Saturday, September 13, 2014

আমলাতন্ত্রের জালে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন


আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব। দেখতে চাই আর কত হয়রানির পর আমার গাড়িটি চট্টগ্রাম শুল্ক বিভাগ থেকে ছাড়া পায়। সরকারি কর্মকর্তারা একজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিজ দেশে আর কত হেনস্তা করতে পারেন। আমার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন এভাবে আমলাতন্ত্রের কাছে পরাজিত হতে পারে না।

কথাগুলো বলছিলেন গাড়ি চালিয়ে বিশ্বভ্রমণে বের হওয়া কানাডার নাগরিক, একাত্তরের অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সাত্তার সালাউদ্দীন (৬০)। 




বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে বিশেষভাবে তুলে ধরতে আবদুস সাত্তার কানাডার টরন্টো থেকে সড়কপথে বিশ্বভ্রমণে বের হন ২০০৯ সালের ২ আগস্ট। একই গাড়িতে (মিতসুবিশি আউটল্যান্ডার, ২০০৬ সাল, রেজিস্ট্রেশন-বিবিবিবি ৯৩৫) শদুয়েক দেশ পরিভ্রমণ করে বিশ্বরেকর্ড গড়ার স্বপ্ন তাঁর। সবই পরিকল্পনামতো চলছিল। বড় রকমের বিপত্তি ছাড়াই তিনি পাড়ি দিয়েছেন ২২টি দেশ। পাকিস্তানে পৌঁছে করাচি স্থলবন্দর থেকে তিনি গাড়িটি তুলে দেন কনটেইনারে। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর থেকে গাড়িটি নিয়ে আবার বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়া।


আবদুস সাত্তার ২০১০ সালের ২৯ মে বাংলাদেশে পৌঁছেন। আর তাঁর স্বপ্ন আটকে গেছে নিজ দেশে। চার বছর ধরে তাঁর গাড়িটি আটকে আছে চট্টগ্রাম শুল্ক বিভাগে। ছাড় করানোর জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন। অসংখ্য মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সরকারি বড় কর্তাদের টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরেছেন। কিন্তু ফল শূন্য। ইতিমধ্যে এসব করতে গিয়ে প্রায় ১৩ লাখ টাকা গচ্চা দিয়ে তিনি আজ সর্বস্বান্ত। একের পর এক গ্লানিময় ব্যর্থতায় কেবল নীরব কান্নাই সঙ্গী হয়েছে। আমলাতন্ত্রের মন গলেনি।

আবদুস সাত্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, এই চার বছরে আমার হয়রানির কথা বিস্তারিত লিখতে গেলে বিশাল কলেবরের একটি বই হয়ে যাবে। অসংখ্য ফিস, আবেদন তো দিয়েছিই। নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে নানা টেবিলে ঘুষও দিয়েছি। এই করতে করতে এখন আমি কপর্দকশূন্য। টানা তিন বছর উত্তরায় এক মেয়ের বাসায় গলগ্রহ হয়ে ছিলাম। এখন দয়াগঞ্জে এক শুভাকাঙ্ক্ষীর একতলা বাড়ির ছাদের ঘরে রাতটুকু কাটাই। সকালে রোদ চড়লেই ঘরটি চুল্লির মতো গনগনে গরম হয়ে ওঠে। তখন কোনো পার্কে গাছের ছায়ায় খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে আবার গাড়িটি ছাড় করানোর যুদ্ধে নামি।

এত কষ্ট করছেন কেন? অনেক আগেই তো আরেকটি গাড়ি নিয়ে আবার বিশ্বভ্রমণ শুরু করতে পারতেন?- এমন প্রশ্নের জবাবে এই পর্যটক বললেন,

আমার লক্ষ্য স্বপ্ন পূরণের মধ্য দিয়ে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখানো। বাংলাদেশকে বিশেষভাবে পরিচিত করে তোলা। আর গিনেস বুক রেকর্ডের ক্ষেত্রে তাদের একটি নিজস্ব নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। তা হলো, একই গাড়িতে বিশ্বভ্রমণ। গাড়িটি ভাঙাচোরা বা বিকল হয়ে গেলেও তা মেরামত করেই ভ্রমণ শেষ করতে হবে।
তিনি বলেন,

পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রায় এক লাখ কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে ২০৫টি দেশ ভ্রমণ করার জন্য আমি বেরিয়েছি। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘ স্বীকৃত ১৯৬টি দেশ এবং ছয়টি মহাদেশের সব কটি বড় শহর ও রাজধানী।


চার বছরে সমুদ্রের লোনা বাতাসে গাড়িটি তো পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা। এ ছাড়া এর যন্ত্রপাতিও চুরি যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন আশঙ্কার জবাবে তিনি বলেন, 

তেমনটা হওয়ার সুযোগ কম। কারণ গাড়িটি একটি স্টিলের কনটেইনারে সিলগালা অবস্থায় রয়েছে।


