয়তো তাদের দেশান্তরি হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
নাহার চা বাগানের ব্যবস্থাপক পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য জানান, প্রায় ৮৬৫ একরের বাগানটি ২০০৬ সালে ইজারা নেন ফরিদা সারোয়ার। বর্তমান বাগান কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারি বাধ্যবাধকতা মেনে বছরে আড়াই শতাংশ হারে চা উৎপাদন বৃদ্ধি করার। এ জন্য প্রায় চার হাজার গাছ কেটে ফেলে চা বাগান সম্প্রসারণ করা ছাড়া উপায় নেই। তিনি বলেন, আমরা খাসিয়া আদিবাসীদের জন্য আন্তরিক। এ কারণে বর্তমান চা বাগান কর্তৃপক্ষ চাষবাসের জন্য তাদের কাছ থেকে কোনো চাঁদা নেয়নি। চা বাগানের কারণে ভবিষ্যতে আদিবাসীরা পান জুম করতে না পারলে তাদের চা চাষের কাজে লাগানো যেতে পারে।
নাহার চা বাগানের প্রায় চার হাজার প্রাকৃতিক গাছ কাটার ইজারা নিয়েছেন স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী সেলিম উদ্দীন। তিনি বলেন, �গাছ কাটার জন্য আমি ২০০৬ সালে বাগান কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, চা উন্নয়ন বোর্ড ও বন বিভাগের কাছ থেকে অনুমতি পাই। কিন্তু এরপর আদিবাসীদের প্রতিবাদ-আন্দোলনের কারণে ২০০৯ সাল পর্যন্ত গাছ কাটার উদ্যোগ বন্ধ থাকে। কিছুদিন আগে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের তদন্ত শেষে হাইকোর্ট ও আপিল আদালতের অনুমতি পেয়ে এখন আমি গাছ কাটতে শুরু করেছি। এ জন্য সব ধরনের নিয়ম-নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

 গাছ কাটার আগে স্থানীয় আদিবাসীদের মতামত নেওয়া হয়েছিল কি না জানতে চাইলে সেলিম উদ্দীন বলেন, �আদিবাসীরা তো বাগান মালিক নয়। তাই তাদের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই।� নিয়ম ভেঙে তিন ফুট বেড়ের চেয়েও কম মাপের কিশোর বয়সী গাছ কাটার প্রশ্নে তিনি বলেন, �আমার ওপর দোষ চাপানোর জন্য এটি খাসিয়ারা নিজেরাই করছে।�
বন বিভাগের মৌলভীবাজার রেঞ্জ কর্মকর্তা (শ্রীমঙ্গল) আবুল হোসেন বলেন, নিয়ম-নীতি অনুসরণ করেই গাছ কাটা চলছে। ৪০ বছরের বেশি ও পোকায় কাটা গাছগুলো কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বন আইন উপেক্ষা করে তিন ফুট বেড়ের চেয়েও কম মাপের গাছ কাটার প্রশ্নে তিনি বলেন, এসব গাছ কাটলে কাঠ ব্যবসায়ীর পরিবহন খরচ উঠে আসবে না বলে এমন গাছ কাটার কথা সঠিক নয়। নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে কি না, তা জানতে চাইলে রেঞ্জ কর্মকর্তা বলেন, �খাসিয়া আদিবাসীরা স্যুটেড-বুটেড। তাদের পক্ষে কথা বলার জন্য অনেকেই আছেন। কিন্তু একই পাহাড় বা টিলার বাঙালিরা অনেক দরিদ্র ও তাদের পক্ষে কথা বলার কেউ নেই। সত্যিকার অর্থে ক্ষতিপূরণ দিতে হলে তাদেরই দেওয়া উচিত।

__
News Link: http://www.kalerkantho.com/print_edition/index.php?view=details&type=gold&data=news&pub_no=394&cat_id=1&menu_id=14&news_type_id=1&index=2&archiev=yes&arch_date=08-01-2011#.VILPFyfIYQt