Monday, April 21, 2014

টিনটিন অপহরণ ও "সাজানো নাটক" শোরগোল

০১. পাহাড়ের সংগীত শিল্পী সৌরভ চাকমা টিনটিন ও তার বন্ধু রিকি চাকমা অপহরণকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি আদিবাসী বন্ধুদের কোনো কোনো মহল একে "সাজানো নাটক" বলে চিহ্নিত করতে এখন খুবই তৎপর। এ নিয়ে ফেসবুক, ব্লগ ও টুইটুারে মহলটি জোর শোরগোল তুলেছে। 

এই কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে, সিএইচটি টোয়েন্টিফোর ডটকম- নামে আধুনা গজিয়ে ওঠা একটি নিউজ পোর্টাল ।
[http://www.cht24.com/19/04/2014/8128#.U1O4dyfIbFw]




০২. প্রথমেই দেখা যাক, এই সিএইচটি টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর আদ্যপান্ত। এটি শান্তিচুক্তি বিরোধী ইউপিডিএফ-এর একটি মুখপত্র, দলের কেন্দ্রীয় নেতা মিঠুন চাকমা এর পরিচালক। এ দিক থেকে বিচার করলে এই নিউজ পোর্টালটি মোটেই সৎ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ধার-ধারে না এবং দলীয় স্বার্থ রক্ষাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।

এ কারণেই সাংবাদিকতার সব রীতিনীতি লংঘন করে নিউজ পোর্টালটি টিনটিন চাকমার ব্যক্তিগত ফেসবুক স্ট্যাটাস, যা সকলের জন্য উন্মুক্ত নয়, তাকে প্রকাশ্যে এনে দলীয় স্বার্থে অপহরণটিকে "নাটক" সাজাতে চিৎকার চেঁচামেচি জুড়েছে।্ওই স্যাটাসে টিনটিন চাকমা তার উদ্ধার অভিযানের জন্য সেনা বাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এখন দেখা যাক, এটি আদৌ কোনো গুরুতর অপরাধ কি না? নাকি ফেসবুকেই ওই দুই লাইনের প্রশংসা বাক্যেই ১০৪ ঘন্টার বন্দী দশাটিই বেমালুম "সাজানো নাটক" হয়ে গেল!

০৩. টিনটিন চাকমা নামক তরুণটি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তবে তিনি বরাবরই পাহাড়ি মানুষের অধিকার আদায়, তাদের জীবন সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তার ব্যক্তি স্বত্ত্বা ও সংগীত জীবন এরই স্বাক্ষ্য দেয়। তবে একই সংগে তিনি উর্দ্ধতন সেনা কর্মকর্তার জামাতাও। আর তাকে জিম্মী দশা থেকে খুব অল্প সময়ে (যেখানে তিন জন বিদেশীকে উদ্ধার করতে লেগেছে একমাস) উদ্ধার করেছে প্রধানত সেনা বাহিন্ই। তাই মুক্তিপ্রাপ্তির পর পরই মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে ফেসবুকে তিনি প্রথম অনুভূতিটুকু যদি সেনা বাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রকাশ করেন, এটি কেনো গর্হিত অপরাধ হবে? বরং এটিই কি খুব স্বাভাবিক নয়?

লক্ষ্যনীয়, টিনটিন চাকমার ঘনিষ্টজন, উন্নয়ন কর্মী তন্দ্রা চাকমাও ওই রাতে সেনা বাহিনীসহ সকল নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন।

কিন্তু টিনটিন বা তন্দ্রা চাকমার ওই দুই-তিন বাক্যেই প্রমান হয়ে যায় না যে, পাহাড়ে বহু বছর ধরে চলমান সেনা-সেটেলার সন্ত্রাস-নৈরাজ্যকে টিনটিন বা তন্দ্রা চাকমা স্বাগত জানান বা তারা সেনা-সেটেলার চক্রের প্রতি অনুগত। বরং তাদের তাবৎ কর্মকাণ্ডই এই দুষ্ট চক্রের প্রতি এক প্রচণ্ড প্রতিবাদ। বরং এই দু-তিন বাক্যকে পুজিঁ করে সরলীকরণ করাটাই একটি বাল্যখিল্যতা, নাবালকত্বর বহিঃপ্রকাশ।

কিন্তু মিঠুন চাকমা, ওরফে ইউপিডিএফ, ওরফে সিএইচটি টোয়েন্টিফোর ডটকম- পণ করেছে টিনটিন চাকমাকে সেনা অনুগ্ত প্রমান করে অপহরণটিকে "সাজানো নাটক" বানিয়ে ছাড়বেই ছাড়বে। তাই তারা হাস্যকরভাবে নিউজ পোর্টালটিতে জুম্ম আইজুদ্দীন খ্যাত ফেসবুকের ফেকি জেআর কারবারীসহ আরো কিছু ফেক আইডিধারীদের মতামত তুলে ধরে বিশাল গল্প ফেদেঁছে।

