Wednesday, May 23, 2012

আমাদের শিশুরা কী পড়ছে?


০১. প্রশ্নটি প্রথম তোলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাবেরী গায়েন। গুমট গরমের পর বিকেলে এক ঝলক স্বস্তির বৃষ্টির সময় কাবেরী আপা মনে করিয়ে দেন শৈশবের সেই মায়াময় শিশুপাঠ:



বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর
নদেয় এলো বান
শিব ঠাকুরের বিয়ে হবে
তিন কন্যা দান। এক কন্যা রাঁধে-বাড়ে
আরেক কন্যা খায়
আরেক কন্যা গাল ফুলিয়ে
বাপের বাড়ি যায়।

এই শিশুপাঠে শিব ঠাকুরকে তিনটি কন্যা দান করার কথা বলা হচ্ছে, অর্থাৎ কি না তিন-তিনটি স্ত্রী! এর উপস্থাপনাটি এতোই নিরীহ যে, যেনো এটি ঠাকুর মশাইয়ের প্রাপ্য এবং এটিই স্বাভাবিক। আর কি বিস্ময়করভাবে প্রশ্নাতীত অবলীলায় সরল শিশু মনে স্থান করে নিচ্ছে এই নৈতিক অসঙ্গিতপূর্ণ ছড়াটি! এ পর্যায়ে হাসান মূর্শেদ বলেন, ওই বিকেলেরই এক তাজা অভিজ্ঞতার কথাটি। বৃষ্টি-টৃষ্টি ধরে যাওয়ার পর ছোট্ট শিশুটিকে স্কুল থেকে বাড়িতে নিয়ে ফিরছিলেন তিনি। আনমনে আবৃত্তি করে ফেলেন, বৃস্টি পড়ে টাপুর-টুপুর।…

ছড়াটি ভালো করে শিশুটিকে শোনানোর পর তার প্রশ্ন ছিলো, বাবা, শিব ঠাকুর কি দুষ্টু লোক? নইলে তিনি তিনটি বিয়ে করবেন কেনো? তবে এখানে বাঁচোয়া এই যে, আমাদের এই কিন্ডারগার্টেন পড়ুয়া চিপস জেনারেশন ঠিকঠাকভাবে ছড়াটির অসঙ্গতি ধরতে পেরেছে এবং সে চুপ করে না থেকে আধুনিক চিন্তার মানুষ বাবা মশাইকে প্রশ্ন করে হয়তো সঠিক উত্তরই পেয়েছে। কিন্তু এখানে চরিত্রটি খানিক বদল করে ফেললে কী হয়? ধরা যাক, কোনো গণ্ড-গ্রামের শিশু ও স্বল্প শিক্ষিত বাবা। অথবা কোনো মফস্বলের সেমি- চিপস জেনারেশন ও স্বল্প শিক্ষিত বাবা। তাহলে ওই ছড়াটির পাঠ-প্রতিক্রিয়া বা মিথস্ক্রিয়া কী একই রকম হতো?

০২. আমাদের শিশুতোষ পাঠে লক্ষিন্দরের লোহার বাসরে ঢুকে পড়া লাউডগা সাপের মতো প্রায় হুটহাট করে ঢুকে পড়ে বিয়ে নামক এক সামাজিক বন্ধন। এটি আবার একই সঙ্গে বাঙালি জীবনে এক স্বপ্নময় উৎসব এবং মোটাদাগে ছেলেদের স্ট্যাটাস এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়েদের ক্যারিয়ার। এ প্রসঙ্গটি অবশ্য ভিন্নতর ক্ষেত্রে বিশদ আলোচনার দাবি রাখে; অতএব এটি একটি বাই লাইন। বরং শিশুতোষ পাঠে ফেরা যাক। ছড়া ছড়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সরল শিশুমনে বিয়ের জটিল চিন্তা।…

চাঁদ উঠেছে, ফুল ফুটেছে,
কদম তলায় কে?
হাতি নাচে, ঘোড়া নাচে
খুকুমনির/ খোকন সোনার বিয়ে।
অথবা–
আইকম-বাইকম তাড়াতাড়ি
যদু মাস্টার শশুড় বাড়ি
রেল গাড়ি ঝমাঝম
পা পিছলে আলুর দম।…
এটি কেনো? এইসব পুরনো পাঠের আমলে বাল্য বিবাহ সিদ্ধ ছিলো বলেই কী? তাহলে ‘বাল্য বিবাহ আইনত দণ্ডনীয়’ এবং পরিবার-শাপলা মূদ্রার ঝকঝকে আমলে কেনো ও কীভাবে এইসব ঢুকে যায় আমাদের বাল্যশিক্ষায়? আবার দেখুন প্রায় কিংবদন্তীর শিশু সাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খানের (দাদা ভাই) শ্রেণী অবিচার:

বাক্ কুম পায়রা
মাথায় দিয়ে টায়রা
বউ সাজবে কাল কি?
চড়বে সোনার পালকি?
পালকি চলে ভিন গাঁ-
ছয় বেহারার তিন পা।
পায়রা ডাকে বাকুম বাক্
তিন বেহারার মাথায় টাক।
বাক্ বাকুম বাক্ বাকুম
ছয় বেহারার নামলো ঘুম।
থামলো তাদের হুকুম হাঁক
পায়রা ডাকে বাকুম্ বাক্।
ছয় বেহারা হুমড়ি খায়
পায়রা উড়ে কোথায় যায়?
০৩. লক্ষনীয়, এই সব ছড়াকার ও শিশুপাঠ্যের রচয়িতাগণ সকলেই পুরুষ এবং সকলেই উগ্র পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনা ছড়িয়ে দেন তাদের আপাত সরল লেখনিতে। বিষয়টি আরো পরে ব্যাখা করা যাবে। এখন চট করে দেখে নেই আমাদের শিশুপাঠের আরো কিছু অসঙ্গতি।
স্বরে অ’তে অজগর, স্বরে আ’তে আম। ঐ অজগর আসছে তেড়ে, আমটি আমি খাবো পেড়ে।

শিশু বইয়ে একই সঙ্গে অজগরের তেড়ে আসার ভয়াল চিত্র ও রংচং-এ আমের লোভনীয় ছবি থাকার পরেও প্রশ্ন হচ্ছে, অজগর তেড়ে আসার সময় আমাদের কী আম খাওয়ার ইচ্ছে জাগে? খুব জানতে ইচ্ছে করে, এই গুরুতর প্রশ্নটি কী বিদ্যাসাগর মশাইকে সে সময়ের ছোট-বড় কেউ করেছিলেন? করে থাকলে কী ছিলো তার জবাব? অথবা–

নোটন নোটন পায়রাগুলি ঝোটন বেঁধেছে,
ওপাড়েতে ছেলেমেয়েরা নাইতে নেমেছে।
দুই ধারে দুই রুই-কাতলা ভেসে উঠেছে,
দাদুর হাতে কলম ছিলো ছুঁড়ে মেরেছে,
উফ্, বড্ডো লেগেছে!

হুমম…কলম ছুঁড়েই রুই-কাতলা ঘায়েল? মামা বাড়ির আব্দার বুঝি? মামা বাড়ি নিয়েই বরং আরেকটি ছড়ার উদাহরণ দেওয়া যাক।

তাই তাই তাই, 
মামা বাড়ি যাই,
মামা দিলো দুধ-ভাত,
পেট পুরে খাই।
মামী এলো লাঠি নিয়ে,
পালাই পালাই।…

মামা না হয় আব্দারের আশ্রয় মানলাম, মামী মানেই কী লাঠি হাতে তেড়ে আসা এক ভয়ংকর দজ্জাল মহিলা? যেমন, রূপকথা ও গল্পকথার বইয়ে সতীন মা’কে মহিলা ভিলেন সাজানো হয়, তার না হয় বেশ খানিকটা সামাজিক বাস্তবতা আছে মানলাম। কিন্তু তাই বলে মামা যখন ভাগ্নেকে দুধ-ভাত খেতে দিচ্ছেন আদর করে, তখন মামীর এই লাঠি হাতে তেড়ে আসা কেনো হে? একটু আগেই ছড়া লেখকগণের যে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কথা বলা হচ্ছিলো, এখানে তো সেটিই স্পষ্ট। অবশ্য ছড়াকার পুরুষ না হয়ে নারী হলেই এর খুব বেশী হেরফের হয়তো হতো না। বিষয়টি কী খানিকটা স্পষ্ট হয়, মার্কিন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিসা রাইসের ইরাক যুদ্ধনীতিতে? কই, তিনি নারী, অর্থাৎ মায়ের জাত এবং কালো মানুষ, অর্থাৎ কয়েক হাজার বছরের নির্যাতীতর একজন বলে তো, ইরাক যুদ্ধনীতির প্রশ্নে সাধারণ নিরীহ গণমানুষ হত্যার আদেশে তার এতোটুকু হাত কাঁপেনি!

এখানে অবশ্য রাজনীতির কূটচালের কথা এসে যায়। এসে যায়, সেই ধাক্কা জাগানিয়া রাগ ইমনের প্রোফাইল কথনের অসারতা: আমার শাড়ি খুলে ফেললে, তোমার মা উলঙ্গ হন! সে সব অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ। লেখার শুরুতে যে শিব ঠাকুরের বিয়ের কথা বলা হচ্ছিলো, এ সব সেই ‘ধান ভাঙতে শিবের গীতের’ মতোন।
 

০৪. আলোচনার খাতিরে আমরা যদি ধরে নেই, ‘হামটি-ডামটি স্যাট অন আ ওয়াল’ বা ‘হাট্টিমা টিম টিম,তারা মাঠে পাড়ে ডিম’-এর মতো ওইসব শিশুতোষ পাঠ, একেকটি নন-সেন্স রাইম বা অর্থহীন ছড়া, তাহলেও বিপদ আছে। কেনো না এইসব লেখনি সত্যি সত্যি বেশ খানিকটা সেন্স তৈরি করে, শিশু মনে মনছবি আঁকে, তাঁকে একটি ম্যাসেজ দিতে চায়। …ম্যাসেজটি কী, এর গতি-প্রকৃতি ও দিক-দর্শন কী, সেটিই হচ্ছে ভাবনার বিষয়।…

এখনকার শিশুপাঠ্যে ‘সিংহ মামা, সিংহ মামা, করছে তুমি কী?/ এই দেখো না কেমন তোমার ছবি এঁকেছি’–এইসব নির্বিবাদী ও নিরীহ ছড়ার বাইরে আরো কী কী ভয়ংকর বিষয়-আশয় ঢুকে গেছে, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি রাখে বৈকি।…

__
ছবি: কোয়াহগ নিউজফাইভ ডটকম