Thursday, July 28, 2011

বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই?


আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি শুধু পররাষ্ট্রমন্ত্রীই নন, একজন সফল চিকিৎসকও। মন্ত্রী হওয়ার আগে ২০০৮ সালের ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবসে তিনি সন্তু লারমার নেতৃত্বাধিন শোভাযাত্রার মিছিলে এরকম হাসিমুখেই যোগ দিয়েছিলেন। তখন আদিবাসীর অধিকার আদায়ের পক্ষে জ্বালাময়ী বক্তব্যও রেখেছেন। আর এখন নিজের স্মৃতিশক্তির চমৎকার অস্ত্রপচার করে আপামনি বলেছেন, দেশে নাকি কোনো আদিবাসী নেই! এই বক্তব্যের সমর্থনে তিনি সংবিধানটিও ভুলভাল উদ্ধৃত করেছেন।


এ দেশে বসবাসরত ভাষাগত সংখ্যা লঘুদের 'ক্ষুদ্র গোষ্ঠী' হিসেবে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত মঙ্গলবার তাদের পরিচয় সর্ম্পকে 'ভুল ধারণা' নিরসনে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিবিদ ও গণমাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করেন। বিদেশি দূতাবাস ও হাইকমিশনের প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে এই ভূখণ্ডের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্যখ্যা করে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যে 'ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী' বসবাস করছে তারা এ দেশের 'অধিবাসী', কোনাভাবেই নাকি 'আদিবাসী' নন। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে এইসব জাতিগোষ্ঠীকে 'উপজাতি'র বদলে 'ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী' হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী রাষ্ট্রদূতদের বলেন, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, ঔপনিবেশিক ইতিহাস ও জাতি হিসেবে বাঙালির পরিচয় নিয়ে বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি এক ধরনের বৈশ্বিক 'ভুল ধারণার' শিকার হচ্ছে।

ওইদিন সকালে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার পর দুপুরে কূটনীতিবিদদের সঙ্গে বৈঠক করেন মন্ত্রী। এরপর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় একই বিষয়ে সম্পাদক ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রধানদের তিনি এক্ই বয়ান দেন।[লিংক]

পরারাষ্ট্র মন্ত্রীর এই ভন্ডামীর জবাব দিয়েছেন, চাকমা রাজা ব্যরিস্টার দেবাশীষ রায়। পরদিন গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর যে উদ্ধৃতি টেনেছেন- তাও 'সঠিক' নয়। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কোথাও দীপু মনির উল্লেখিত 'জাতিগত সংখ্যালঘু' শব্দটির উল্লেখ নেই। বরং সংবিধানে নতুন যুক্ত ২৩(ক) দফায় আদিবাসী বোঝাতে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, ও ক্ষুদ্র সম্প্রদায় শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে।

রাজা দেবাশীষ বলেন, ১৫ কোটি মানুষের একটি দেশে ১ দশমিক ২ শতাংশ মানুষকে একটি 'বিশেষ পরিচয়ে' উল্লেখ করে ৯৮ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষের পরিচয়কে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা হয় না- পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য 'ভুল-ধারণা প্রসূত'। সাংবিধানিকভাবে 'আদিবাসী' স্বীকৃতি দিলে মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন, প্রান্তিক ও অনগ্রসর এই ১ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ তাদের প্রান্তিক অবস্থান জানানোর একটি আইনি ভিত্তি পাবে। এই মর্যাদা তাদের কোনো 'বিশেষ' সুবিধা দেবে না। [লিংক]


স্মরণ করা যেতে পারে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির টপ বস প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলে থাকার সময় একাধিকবার বিশ্ব আদিবাসী দিবসে ভাষাগত সংখ্যালঘু জনজাতিদের 'আদিবাসী' হিসেবেই উল্লেখ করে তাদের দাবিনামার পক্ষে অনলবর্ষী বাণী দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইস্তেহারে এবং দিন বদলের সনদের ঘোষণায় আদিবাসীর অধিবার প্রতিষ্ঠায় এন্তার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। কিন্তু সেই আওয়ামী লীগই এখন ক্ষমতাসীন হয়ে রাতারাতি গণেশ উল্টে তাদের ভোল পাল্টে ফেললো। সম্প্রতি জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ফোরামে বাংলাদেশের মহাজোট সরকারের প্রতিনিধি দাবি করে বসলেন, দেশে নাকী কোনো আদিবাসী নেই! এরই ধারাবাহিকতায় উপেক্ষিত হলো আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির ৪০ বছরের পুরনো দাবিটি-- যে দাবি বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান রচনারকালেই জুম্ম (পাহাড়ি) জাতীয়তবাদের জনক এমএন লারমা ১৯৭২ সালে জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছিলেন। [লিংক]

যে কোনো যুক্তিবোধ সম্পন্ন মানুষ মাত্রই চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়ের এই কথাটি মানবেন:

সাংবিধানিকভাবে 'আদিবাসী' স্বীকৃতি দিলে মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন, প্রান্তিক ও অনগ্রসর এই ১ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ তাদের প্রান্তিক অবস্থান জানানোর একটি আইনি ভিত্তি পাবে। এই মর্যাদা তাদের কোনো 'বিশেষ' সুবিধা দেবে না।
[লিংক]

তাহলে 'আদিবাসী' প্রশ্নে আওয়ামী লীগের এই আকস্মিক ডিগবাজী কেনো? তাদের ভয়টি আসলে কোথায়? বিএনপিসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোও কেনো অন্যসব বিষয়ে নানা বিরোধী মতে থাকলেও এ বিষয়ে একেবারে নিরবিচ্ছিন্ন ঐক্যমত্যে? সহকর্মী মেহেদী হাসানের একটি ছোট্ট খবরে এসব প্রশ্নের হয়তো জবাব মিলবে।

জানা গেছে, 'আদিবাসী' অভিধা ব্যবহার করলে সরকারকে বিভিন্ন জাতিসংঘের সনদে স্বাক্ষর করতে হয়। সে ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জাতিসংঘের সরাসরি হস্তক্ষেপ করার সুযোগ থাকে। এ পরিস্থিতি এড়ানোর জন্যই বাংলাদেশ সরকার কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে এ দেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান অভিন্ন।

[লিংক]

অর্থাৎ সরকারের ভয়, যুগের পর যুগ ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রত্যক্ষ সেনা মদদে অভিবাসিত বাঙালি সেটেলারদের দ্বারা পাহাড়ি জনপদে একের পর এক যে রোমহর্ষক গণহত্যা, গণধর্ষণ,অগ্নি সংযোগ, পাহাড় ও অরণ্যভূমি দখলের মহোৎসব চলছে, আদিবাসীর সংবিধানিক স্বীকৃতি হলে তাতে না আবার জাতিসংঘ বাগড়া দিয়ে বসে! [লিংক] তখন কে জানে হয়তো বিশ্ব শান্তি রক্ষায় সুনাম অর্জনকারী আমাদের দেশ প্রেমিক সেনা বাহিনীর পাহাড়ে শান্তিরক্ষার আসল রাক্ষুসে রূপটি না আবার বিশ্বব্যাপী হাতেনাতে ধরা পড়ে! সেক্ষেত্রে জাতিসংঘের শান্তি মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর বাদ পড়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়।

অর্থাৎ, এই সূত্রাবলেই বেয়নেটের খোঁচায় রাতারাতি পাল্টে দেওয়া হলো আদিবাসীর সঙ্গা। কি সেলুকাস!
__

ছবি: বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সৌজন্যে।