Saturday, August 9, 2014

চিম্বুকে কঠিন ম্রো জীবন

বিপ্লব রহমান, বান্দরবান থেকে ফিরে
চিম্বুকের পাহাড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমি অধিগ্রহণের ফলে উচ্ছেদ হওয়া প্রায় ৭৫০টি ম্রো পরিবার হারিয়েছে অরণ্যঘেরা স্বাধীন জনপদ। ছবির মতো অনিন্দ্যসুন্দর পাহাড়ি গ্রাম, জুম চাষের (পাহাড়ের ঢালে বিশেষ চাষাবাদ) জমি, ঐতিহ্যবাহী শিকার- সব কিছুই আজ অতীত। হতদরিদ্র ম্রোরা সেই থেকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘরে বাস করছে চিম্বুক প্রধান সড়কের পাশে। এদেরই একাংশ ‘ক্রামাদি পাড়া’ নামক নতুন একটি বসতি গড়ে তুলেছে। কিন্তু জুম চাষের জমি কমে আসায় জীবন হয়েছে আরো কঠিন। কেউ বা পেশা বদল করে পরিণত হয়েছে দিনমজুরে। এত কিছুর পরও হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য নাচ-গানের সংস্কৃতি ধরে রাখারও চলছে প্রাণান্তকর চেষ্টা।



বান্দরবানের চিম্বুক-থানচি সড়কের পাশের নির্মম পাহাড়ি জীবনের এই প্রেক্ষাপটেই আজ শনিবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। দিবসটি পালনে আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে তো বটেই সমতলের বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে পালিত হচ্ছে বিভিন্ন কর্মসূচি। কেন্দ্রীয়ভাবে এবারও ঢাকার শহীদ মিনারে পালিত হবে মূল অনুষ্ঠান।

চিম্বুক পাহাড়ের স্থানীয় যুবক চিনপাত ম্রো ২০০৬ সালের ৪ ডিসেম্বর উচ্ছেদ অভিযানের বর্ণনা দিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি তখন ঢাকায় নটর ডেম কলেজের ছাত্র। ছুটিতে পুরনো পাড়া নামক গ্রামের বাড়িতে ফিরছি। শরীর-মনজুড়ে বাড়ি ফেরার আনন্দ। কিন্তু বিকেলের দিকে গ্রামে ফিরে দেখি সব ফাঁকা। কোথাও জনমানুষ নেই। অনেক চেষ্টার পর রাতের বেলা গহিন জঙ্গলে আমার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকে খুঁজে পাই। ভয়াবহ শীতের রাতে ৩৩টি পরিবার জঙ্গলের ভেতর কলাপাতা দিয়ে অস্থায়ী ছাউনি করে কোনোরকমে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। উচ্ছেদের পর অজানা আতঙ্কে সবাই ভীতসন্ত্রস্ত।’



চিনপাত এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যায়ে সমাজতত্ত্ব বিভাগে স্নাতক শেষ বর্ষে পড়ছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রামটি প্রায় ৫০ বছরের পুরনো। উচ্ছেদের পর আমরা চিম্বুক পথের ধারে অল্প কিছু জমিতে ক্রামাদি পাড়া নামে নতুন বসতি গড়েছি। আমাদের জুম পাহাড়, শিকারের বিস্তীর্ণ বন, মাছ ধরার নদী, ঝরণা- সবই এখন নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশিক্ষণ শিবিরের জন্য অধিগ্রহণ করা। জুম চাষের জমি কমে যাওয়ায় ঘরে ঘরে অভাব লেগেই আছে। পর্যটনের গাড়ি চলাচলের সংখ্যা বাড়ছে বলে চিম্বুক সড়কে দুর্ঘটনার সংখ্যাও বাড়ছে। সে সঙ্গে রয়েছে কক্সবাজার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের উৎপাত। আমাদের মেয়েরা আগের মতো স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে না। নতুন উচ্ছেদ আতঙ্ক এখনো তাড়া করে ফেরে। সব সময় ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়।’