০৪. এখন দেখা যাক, শান্তিচুক্তি বিরোধী এই মহলটির টিনটিন অপহরণকে "সাজানো নাটক" চিহ্নিত করতে কেন তৎপর? কারণ, অপহরণের ওই এলাকাটি (নানিয়াচরের কেঙেলছড়ি) গুন্ডুস-ফান্টুসদের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। তাই পুরেো ঘটনাকে বানোয়াট প্রমান করা গেলে এই অপহরণের দায় থেকে ইউপিডিএফ ও সংস্কারপন্থী গণ্ডুস-ফান্টুস দুপক্ষেরই রেহাই মেলে। তারা থেকে যেতে পারে পাহাড়ে অসংখ্য গুম, হত্যা, খুন, অপহরণ ও রাহাজানীর তকমা থেকেও দূরে, ধোঁয়া তুলসি পাতার মতো পুত ও পবিত্র।

এছাড়া ইউপিডিএফ সম্প্রতি পার্বত্য ড্যাব ব্যাটেলিয়ান-এর বিরুদ্ধে কথাবার্তা বলছে। অপহরণটিকে "সাজানো নাটক" বলে চালিয়ে দেওয়া গেলে এটি সেনা-ড্যাবের চালবাজীও বলে প্রতিষ্ঠা করা যায়। অর্থাৎ, ইউপিডিএফ প্রোপাগাণ্ডার মূলে রয়েছে, এক ঢিলে দুই বা তিনটি পাখি শিকার।

০৫. টিনটিন চাকমার অপহরণকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি বন্ধুদের অনেকে কয়েকটি সংগত প্রশ্ন তুলেছেন। যেমন, মিডিয়াতে খবরটি কেনো দেরীতে প্রচার হলো? টিনটিন বা রিকি এই অপহরনের জন্য কেন কোনো পক্ষকে দায়ী করলেন না? মুক্তিপনের টাকা সর্ম্পকে কেউ কথা বলছে না কেন? অপহরণকারীরাই বা ধরা পড়লো না কোনো?

[http://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2014/04/20/74681]

লক্ষ্যনীয়, ইউপিডিএফ কর্তৃক ২০০১ সালে নানিয়ারচরে তিন বিদেশী অপহরণ বা সবশেষ ২০১৩ সালের ৮ জুলাই বাঘাইছড়িতে টেলিটকের পাঁচ জন কর্মী অপহরণের ঘটনাও তাৎক্ষনিকভাবে মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়নি। যখনই নিরাপত্তা বাহিনী বা অপহৃতদের পরিবার বর্গ এটিকে প্রকাশ্য করা প্রয়োজন বলে মনে করেছে, তখনই এটি মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে।

আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের অসংখ্য রাজনৈতিক অপহরণ, খুন ও গুমের ঘটনা মিডিয়াতে প্রচারও হয় না। খোদ ১৯৯৬ সালের ১২ জুন কল্পনা চাকমার মতো একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী অপহরণের ঘটনাও মিপিয়ায় প্রচার পেয়েছে প্রায় একমাস পর!

এছাড়া মুক্তিপনের দাবিতে অপহরণ ও জিম্মি উদ্ধারের পর কখনোই উদ্ধারকারী মিডিয়ায় বলেন না বা তাদের বলতে দেওয়া হয় না যে, কারা ওই অপহরণের জন্য দায়ী। মুক্তিপনের বিষয়টিও বরাবরই থাকে অপ্রকাশ্য। তিন জন বিদেশী, পাঁচজন টেলিটক কর্মী এবং টিনটিন চাকমার অপহরণও এ দিক থেকে ব্যতিক্রম নয়। প্রতিটি ঘটনাতেই অপহরণকারীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে, টিনটিন চাকমার ক্ষেত্রেও এটি ব্যতিক্রম হয়নি। নিরাপত্তা বাহিনীর পরিকল্পনা মতেই, পাহাড়ের সব ঘটনা সব সময় প্রকাশ্য হয় না, কখনো অংশিক সত্য প্রকাশিত হয়। অপহরণের ঘটনাগুলোই এর জ্বলন্ত উদাহরণ।

০৬. তাই "নাটক, নাটক" বলে অহেতুক চিৎকারে কিছু মানুষকে হয়তো কিছু সময়ের জন্য বিভ্রান্ত করা যায়, কিন্তু গোয়েবলসীয় প্রপাগান্ডায় সব সময়ের জন্য সবাইকে বিভ্রান্ত করা যায় না, বোকা বানানো যায় না তো বটেই! পার্বত্যবাসী সব কিছু ভেতর থেকে তলিয়ে দেখছেন। সব জারিজুরি শিগগিরই ফাঁস হবে, এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বন্ধ হোক- হত্যা, অপহরণ, গুম খুন, চাঁদাবাজীর ঘৃন্য রাজনীতি।
জয় হোক জুম্ম জাতির মুক্তির সংগ্রাম!


___
সংযুক্ত: ভিডিও ক্লিপিং

‘শান্তিচুক্তি বিরোধী সন্ত্রাসী গ্রুপ ইউপিডিএফ সেনা বাহিনীর সৃষ্টি। তাদের ওপর থেকে সেনা সমর্থন অনেকটা সরে গেছে। এ কারণে তারা এখন চুক্তি বাস্তবায়নের কথা বলছে। …আমরা সরকারকে বার বার বলার পরেও তারা যেহেতু ইউপিডিএফকে দমনে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না, তাই শান্তিচুক্তির বাধা অপসারণে আমরা ২০০০ সাল থেকে ইউপিডিএফ-র বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেছি’– সন্তু লারমা, সাবেক গেরিলা নেতা, ইন্ডেপেন্ডেন্ট টিভি’কে দেওয়া সাক্ষাতকারে।
http://youtu.be/JPAaQRbRrU0