Tuesday, April 24, 2012

খাসিয়া পাহাড় চিত্র।। ফটো ব্লগ।।

খাসি বা খাসিয়া আদিবাসী জীবন পান চাষ নির্ভর। শ্রীমঙ্গলের আসাম সীমান্তের খাসি-হিলে দেখা মেলে এমন নিবিড় পান জুমের। খাসিয়া গ্রাম বা পুঞ্জিগুলো পাহাড়ের ওপর অরণ্য ঘেরা। এই প্রাকৃতিক অরণ্যই খাসিয়াদের জীবন। সেখানের বড় গাছগুলোকে আশ্রয় করে বেড়ে ওঠে পান লতা। সমতলের পান চাষের চেয়ে খাসিয়া পান চাষ তাই ভিন্ন প্রকৃতির। এই পদ্ধতির পান চাষকে বলে 'পান জুম'। পান জুমের পাতাগুলো আকারে ছোট, এগুলো বেশ ঝাঁঝালো স্বাদের। দেশ-বিদেশে পান-প্রিয়দের কাছে খাসিয়া পান পাতার বিশেষ কদর রয়েছে।




নাহার খাসি পুঞ্জিতে দেখা যায় এভাবে বাঙালি পাইকারদের নিয়োগকৃতরা এসে পান জুম থেকে পান সংগ্রহ করেন। আদিবাসী যুবক রেয়াং টম ডায়ার জানান, খাসিয়ারা কোনো রকম সার ও কীটনাশক ছাড়া পান চাষ করেন বলে সমতলের পানের চেয়ে এর চাহিদা অনেক বেশি। এক কুড়ি (প্রায় তিন হাজার) খাসিয়া পানের দাম এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। এসব পান পাইকাররা চড়াদামে স্থানীয় বাজারে তো বটেই, এমনকি বিদেশেও রপ্তানি করেন।


খাসি আদিবাসী জীবন ছবির মতোই সুন্দর, সরল। খাসিয়াদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, রীতি-নীতি, আচার ও ঐতিহ্য। অধিকাংশই খ্রিষ্ট ধর্মালম্বী হলেও আদি ধর্ম প্রকৃতি পূজার বেশ কিছু বিশ্বাস এখনো পালন করেন তারা। খাসিয়া মেয়েদের ঐহিত্যগত পোষাককে বলে 'জাইন কেরসা'। এটি তাঁতে বোনো কাপড়ে তৈরি। খাসিয়াদের নিজস্ব তাঁত থাকলেও এপারে বাংলাদেশে এর চল নেই। ওপার ভারত থেকে আমদানী করা নিজস্ব কাপড়ই এখন ভরসা।


নাম বিস্মৃত এই খাসিয়া গাইড জানালেন, একই পাহাড়, অরণ্য ও টিলায় বংশ পরম্পরায় যুগ যুগ ধরে বসাবাস করে আসলে তাদের নেই জমির ওপর নিজস্ব মালিকানা। তাই বন বিভাগ ও চা বাগান মালিকসহ নানা ধরণের উচ্ছেদ আতংক প্রতিনিয়ত তাদের তাড়া করে ফেরে। খাস জমিতে স্থায়ী বন্দোবস্ত পাওয়ার বিষয়ে নানান সরকারি দফতরে বছরের পর বছর ধর্ণা দিয়েও কোনো ফল মেলেনি। বৃহত্তর সিলেটের সব খাসি গ্রামের এই চিত্র প্রায় একই।...

খাসি পুঞ্জিগুলোতে নেই শিক্ষা, চিকিৎসা, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্য সম্মত পয়ঃনিস্কাশন, বিদ্যুতসহ কোনো রকম মৌলিক মানবিক সুবিধা। মিশনারীদের গড়া দু-একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই শিশু-কিশোরদের পড়াশোনার একমাত্র পন্থা।...



শ্রীমঙ্গলের প্রত্যন্ত খাসিয়া আদিবাসী দুটি গ্রাম নাহার পুঞ্জি-১ ও নাহার পুঞ্জি-২-এর প্রায় চার হাজার প্রাকৃতিক গাছ কেটে ফেলতে শুরু করেছেন সংশ্লিষ্ট চা বাগানের মালিক। গাছগুলো রক্ষায় আদিবাসীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে এবং প্রশাসনের কাছে ধরনা দিয়েও কোনো সুফল পায়নি। আদিবাসীরা বলছেন, এসব গাছ না থাকলে খাসিয়াদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন পান জুম (পাহাড়ের ঢালে বিশেষভাবে পানচাষ) ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন গ্রাম থেকেই উচ্ছেদ হয়ে যেতে হবে তাদের। অন্যদিকে নাহার চা বাগান কর্তৃপক্ষ বলছেন, চা উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারি বাধ্যবাধকতা থাকায় গাছগুলো কেটে চা বাগান সম্প্রসারণ করা জরুরি। তাই উচ্চ আদালত, প্রশাসন ও বন বিভাগের অনুমতি নিয়েই তারা গাছ কাটতে শুরু করেছেন।



বৃক্ষ নিধনের এই মহোৎসব সত‌্যিই খুব বেদনার। শ্রীমঙ্গল সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে আসাম সীমান্তের খাসিয়া গ্রাম ঘুরে নির্বিচারে বন ধ্বংসের পাশাপাশি আদিবাসীদের বিপন্নতার চিত্র দেখা গেছে। প্রতিদিন পেশাদার করাতিরা বিস্তীর্ণ বনের গামারি, শিরীষ, কড়ই, জাম, বনাক, আলপিন, নেউর, মসকন, রঙ্গিসহ নানা ধরনের চিহ্নিত গাছের পাশাপাশি নাম না জানা অসংখ্য গাছ কেটে চলছেন। ...


এমনকি বন আইন উপেক্ষা করে ইচ্ছামতো তিন ফুট বেড়ের চেয়েও কম মাপের গাছও কাটা হচ্ছে। আবার বড় বড় গাছ কেটে ফেলার সময় ওই গাছের ডালপালার আঘাতে ধ্বংস হচ্ছে পানের জুমসহ বিভিন্ন চারা ও কিশোর বয়সী ছোট ছোট গাছ। পাহাড় ও টিলার এসব কাটা গাছ নয়টি পোষা হাতি দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে করাতকলে। গাছ টানার সময় আরেক দফা ক্ষতি হচ্ছে পানের জুমের।...

বিপন্ন এই আদিবাসীদের পক্ষে সাবেক গেরিলা নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ছাড়া অন্যকোনো দল ও সংগঠন এখনো দাঁড়ায়নি। ...

পরে ঢাকায় ফিরে খাসি জনপদের এই খবরটি করা হয় সংবাদপত্রে। কিছুদিন আগে টেলিফোনে খাসিয়া নেতা ডিবারমিন পংতাম এই লেখককে জানান, সেখানের সব গাছ কাটা হয়ে গেছে। তাদের খাসি পাহাড় এখন ন্যাড়া, সবুজ মরুভূমি; সেখানে কোনো বড় গাছ নেই!

---
ছবি (C): লেখক, উইকিপিডিয়া।