নিরাপত্তা বাহিনী সূত্র জানায়, বান্দরবান সেনা প্রশিক্ষণ এলাকাটি ফায়ারিং রেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত। ওই এলাকাটি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার লামা-সুয়ালক ও বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের সংযোগস্থলের হলুদিয়া নামক স্থানে অবস্থিত। এটি মূলত একটি বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা। প্রশিক্ষণ এলাকাটি ১৯৯১-৯২ সালে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্রয়ের মাধ্যমে স্থাপন করা হয়। ফায়ারিং রেঞ্জ এলাকাটি মোট ১১ হাজার ৪৬৭ দশমিক ৪৮ একর জমি নিয়ে বিস্তৃত। এর মধ্যে সরকারি খাস জমির পরিমাণ আট হাজার ৬৩৫ দশমিক ২১ একর এবং ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমির পরিমাণ দুই হাজার ৮৩২ দশমিক ২৭ একর। সূত্রমতে, অধিগ্রহণকৃত জমিতে ‘অবৈধভাবে বসতি স্থাপনকারীদের’ ২০০৬ সালে উচ্ছেদ করা হয়েছে।

সাংস্কৃতিক দলনেতা মেনলেং ম্রো কালের কণ্ঠকে অভিযোগ করে বলেন, ওই সময় নিরাপত্তা বাহিনী কোনো রকম আগাম নোটিশ ছাড়াই ভাগ্যকূল, কদুখোলা, সুয়ালক ও টংকাবতির পাহাড়ে যে ৭৫০টি পরিবারকে উচ্ছেদ করে তাদের মধ্যে ম্রো ছাড়াও বম, চাকমা এমনকি কিছুসংখ্যক বাঙালি পরিবারও রয়েছে। এরপর কেউ তাদের কোনো খবর রাখেনি। তিনি জানান, ২০১০ সাল থেকে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ নামক একটি বেসরকারি সংস্থা ক্রামাদি পাড়ায় ‘রাইস ব্যাংক’ গড়ে তুলে অভাব মোকাবিলায় সহযোগিতা করছে। এপ্রিল, মে ও জুন- এই তিন মাসে জুমের ফসল থাকে না বলে সে সময় খাদ্যাভাব পরিস্থিতি চরমে ওঠে। তখন স্বেচ্ছাশ্রমে গড়ে তোলা ‘রাইস ব্যাংক’ থেকে যেকোনো অভাবী পরিবার খাদ্য সাহায্য পেতে পারে। এ ছাড়া একই উন্নয়ন সংস্থা ম্রো সাংস্কৃতিক দলটিকে প্রাচীন ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে নাচের পোশাক ও বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করছে।

তুম মুম এবং তুম সিং নামের দুজন ম্রো তরুণী নাচেগানে খুবই পটু। তারা জানায়, পরিবারের বয়স্ক নারীদের কাছ থেকে বংশ পরম্পরায় এসব নাচ-গান চলে আসছে। জুম চাষ ও ঘরের কাজের পাশাপাশি নাচ-গানের মাধ্যমে নিজস্ব ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে চায় তারা।

ম্রো সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা যায়, এক ধরনের লাউয়ের খোলের ভেতর নানা মাপের বাঁশের নল পুরে তৈরি হয় ‘প্লুং’ নামের বাঁশি। এটি সম্ভবত একমাত্র দেশীয় বাদ্যযন্ত্র, যাতে একই সঙ্গে একাধিক সুর তোলা সম্ভব। প্লুং বাঁশিটি যত বড় হবে, এর সুরও হবে তত চড়া। নাচ-গানের সঙ্গে আরো যেসব বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয় ম্রো ভাষায় এগুলো হচ্ছে তম্মা (ঢোল), ক্লিন চা (খঞ্জনি) ও লাং মেং সা (বড় খঞ্জনি)। এ ছাড়া মেয়েদের নাচের পোশাককে ‘লংকি’ এবং বাদ্যযন্ত্রীদের পোশাককে ‘লংকি বেন’ বলে। পাগড়িকে ম্রো ভাষায় বলে ‘ন পং’।

মেনলেং ম্রো জানান, ম্রো জীবনেও লেগেছে নগর জীবনের ছোঁয়া। প্রাচীন রীতিনীতি মেনে ম্রোরা এখন আর প্রকৃতি পূজা বা গো-হত্যা উৎসব করে না। ১৯৮৪ সালে সবাই একেশ্বরবাদী ‘ক্রামা’ ধর্ম গ্রহণ করেছে। ঐতিহ্য অনুসরণ করে বেশির ভাগ ম্রো যুবকই এখন লম্বা চুল রাখে না। মেনলেং-এর ভাষায়, ‘সব কিছুই দ্রুত বদলে যাচ্ছে।’
- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2014/08/09/115010#sthash.dsrWTUoh.dpuf