যে হয়রানির শেষ নেই : আবদুস সাত্তারের ধারাবাহিক হয়রানির ঘটনাটি সংক্ষেপে এ রকম। তিনি বাংলাদেশে পৌঁছে ২০১০ সালের জুনে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে গাড়িটি ছাড় করানোর জন্য যান কমলাপুর আইসিডির শুল্ক কর্মকর্তার দপ্তরে। তাঁকে জানানো হয়, প্রধান নিয়ন্ত্রক, আমদানি-রপ্তানি (চিফ কন্ট্রোলার অব ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট) দপ্তরের ছাড়পত্র লাগবে। ২২ মে প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে গেলে জানানো হয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হবে। আড়াই মাস বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ঘোরাঘুরির পর ওই বছরের ১১ আগস্ট তিনি মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র পান। এরপর প্রধান নিয়ন্ত্রকের ছাড়পত্র নিয়ে ১৮ আগস্ট যান চট্টগ্রাম শুল্ক কার্যালয়ে। এবার শুল্ক বিভাগ বলে, রাজস্ব অধিদপ্তরের (এনবিআর) ছাড়পত্র লাগবে। এনবিআর কর্মকর্তারা গাড়িটির দাম ধরে ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিয়ে ছাড় করানোর পরামর্শ দেন। আবার যান চট্টগ্রাম শুল্ক বিভাগে। সেখান থেকে জানানো হয়, গাড়িটি ছাড় করাতে এক কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি লাগবে। এত টাকা তিনি পাবেন কোথায়? আবার শুরু হলো গ্যারান্টি মওকুফের জন্য দৌড়ঝাঁপ। শেষ হয় না হয়রানির। 


এমনই দৌড়ঝাঁপের মাঝে মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সাত্তার গণমাধ্যমের নজর কাড়েন। তাঁকে নিয়ে সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে প্রচারিত হয় বিশেষ প্রতিবেদন। সংবাদ সম্মেলনও হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বছর তিনেক আগে তাঁর সমর্থনে মানববন্ধন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে আবেদন, একাধিক মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ ইত্যাদি পর্বও সারা হয়েছে। কিন্তু ফল শূন্য।


সরকারের বিভিন্ন অধিদপ্তরের বক্তব্য, ভ্রমণের জন্য এক দেশ থেকে আরেক দেশে গাড়ি নিতে হলে বিশেষ অনুমতি নিতে হয়। এই ‘কারনেট দ্য প্যাসেজ’ থাকলে বিনা শুল্কে এক দেশ থেকে আরেক দেশে গাড়ি নেওয়া যায়। আসার আগে এই অনুমতি নেননি আবদুস সাত্তার। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, কানাডায় থাকতে বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। অন্য কোনো দেশও এটা চায়নি। এমনকি ২০১২ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছিল, তাঁর ক্ষেত্রে ‘কারনেট দ্য প্যাসেজ’ লাগবে না। বাংলাদেশ অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের সুপারিশপত্র নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলেই গাড়িটি ছাড়পত্র পাবে। অনেক কষ্টে সেই সুপারিশপত্র জোগাড় করে ওই বছরের জুন-জুলাইয়ের দিকে তিনি আবেদন করেন চট্টগ্রাম শুল্ক বিভাগের তৎকালীন উপকমিশনার মাহমুদুল হাসানের কাছে। সেই থেকে সাত্তারের নথিপত্র ওই কর্মকর্তার টেবিলেই পড়ে আছে। ইতিমধ্যে উপকমিশনারসহ পদস্থ অনেক কর্মকর্তাই বদলি হয়ে গেছেন।


চট্টগ্রাম শুল্ক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার সুরেশ চন্দ্র বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, 

ট্রানজিট গাড়ি দেশে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে ব্যাংক গ্যারান্টি দিয়ে যে কেউ তাঁর গাড়ি ছাড়িয়ে নিতে পারেন। ‘কারনেট দ্য প্যাসেজ’ এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। আর ট্রানজিট গাড়ি দেশে প্রবেশের দায়িত্ব আমরা অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনকে নিতে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তারা রাজি হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আটকে থাকা ট্রানজিট গাড়ির বিষয় দেখেন চট্টগ্রাম শুল্ক বিভাগের সহকারী কমিশনার মিনহাজ উদ্দীন। তিনি ছুটিতে থাকায় গাড়িটির বিষয়ে আর কোনো তথ্য জানা যায়নি।

শেষ কপর্দক ৭৪ হাজার টাকা দিয়ে গাড়িটির বীমা করিয়েছেন আবদুস সাত্তার। সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মনোয়ারা খানম এ বছরের এপ্রিলে তাঁর পক্ষে রিট আবেদন করেছেন। গাড়িটি নিয়ে আবার বিশ্বজয়ে পথে নামবেন- থমকে গেলেও মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সাত্তারের এই স্বপ্ন এখনো বহাল।
___

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/09/13/128124#sthash.MDZEtHzX.Daiq7DPB.dpuf