Friday, October 19, 2012

ভূতেরাই এখন সর্ষের চাষ করছে!

০১. যতোই দিন যাচ্ছে বেরিয়ে আসছে কেঁচো, সাপ এবং অ্যানাকোন্ডা। দৃশ্যত:ই রাঙামাটির সঙ্গে রামু’র সহিংসতার প্রেক্ষাপট ও ধরণ ভিন্ন। আবার দর্শনগত দিক তলিয়ে দেখলে এর মূল ইন্ধনদাতা রাজনৈতিক শক্তি/আস্কারাটির রসুনের গোঁড়া অভিন্ন।

খবরে প্রকাশ, রামুর বৌদ্ধ জনপদে হামলায় জোরালো ও মূল ভূমিকা রাখে জামায়াতে ইসলামী। তারা কৌশলে ব্যবহার করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের। আর ওই তাণ্ডব চালাতে টাকাপয়সার জোগান দেয় রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরএসওসহ কয়েকটি এনজিও।

স্থানীয় প্রশাসন ঘটনার পূর্বাভাস পেলেও তাতে গুরুত্ব দেয়নি। পুলিশসহ বিভিন্ন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিল সমন্বয়ের মারাত্মক অভাব। গোয়েন্দারাও ছিলেন চুপচাপ। দলগুলোর কেন্দ্রীয় ঘোষণাপত্রে/নির্বচনী প্রতিশ্রুতি অসাম্প্রদায়ীক/বৈষম্যহীন/সকল ধর্মের সমান অধিকার প্রভৃতি যতো ভালো ভালো কথাই লেখা থাকুক না কেনো, রামু, উখিয়া, টেকনাফ ও পটিয়ায় তৃণমূলে ঠিকই ধরা পড়েছে অন্তদর্শনের ভয়াল দন্ত-নখর। [দ্র. দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১৯ অক্টোবর ২০১২]

আবার রাঙামাটিতে আদিবাসী পাহাড়িদের ওপর সহিংস হামলাটি সরাসরি সেনা-পুলিশ উপস্থিতিতে অভিবাসিত বাঙালি সেটেলার হামলা হয়েছে। সে সময় দলমত নির্বিশেষে "বাঙালি" পরিচয়ে গর্বিত সংখ্যাগুরুরাই হামলা পরিচালনা করে ও নেতৃত্ব দেয়। হামলাকারীদের অন্যসব রাজনৈতিক পরিচয় মুছে গিয়ে একটি পরিচয়ই প্রধান হয়ে দাঁড়ায় -- "বাঙালি" ও "মুসলমান" [নারায়ে তাকবির!]

সংক্ষেপে, পাহাড় ও সমতলে ভাষাগত/ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর প্রশাসনিক আস্কারায় দলমত মিলেমিশে সন্ত্রাসী চেহারায় এ ধরণের সহিংস আক্রমণের সাহস পাচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে বটে, কিন্তু ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতির বিচার নেই; ভোটের মোকাম ঝলমলে রাখতেই একে জিইয়ে রাখা হয়েছে, বিএনপি/আওয়ামী লীগ/জামাত যুথবন্দী এ সব গুরুতর হামলা এবং এ সংক্রান্ত ঐক্যের প্রশ্নে ["লা ইলাহা ইল্লা, নৌকার মালিক তুই আল্লাহ"]।

এই আগ্রাসী উগ্র জাতীয়তবাদ/মৌলবাদ আস্কারার ভিঁতটি অনেক গভীরে। এই দর্শন বলেই সবক’টি বড় রাজনৈতিক দল [এবং তাদের গঠিত সরকারসমূহ] ভাষাগত/ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পীড়ন করে, কখনো "বৈষম্যহীন" বা "অসাম্প্রদায়িক" গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি ["ভাবমূর্তি" কথাটি এদের খুবই প্রিয়] ঠিক রাখতে তারা আবার নির্যাতীতর মাথায় হাত্ও বুলায়; বৌদ্ধ পুরোহিতদের চিবর দান করে বা মন্দিরে ছদকা দেয় বা দূগোৎসবে হাস্যোজ্জ্বল ছবি দেয় টিভিতে-খবরের কাগজে বা “এ সরকারের সময়েই শান্তিচুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হবে [ইনশাল্লাহ]” জাতীয় বোলচাল দিতে থাকে অহরাত্র ।…



০২. ১৯৭২ এ সংবিধান রচনার কালে ঐতিহাসিক মুজিবীয় ["তোরা সব বাঙালি হইয়া যা"] উক্তিটি স্মরণ করা যাক। এটি উগ্র জাতীয়তাবাদী দর্শনকে ধারণ করে, যার শেকড় ফ্যাসিবাদ তথা মৌলবাদে গাঁথা [মুক্তি যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে মুজিবের দুঃশাসন এবং পরবর্তী শাসকগোষ্ঠিগুলো এখনো এই দর্শনটিকেই ধারণ করে]।


