Sunday, February 10, 2013

স্লোগান-কন্যা লাকী:: একাত্তরই আমার প্রেরণা


ছোটখাটো গড়নের শ্যামলবরণ মেয়েটির নাম লাকী। পুরো নাম লাকী আক্তার। অবিরাম নানা সংগ্রামী স্লোগানে মাতিয়ে রাখেন শাহবাগের 'স্বাধীনতা প্রজন্ম চত্বর'। এরই মধ্যে 'স্লোগান-কন্যা' হিসেবে তাঁর নাম রটে গেছে। মাইক্রোফোন হাতে খেপা বাউলের মতো নেচে নেচে স্লোগান দেন লাকী। তাঁর স্লোগানেই টানা পাঁচ দিন ধরে প্রদীপ্ত তারুণ্যের চেতনার মশাল। জোরালো কণ্ঠে জ্বালাময়ী এত সব স্লোগান আসে কোথা থেকে?
লাকী বলেন, '১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আর অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা আমি ঢেলে দিই স্লোগানে। '৭১ থেকেই প্রেরণা পাই। ছাত্র-জনতাই আমার স্লোগানের শক্তি।'
গতকাল শনিবারও দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত বিরতিহীন সংগ্রামী স্লোগানে শাহবাগ মোড়ের বিশাল সমাবেশকে জাগ্রত করে রাখেন লাকী। খানিক বিরতির ফাঁকে সমাবেশের ভেতরেই কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। লাকী জানালেন, তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি চতুর্থ বর্ষের (অনার্স) ছাত্রী। ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক। গ্রামের বাড়ি ফেনীতে।
স্লোগান দিতে শিখলেন কোথা থেকে? লাকী বলেন, 'আমি মুক্তিযোদ্ধা বাবা ফজলুল হকের গর্বিত সন্তান। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সব সময় আমার ভেতরে কাজ করে। এই সংগ্রামী চেতনা থেকেই এর আগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার আন্দোলনে যোগ দিয়েছি। এখন যুদ্ধাপরাধী তথা রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে যুক্ত হয়েছি। মিছিলে মিছিলে স্লোগান দিতে দিতেই আমার স্লোগান শেখা। ছাত্র-জনতাই আমাকে সংগ্রামী সব স্লোগান দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।'
'১৯৭১-এ আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি'- এ কথা জানিয়ে লাকী বলেন, 'কারণ একাত্তরের ঘাতক-রাজাকার-আলবদর-আলশামসের বিচার এখনো হয়নি। বিচার শুরু হয়েছে, কিন্তু ঘাতক কাদের মোল্লার কাঙ্ক্ষিত ফাঁসির রায় হয়নি। গোলাম আজম, সাঈদী, নিজামী, মুজাহিদসহ সব ঘাতকের ফাঁসিই হচ্ছে প্রকৃত বিচার। তাদের রাজনৈতিক দল জামায়াত-শিবির এখনো ঘাতকের ভূমিকায় রয়েছে। ১৯৭১-এ তারা যেমন অসংখ্য গণহত্যা করেছে, হাজার হাজার মা-বোনের সম্ভ্রম নষ্ট করেছে, স্বাধীন দেশেও তারা একইভাবে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। জামায়াত-শিবিরের ঘাতক বাহিনীর হাতে ছাত্র ইউনিয়নসহ অনেক প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীদের প্রাণ দিতে হয়েছে। তাই উচিত হবে, আইন করে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি একেবারে নিষিদ্ধ করা। নইলে স্বাধীনতার মর্যাদা বারবার বিপন্ন হবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত হবে।'
লাকী বলেন, '১৯৭১-এর বিজয়ের চেতনার পাশাপাশি এসব অপ্রাপ্তি, অব্যক্ত যন্ত্রণা আমি স্লোগানে-স্লোগানে জানান দিতে চাই। চলমান আন্দোলনে আমি নিজেই মুখে মুখে কিছু স্লোগান বানিয়েছি। কিছু স্লোগান আগের আন্দোলন সূত্রে পাওয়া। উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর কিছু স্লোগান একটু বদলে নিয়েছি। জামায়াতে ইসলাম/মেড ইন পাকিস্তান- এই স্লোগানটি আমার নিজের তৈরি।'
একজন মেয়ে হিসেবে লাখো ছাত্র-জনতার সমাবেশে স্লোগান দিতে গিয়ে কখনো অস্বস্তি বোধ করেন কি? জবাবে লাকী বলেন, "এসব ক্ষেত্রে কখনোই কোনো মেয়েলি জড়তা বা লজ্জা আমার ভেতর কাজ করে না। আমি তো মিছিলেরই মেয়ে। আন্দোলন-সংগ্রামই আমাকে 'স্লোগানিস্ট' বানিয়েছে।"
পাল্টাপ্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, 'ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রতিটি গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল আন্দোলনেই মেয়েরা সামনের কাতারে ছিল। তারাও ছেলেদের পাশাপাশি লড়েছে; অস্ত্র হাতে যুদ্ধও করেছে। আমরা এ প্রজন্মের মেয়েরা কেন পিছিয়ে থাকব? আমি স্লোগান দিলে কি ছেলেরা আমার সঙ্গে গলা মিলিয়ে স্লোগান ধরে না? তাহলে সমস্যা কোথায়?'
আলাপচারিতার মধ্যেই আবারও স্লোগানের জন্য ডাক পড়ে লাকীর। বোতল থেকে দুই-এক চুমুক পানি খেয়ে গলা ঠিকঠাক করে নিয়ে জোড়া মাইক্রোফোন হাতে খেপা বাউলের মতো নেচে নেচে স্লোগান দিতে শুরু করেন তিনি- 'ক'-তে কাদের মোল্লা/তুই রাজাকার; 'খ'-তে খুনি কাদের/তুই রাজাকার; 'গ'-তে গোলাম আযম/তুই রাজাকার। 'ঘ'-তে ঘাতক জামায়াত/তুই রাজাকার।' ...আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে তাঁর স্লোগান- 'আইন করে জামায়াত-শিবির/নিষিদ্ধ করো, করতে হবে'; 'আমাদের ধমনিতে শহীদের রক্ত/এই রক্ত কোনোদিন পরাভব মানে না'...।
http://www.kalerkantho.com/print_edition/index.php?view=details&type=gold&data=news&pub_no=1149&cat_id=1&menu_id=14&news_type_id=1&index=3&archiev=yes&arch_date=10-02-2013#.VNtotyfIYQs