বুকে আগুন জ্বলছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা বলেছেন, দীর্ঘ ১৭ বছরে শান্তিচুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ে একের পর এক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে চলেছে। এসব ঘটনায় আমার বুকের ভেতরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। পার্বত্যবাসী বুঝে গেছে, এ সরকার আর চুক্তি বাস্তবায়ন করবে না। তাই জোরালো সংগ্রাম গড়ে তুলে সরকারকে চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য করা হবে।
ঢাকার মণিপুরিপাড়ায় আঞ্চলিক পরিষদের অতিথিশালায় কালের কণ্ঠের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় সন্তু লারমা এসব কথা বলেন। সাবেক এই গেরিলা নেতা বলেন, পার্বত্যবাসীর পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। পাহাড়ে ভবিষ্যৎ সংগ্রামের রূপ কী হবে সময়ই বলে দেবে। শাসকগোষ্ঠীর আচরণের ওপর নির্ভর করবে আন্দোলনের ধরন। সরকার যদি বল প্রয়োগ করে জনগণকে দমন করতে চায়, তাহলে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে উঠতে বাধ্য। বিশ্বের দেশে দেশে এর উদাহরণ রয়েছে। ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম হয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের উদাহরণ রয়েছে। এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রামেও প্রায় আড়াই দশক সশস্ত্র সংগ্রাম হয়েছে। বিভিন্ন সময় শাসকগোষ্ঠী জনগণকে এসব সংগ্রামে বাধ্য করেছে।
সন্তু লারমা বলেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার বিভিন্ন মেয়াদে ৯ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। তারা চুক্তি বাস্তবায়ন তো করছেই না, বরং চুক্তিবিরোধী নানা পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে। অথচ তাদের সময়েই চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। তারা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। পার্বত্যবাসীর বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে। আর শান্তিচুক্তির পর সে সময়ের বিরোধী দল বিএনপি একে ‘কালো চুক্তি’ আখ্যা দিয়ে রোডমার্চ করেছে। তারাও ক্ষমতায় গিয়ে একইভাবে চুক্তিপরিপন্থী পদক্ষেপ নিয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়নের প্রশ্নে পার্বত্যবাসী মিথ্যা প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে হতাশ, ক্ষুব্ধ। তারা আর প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না। চায় চুক্তির বাস্তবায়ন।
পার্বত্য পরিস্থিতি এখন বিস্ফোরণোন্মুখ উল্লেখ করে সন্তু লারমা বলেন, জিয়াউর রহমান ও এরশাদ সরকারের সময় পাহাড়ে রেশনভুক্ত সাড়ে চার লাখ বাঙালিকে অভিবাসন দেওয়া হয়েছে। বহিরাগতদের সংখ্যা এখন সাত লাখ ছাড়িয়ে যাবে। পাহাড়িরা এখন নিজ বাসভূমে সংখ্যালঘু হতে বসেছে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কায়দায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে ইসলামীকরণের, তথা মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত চলছে। অন্যদিকে ৪৩ বছর ধরে পাহাড়ে চলছে সেনাশাসন। ‘অপারেশন দাবানলের’ পর চলছে ‘অপারেশন উত্তরণ’। চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে সেখানে চলছে অব্যাহত দমন-পীড়ন। সেখানের সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীন জীবন কাটাচ্ছে। বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার নিয়ে তারা বসবাস করতে পারছে না। মাত্র দুই বছরের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সারা দেশ হাঁপিয়ে উঠেছিল। তাহলে পার্বত্যবাসীর অবস্থা ৪৩ বছরে কেমন হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমা আরো বলেন, সরকারের একটি বিশেষ মহল চুক্তিবিরোধী সশস্ত্র সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজ গোষ্ঠী ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট) সৃষ্টি করেছে। পাহাড়িদের এই গ্রুপ সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা এবং জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বকে ধ্বংস করা। এ পর্যন্ত তারা জনসংহতি সমিতির ৮৭ জনকে হত্যা করেছে। আমাকেও হত্যার জন্য কয়েক দফায় সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। শান্তিচুক্তির সমর্থকদের অপহরণ, গুম, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো অসংখ্য জঘন্য অপরাধ করে চলেছে। ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জনগণ অনেকবার আবেদন-নিবেদন করেছে। কিন্তু সরকার আমলে নেয়নি। তাই ২০০০ সাল থেকে চুক্তির পক্ষের জনগণই ইউপিডিএফকে দমনে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। ইউপিডিএফবিরোধী সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তবে তাদের সঙ্গে জনসংহতি সমিতির কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন তো করছেই না, বরং চুক্তিবিরোধী কাজ করে চলেছে।
- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2014/08/09/115011#sthash.gcJJq8Ld.dpuf