মুজিবীয় ওই উক্তিটি আবার একই সঙ্গে অস্বীকার করে ১৯৭১ এর অসাম্প্রদায়ীক- বৈষম্যহীন দেশগড়ার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা; যে চেতনায় ভাষাগত/ধর্মীয় সংখ্যালঘু – সংখ্যাগুরু, আদিবাসী ও বাঙালি স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম, বাংলা নামক ভূখন্ডের সবচেয়ে গৌরব গাঁথা মুক্তিযুদ্ধটিকেই। এ কারণে সে সময়ই কিংবদন্তী পাহাড়ি নেতা এমএ নলারমা বাংলাদেশের খসড়া সংবিধান রচনার কালে সেখান থেকে আদিবাসী/উপজাতিদের বাদ দিয়ে শুধু "বাঙালি" জাতীয়তাবাদী ঝান্ডা ওড়ানোর প্রতিবাদ করেন।

৬০ দশকে কাপ্তাই জলবিদ্যুত নির্মাণে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পানিতে তলিয়ে দিয়ে ও প্রায় এক লাখ মানুষকে উদ্বাস্তু বানানো, ১৯৭১-৭২ সালে কতিপয় বিপথগামী মুক্তিযোদ্ধা ও বিডিআর-এর পাহাড়ে চালানো হত্যাযজ্ঞ [এখন বিজিবি] এবং মুজিবের ["তোরা সব বাঙালি হইয়া যা"] নাকচের পর এমএন লারমা বাকশালে যোগদানের ঐতিহাসিক ভুলটুকু শুধরে নিয়ে বাকশাল সরকারের চরম স্বৈর শাসনের বিরুদ্ধেই সংগঠিত করেন গেরিলা গ্রুপ শান্তি বাহিনী; এই গ্রুপের গেরিলা যুদ্ধ চলে প্রায় আড়াই দশক। [সংবিধানে "বাঙালি" জনিত প্রেক্ষাপটটি এখনো অব্যহত থাকায় ভিন্ন মাত্রায় প্রতিবাদটি চলছেই]।

["তোরা সব বাঙালি হইয়া যা"] দর্শন বলেই জে. জিয়া পাহাড়ে সেটেলার বন্যার খোয়াব দেখেন, পার্বত্য চট্টগ্রামকে বানান -- আ ল্যান্ড অব দা প্যারেড গ্রাউন্ড ["মানি ইজ নো প্রবলেম"], এরশাদ এবং খালেদা-হাসিনা-খালেদা-মইন/ফখরুদ্দীন-হাসিনা একই ধারাবাহিকতায় খোয়াবের সফল বাস্তবায়ন করে চলেন। এর নীট ফলাফল অতি অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধটিকে বাঙালি-আদিবাসীর যৌথ মুক্তি সংগ্রামকে অস্বীকার, ১৯৭২ এর সংবিধানে আদিবাসী/উপজাতিকে উপেক্ষা [দ্র. গেরিলা নেতা এমএন লারমা ], জেনারেল জিয়া-এরশাদ-খালেদা-হাসিনা-খালেদা-মইন+ফখরুদ্দীন-হাসিনার সরকার আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে সেটেলার বাঙালি-সামরিক জান্তার পাকিপনার ভূখন্ডে পরিনত করা; তারই জের টেনে শান্তিচুক্তি পূর্ব পাহাড়ি জনপদে অন্তত ১৩ টি বড় ধরণের গণহত্যা, বাস্তভিটা থেকে উচ্ছেদ করে প্রায় ৬০ হাজার পাহাড়ি শরণার্থীকে এবং শান্তিচুক্তি পরবর্তীতে গত দেড় দশকে সংগঠিত হয় অন্তত ১৪ টি সহিংস হামলা [আলোচ্য রাঙামাটি সহিংসতার ঘটনাও কী তার সাক্ষ্য দেয় না?]


এই প্রেক্ষাপটেই পাহাড় ও সমতলে ভাষাগত/ধর্মীয় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলে গত চার দশক ধরে রক্ত ঝরছেই, আগুন জ্বলছেই। অন্যদিকে, ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়ীক চেতনা [এমনকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পাইহারি বিক্রেতা আ'লীগের] সংশোধিত সংবিধান এখন পরিনত হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা+বিসমিল্লাহসহ গজকচ্ছপ সুন্নাহর দলিলে। …




