Monday, February 17, 2014

একুশের সংবাদ: মুনীর অপটিমা থেকে অভ্র


শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ১৯৬৫ সালে উদ্ভাবন করেন ‘মুনীর অপটিমা’ টাইপরাইটার। ছাপাখানার বাইরে সেই প্রথম প্রযুক্তির সূত্রে বাংলা পেল নতুন গতি। স্বাধীনতার পর ইলেকট্রনিক টাইপরাইটারেও যুক্ত হয় বাংলা। পরে আটের দশকে ‘বিজয়’ সফটওয়্যার ব্যবহার করে সম্ভব হয় কম্পিউটারেই বাংলা লেখা। আর ২০০৩ সালের ২৬ মার্চ মুক্ত সফটওয়্যার ‘অভ্র’ উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক নবযাত্রা।

আন্তর্জাতিক বর্ণ সংকেতায়ন বা ইউনিকোডে বাংলা বর্ণলিপি যুক্ত হওয়ায় ‘অভ্র’ ফন্টে সম্ভব হয় ইন্টারনেটে বাংলায় লেখালেখিসহ বাংলায় ওয়েবসাইট নির্মাণ। একই সঙ্গে অফলাইনে বাংলার প্রসার বাড়ে এই সফটওয়্যারে। কম্পিউটারে বাংলা লেখার সুযোগ সৃষ্টি মুদ্রনশিল্পেও এনেছে অভাবনীয় পরিবর্তন।

‘অভ্র’ উদ্ভাবন করেন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান খান। মেহেদী, রিফাতুন্নবি, তানভিন ইসলাম সিয়াম, রাইয়ান কামাল, শাবাব মুস্তফা, নিপুণ হক- এই কয়েক বন্ধু সেই থেকে ‘অভ্র’র উৎকর্ষ বৃদ্ধিতে কাজ করছেন। ‘ভাষা হোক উন্মুক্ত’- এই স্লোগানে ‘অভ্র’র সম্মুখযাত্রা শুরু। এর সমস্ত সংস্করণ ওয়েবসাইট [omicronlab.com] থেকে বিনা মূল্যে ডাউনলোড করে ব্যবহার করা যায়। ব্যবহারকারীর সুযোগ রয়েছে অভ্র, প্রভাত বা ফনেটিক কি-বোর্ড বাছাই করার। এমনকি যিনি কম্পিউটারে বাংলা লিখতে অভ্যস্ত নন, তিনিও অন্তত কিছু বাক্য ‘অভ্র’তে লিখতে পারবেন ডিজিটাল কি-বোর্ড থেকে মাউস দিয়ে।

কয়েক বছর আগে ‘অভ্র’তে ফনেটিক ভার্সন যুক্ত হওয়ায় বাংলা টাইপিং হয়েছে আরো সহজ। রোমান হরফে বাংলা কথাটি টাইপ করলে ফনেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটি পরিণত হবে বাংলায়। ‘অভ্র’ ফনেটিক অনলাইন ও অফলাইনে সমান সক্রিয়। এ ছাড়া ‘অভ্র’র কোডাররা উদ্ভাবন করেছেন বহনযোগ্য সফটওয়্যার ভার্সন। মুক্ত জ্ঞানকোষ বাংলা উইকিপিডিয়া, সংবাদপত্র, নিউজ পোর্টালসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটের সার্চ ইঞ্জিনে এরই মধ্যে যুক্ত হয়েছে এই ফনেটিক অপশন।

ইউনিকোডে বাংলা যুক্ত হওয়ায় ইন্টারনেটে দ্রুত প্রসার হচ্ছে বাংলার। ‘অভ্র’ ও উইন্ডোজ সেভেন এই কাজকে করেছে আরো সহজ। আর কম্পিউটারের উইন্ডোজ সেভেনে বাংলা দেখার জন্য আলাদাভাবে প্রয়োজন নেই বাংলা কনফিগারেশনের। এ ছাড়া ব্রাউজিং সফটওয়্যার ফায়ারফক্সেও এখন যুক্ত হয়েছে ‘অভ্র’। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বিভিন্ন ধরনের কম্পিউটার থেকে তো বটেই, এমনকি মোবাইল ফোনেও সম্ভব হয়েছে বাংলায় লেখাপড়ার কাজ।

অভ্র সফটওয়্যারে ইউনিকোড ব্যবহার করে সহজেই ই-মেইল, ডিজিটাল সংবাদপত্র, নিউজ পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, বাংলা ব্লগসহ সব সাইটেই বাংলায় চলছে লেখাপড়ার কাজ। ওপার বাংলাসহ সারা বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে মহান একুশের গৌরবগাথা। এ কারণে ‘অভ্র’কে অনেকেই বলছেন ইন্টারনেটে বাংলা ব্যবহারের মাইলফলক। উবুন্টু লিনাক্স, উইন্ডোজের সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলা ব্যবহারের।

বেশ কিছুদিন হলো শুরু হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওয়েবসাইট গুগল ও ফেসবুকের বাংলা সংস্করণ। সার্চ ইঞ্জিনের পাশাপাশি গুগলের সব কটি ওয়েবসাইট পরিষেবায় বিশ্বের ৬৫টি ভাষার মধ্যে স্থান পেয়েছে বাংলা ভাষা। ফনেটিকে গুগলেও এখন বাংলায় লেখা সম্ভব হচ্ছে। গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে করা যাচ্ছে বিদেশি ভাষার বঙ্গানুবাদ। তবে এখনো তা অনেকটাই যান্ত্রিক।

‘অভ্র’র পরে ‘বিজয় বায়ান্ন’, ‘বিজয় একুশে’ এবং ‘বিজয় একাত্তর’ নিয়ে এসেছে বাংলা ইউনিকোড ফন্ট। এসব ফন্টের কি-বোর্ড পুরোপুরি ‘বিজয়’ টাইপিং সফটওয়্যারনির্ভর। ফলে যাঁরা কম্পিউটারে লেখালেখিতে বিজয় কি-বোর্ডে অভ্যস্ত তাঁরা এটি সহজেই ব্যবহার করতে পারেন। এ ছাড়া ‘আকাশ নর্মাল’, ‘অপর্ণা লোহিত’, ‘বাংলা’ ‘গোধূলি’ ‘মহুয়া’, ‘মুক্তি’, ‘সোলায়মানলিপি’সহ ডজনখানেক ইউনিকোড ফন্ট উদ্ভাবিত হয়েছে বাংলায়।

‘অভ্র’র অন্যতম উদ্ভাবক ডা. মেহেদী হাসান খান কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, তাঁদের কোডাররা ‘অভ্র’র নতুন নতুন ভার্সন নিয়ে কাজ করছেন। তাঁরা চেষ্টা করছেন বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যারে ‘অভ্র’কে আরো বেশি ব্যবহারবান্ধব করে তুলতে।

- See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/17/53091#sthash.VsQi9shH.dpuf