Tuesday, July 16, 2013

উসুয়ে হাওলাদারের দীর্ঘ সংগ্রাম!

রাখাইন আদিবাসী নেতা উসুয়ে হাওলাদার (৮)। গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালির কলাপাড়ায়। অগ্রসর চেতনার মানুষটি আজন্ম সংগ্রাম করে আসছেন সব ধরণের শোষণ-নিপীড়ন-বৈষম্যের বিরুদ্ধে। ১৯৫২ তে লড়েছেন রাষ্ট্রভাষার জন্য, ১৯৭১ এ দেশ মাতৃকাকে স্বাধীন করার জন্য সংগঠিত করেছেন মুক্তিযুদ্ধ

এখন এই শেষ বয়সে এসেও তার সংগ্রাম শেষ হয়ে যায়নি। এবার তিনি লড়ছেন নিজ স্বাধীন দেশে, নিজ দেশের শাসক-শোষক গোষ্ঠির নিপীড়নের বিরুদ্ধে। ... এ লড়াই নিজ মাতৃভাষা ‘রাখাইন’ রক্ষার। গ্রাম্য জোতদার, আর ভূমি দস্যুদের কবল থেকে আদিবাসীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার।

সম্প্রতি ঢাকার এক অনুষ্ঠানে অমায়িক মানুষটির সঙ্গে আলাপচারিতা হয়। পরে টেলিফোনেও কথা হয় তার সঙ্গে। জানা যায়, সংগ্রামী মানুষটির দেশের জন্য আত্নত্যাগ আর একনিষ্ঠার কথা।

উসুয়ে হাওলাদার বলেন, “আমার জন্ম ১৯৩২ সালে, পটুয়াখলি জেলার রাঙাবালির বড়বাইসদিয়া গ্রামে। বাবা প্রুহ্লাউ হাওলাদার ছিলেন ইউনিয়ন বোর্ড মেম্বার। বাবা-ঠাকুরদা সকলেই ছিলেন রাজনীতি সচেতন। ১৯৫২ সালে আমি বরিশাল মিশন স্কুলের ছাত্র। খুব কড়াকড়ি ছিলো স্কুলে। বাবাদের কাছে শুনেছিলাম, রাষ্ট্রভাষা পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষের [আদিবাসীদের দ্বিতীয়তম] ব্যবহারিক ভাষা "বাংলা"র বদলে "উর্দূ"কে রাষ্ট্রীয় তথা দাপ্তরিক ভাষা করার ঘোষণা দেয় পাক সরকার। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে পূর্ব বাংলা। ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে নামে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের ঢল। পুলিশ-ইপিআর [ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, সীমান্তরক্ষী বাহিনী] গুলি চালালে শহীদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউল প্রমুখ।
মুক্তিকামী জনতার বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশালেও। 

“সে সময় বাঙালি না হযেও মুক্তচিন্তার মানুষ হিসেবে আমি স্কুল পালিয়ে এসব প্রতিবাদী মিছিল-সমাবেশে নিয়মিত অংশ নিয়েছি। শ্লোগান তুলেছি সমান জোরগলায়, উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা করা চলবে না! তোমার-আমার-ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা!

বাঙালি না হয়েও সে সময় রাখাইন আদিবাসী ছাত্র হিসেবে আমি বুঝেছিলাম, উর্দূকে পূর্ববাংলার রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হলে শুধু বাঙালিরাই বিপদে পড়বে তাই নয়, এই রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন থেকে আমরা আদিবাসীরাও শেষ পর্যন্ত কেউই বাদ যাবো না। তাছাড়া মন থেকে এতো বড়ো একটি নিপীড়নমূলক ষড়যন্ত্র আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। তাই স্কুল পালিয়ে জিলা স্কুলের ছাত্রদের সঙ্গে মিছিল-সমাবেশে নিয়মিত অংশ নিতাম। বরিশাল অশ্বনী কুমার হলের সামনে বড় বড় সমাবেশ হতো। সে সময়ের নেতা ও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সংগঠক আব্দুল হামিদ, ব্যারিস্টার সাইদুর রহমান, আব্দুর রহমান এমএলএ প্রমুখ সব সময়ই আমাকে উৎসাহিত করছেন।

"সে সময়ই পরিস্কার হয়ে গিয়েছিল, পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ববাংলার আর থাকা চলে না। এবার চাই স্বাধীন দেশ। ৬০ দশকে নানা ঘটনা, চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে অগ্নিগর্ভ দেশ ১৯৬৯ সালের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ এর নির্বাচন এসে যায়। ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সুবাদে পড়ালেখা ছেড়ে আমি তখন পুরোপুরি রাজনৈতিক কর্মী। কলাপড়া থেকে ন্যাপ- মোজাফফরের হয়ে এমপি নির্বাচনও করি। আমার অঞ্চলের আদিবাসী ও সাধারণ স্থানীয় বাঙালিরা আমাকে আকুণ্ঠ সমর্থন দেয়। তবে আওয়ামী লীগ সে সময় নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন  করলেও পাক সরকার কিছুতেই তাদের সরকার গঠন করতে দেয় না। ১৯৭১ এ  দেশ স্বাধীনতার দোরগোড়ায় পৌঁছে। ২৫ মার্চের পর সবখানে পাক-সামরিক জান্তা আর তাদের সহযোগিরা গ্রামের পর গ্রাম লুঠপাঠ, অগ্নিসংযোগ আর হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। পাল্টা চলে মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ লড়াই। ...