০৩. পাহাড়ে এমএন লারমার [পরে সন্তু লারমা] আড়াই দশক শান্তিবাহীর গেরিলা যুদ্ধ চালানোর পরে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি হয়। তবে দৃশ্যত শান্তিচুক্তির মৌলিক শর্তসমূহ [যেমন, ভূমির বিরোধ নিস্পত্তি, পার্বত্য জেলা ও আঞ্চলিক পরিষদকে শক্তিশালীকরণ, অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন] বাস্তাবায়িত না হওয়ার সুযোগে এবং ইতিহাসের লীলায় সেখানে সেনা – অভিবাসিত বাঙালি [সেটেলার] রাজ্য শান্তিচুক্তি-পূর্ব অবস্থার মতোই চলতে থাকে।

সংখ্যাগুরুর ভোটের হিসেব ঠিক রাখতে সরকারগুলোর প্রত্যক্ষ আস্কারায় পাহাড়ে সেনা-সেটেলার পাকিপনা জেঁকে বসে; সেখানে গড়ে ওঠে রাষ্ট্রের ভেতর আরেক সেনা-সেটেলার-সম অধিকারের [আসলে সংখ্যাগুরু জাতীয়তবাদ ও মৌলবাদে সেনা-বিএনপি/জামাত/এমন কি আ'লীগেরও] তালেবানী রাষ্ট্র।…

০৪. " সাজেদা চৌধুরীর দাবি, আগে পাহাড়িরা ভালো ছিল। তেমন কিছু বুঝত না। ওদের টাকা দিয়ে, নানা প্রলোভন দেখাচ্ছে বিদেশিরা।" [দ্র. বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২ অক্টোবর ২০১২]

উগ্র জাত্যাভিমানের ঝাণ্ডাধারী আওয়ামী স্কুলিং-এর আচরণগত বহিঃপ্রকাশ সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর এই কাণ্ডজ্ঞানহীন অশালীন উক্তি [তোরা সবাই বাঙালি হইয়া যা: শেখ মুজিব, ১৯৭২। বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই/বাঙালিরাই আদিবাসী/উপজাতিরা বহিরাগত: দীপু মনি, ২০১১; দ্র. বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৬ জুলাই ২০১১]।


স্মরণ করা ভালো, বিগত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সাবেক বন ও পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী সরাসরি অবস্থান নিয়েছিলেন আদিবাসীদের বিপক্ষে। ২০০৩-০৪ সালে গণবিরোধী ইকো-পার্ক প্রতিরোধ আন্দোলনে গর্জে উঠেছিলো মধুপুরের শালবন এবং মৌলভীবাজার-কুলাউড়ার খাসিয়া পাহাড়। সে সময় আদিবাসীর প্রাণের দাবি উপেক্ষা করে সৈয়দা সাজেদা খাসিয়া পাহাড়ে ইকো-পার্ক প্রকল্প উদ্বোধন করতে চাইলে আদিবাসীরা তাকে কালো পতাকা দেখিয়ে ধাওয়া করে। পিরেন স্নালের তাজা রক্তে রুখে দেওয়া হয় ইকো-পার্ক।

ইতিহাসের লীলায় আদিবাসীদের গণশত্রু সৈয়দা সাজেদাই এখন আবার পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক! তিনিও আওয়ামী-ছেলে ভুলানো বুলিটি অহরাত্র আউড়ে চলেছেন: "সরকার পার্বত্য এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকার যে কোনো মূল্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন করবে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আমরা চুক্তি বাস্তবায়নের সকল বাধা দূর করতে চাই।"

এ যেনো নরুণ পড়েছে বানরের হাতে! অথবা ভূতেরাই এখন সর্ষের চাষ করছে!

০৫. বটম পয়েন্টে : এ অবস্থায় রাজনৈতিক শক্তির উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধমীয় মৌলবাদী চেতনার জরুরি অস্ত্রপচার ছাড়া ভাষাগত/ধর্মীয় সংখ্যালঘুর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আদৌ সম্ভব নয়; এটিই হচ্ছে প্রকৃত বাস্তবতা ["আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম"]। একে অস্বীকার করার অর্থ হবে “চোখ বুজে চড়ুই ধরার” মতোই একটি নিস্ফল চেষ্টা মাত্র, যা প্রকৃত সত্যকে অনেকাংশেই আড়াল করে, দীর্ঘ বিভ্রান্তিতে আচ্ছন্ন করে আম-জনতাকে। রাজনৈতিক শক্তিমত্তার এ হেন হীন উগ্র/মৌলবাদীতার বাইরেই বাঙালি-আদিবাসী-বাংলাদেশী এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-মুসলিম হাজার হাজার বছর ধরে সহাবস্থান করছে, [পাক সার জমিন সাদ বাদের] প্রবল আপত্তি স্বত্ত্বেও।
__
ছবি: রামুর সহিংসতা ও রাঙামাটির সহিংসতা, ফেবু'তে নিজস্ব সূত্রে প্রাপ্ত।