“বরিশাল, পটুয়াখালি থেকে দলে দলে গৃহহীন মানুষ এসে আশ্রয় নেয় কলাপাড়ায়। সে সময় আমি দলবল নিয়ে তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করি। রাজাকারদের রোষানল থেকে জীবন বাঁচাতে অনেককে বরগুনা, পাথরঘাটা, সুন্দরবন হয়ে ভারতে নৌ পথে পালিয়ে যেতে সহায়তা করি। আমার মাধ্যমেই সেখানের মুক্তিযোদ্ধারা খবরা-খবর পেতো। কিয়াঙগুলো (বৌদ্ধ বিহার) ছিল নিরাপদ আশ্রয়স্থল। সেখানে দিনের পর দিন অগণিত হিন্দু-মুসলিম নারী পুরুষকে আশ্রয় দেই। ...এই কাজ করতে গিয়ে এক সময় নিজেও রাজাকার বাহিনীর টার্গেটে পরিনত হলে এলাকা ছেড়ে পালাই।...

“...এখন স্বাধীন দেশে আবারো নতুন করে লড়াই করছি নিজ মাতৃভাষা রক্ষার জন্য। সরকারি-বেসরকারি মহলে নানাভাবে ধর্ণা দিচ্ছি অন্তত শিশুশ্রেণী পর্যন্ত যেন রাখাইন ছেলেমেয়েরা নিজ মাতৃভাষায় পড়াশুনা করতে পারে। অনেক চেষ্টা-তদ্বিরে কিছু সুফল পাওয়া গেছে। এখানকার কলাপাড়া, কুয়াকাটা, আমখোলা, মিশ্রীপাড়া, কালাচানপাড়া, তালতলিপাড়া, আগাঠাকুরপাড়া, কবিরাজপাড়া, সদাগরপাড়া  ইত্যাদি রাখাইন অধ্যুষিত কিয়াঙগুলোতে রাখাইনভাষার স্কুল চলছে। রাখাইন ভাষাতেই আদিবাসী শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা দিতে পারেন, এমন শিক্ষকও আমাদের আছেন। কিন্তু বইপত্র, স্কুলের অবকাঠামো, শিক্ষকের বেতনসহ নানা বিষয়ে সহযোগিতা প্রয়োজন। সরকার এই কাছে সহযোগিতা করলে রাখাইন ভাষাটি অস্তিত্বের সংকট থেকে মুক্তি পায়। শিশু বয়সে নিজভাষায় আদিবাসীরা লেখাপড়া শিখতে পারলে ভবিষ্যতে তাদের ওপরের শ্রেণীতে সাধারণ পাঠক্রম বুঝতেও সুবিধা হয়। 

“আশার কথা, বেসরকারি উদ্যোগে কিছুটা  সুফল পাওয়া গেছে। কারিতাস নামক বেসরকারি সংস্থা রাখাইন ভাষার বইপত্র দিয়ে সহযোগিতা করছে। কিন্তু আমাদের স্কুলগুলোর প্রয়োজন পূর্ণ উদ্যোগে আরো অনেক সহযোগিতা। আমরা বৃহত্তর পটুয়াখালিতে আদিবাসীর মাতৃভাষায় শিক্ষাকে উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাই।...

দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনে কোনো  হতাশা? এমন প্রশ্নের জবাবে উসুয়ে হাওলাদার বলেন, হতাশার তো শেষ নেই! চোখের সামনে ভূমি দস্যুরা আদিবাসী রাখাইনদের জমি-জমা, ব্যবসা-বাণিজ্য কেড়ে নিচ্ছে। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে একে একে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে রাখাইন ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্প। আমার নিজের জমি-জমা, বাড়িঘরও নিরাপদ নয়। নানা স্বার্থান্বেসী মহল এগুলো লুঠপাটের চেষ্টায় ব্যস্ত। অন্যদিকে সারাদেশ ছেয়ে যাচ্ছে রাজাকার আর মৌলবাদে। ... এইসব দেখে মাঝে মাঝে খুব হতাশ লাগে। মনে হয়, এই জন্য কি আমরা ভাষার আন্দোলন করেছি? এমন দেশের জন্য কি আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম? ...

“তবে হতাশ হয়ে বসে থাকলে তো আর চলবে না। তাতে কোনো কাজেই জয়ী হওয়া যাবে না। হতাশা চেপে রেখে দৃঢ় মনোবাসনা নিয়েই আমাদের সামনে এগুলোতে হবে।...তাই আদিবাসীর ভাষা রক্ষার প্রচেষ্টার পাশাপাশি এখন ভূ
মি দস্যু আর জমি জালিয়াতচক্রর হাত থেকে আদিবাসীর জমি রক্ষার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। সংগ্রামের তো শেষ নাই!...”
_____________
  1. সংযুক্ত: রাখাইনরা কেন দেশ ছেড়ে যান?