Sunday, April 15, 2012

ব্লগ ব্ল্যাক আউট অথবা একটি করপোরেট কচকচানি


বাঙালি মাত্রই তার পরম শ্রদ্ধার মানুষ --মা। এটি শ্বাশত বাংলার সংস্কৃতি। তাই বাংলাদেশ নামক প্রিয় দেশটি মাতৃভূমি, পিতৃভূমি নয়; এখানে মা আর দেশ মিশে যান পরম শ্রদ্ধায়, ভালবাসায়, প্রায় সমর্থক আবেগ নিয়ে।

বাজার অর্থনীতিতে নাকি সব কিছুই পন্য, এমনকি মাতৃভক্তি, দেশপ্রেমও। করপোরেট যুগে এটি সত্যি তো বটেই।

একটি বিজ্ঞাপনের কথা বলা যাক। গ্রামীণ ফোনের বিজ্ঞাপনে দেখা যাবে, শহুরে পড়ুয়া একজন ছেলের গ্রামে ফেলা আসা মা'র জন্য মনটা হু হু করে। ছেলে ট্রেন, লঞ্চ, নৌকা পাড়ি দিয়ে অনেকদিন পর বাড়ি ফিরছে। এদিকে প্রত্যন্ত গ্রামে হারিকেনের আলোয় মা বসে আছে, ছেলের দীর্ঘ প্রতীক্ষায়। পথে ছেলে মৌবাইল ফোনে মা'কে জানায়, সে নিরাপদে বাড়ি ফিরছে; মা আশ্বস্ত হন। ...অর্থাৎ 'কাছে থাকুন, গ্রামীণ ফোন'।

লক্ষ্যনীয়, মা ও সন্তানের চিরন্তন স্বার্থহীন বন্ধনকে উপজীব্য করে বানানো বিজ্ঞাপনটি খুবই ব্যবসা সফল। এর নির্মাণ শৈলীও ছিলো খুব ভালো। তবে দুর্জনেরা প্রশ্ন তুলেছেন, ওই বিজ্ঞাপনের ফাঁকি নিয়ে। তাদের প্রশ্ন, প্রত্যন্ত গ্রামে যে মা হারিকেনের আলোয় ছেলের প্রতীক্ষায়, তিনি মোবাইল ফোন চার্জ করেন কী ভাবে? খুবই গুরুতর প্রশ্ন। এই প্রশ্নটিই জানান দেয়, করপোরেট বিজ্ঞাপন বাণিজ্যে ফাঁকি থাকে, ফাঁকি থাকতে হয়।...

এই বৃত্তের বাইরে আরেক করপোরেট উপজীব্য হচ্ছে মহান মুক্তিযুদ্ধ। বিজ্ঞাপনে তো বটেই, চটুল সিনেমা কি প্যানপ্যানানি প্রেমের নাটকেও 'শালা রাজাকারের বাচ্চা!' জাতীয় দু-একটা বোলচাল না দিলে আজকাল আর চলে না। এতে ভোক্তা দর্শকের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটি যে একেবারে লাগসই ভাবে জাগ্রত হয়; ভোক্তা ফিট, তো বিজ্ঞাপন/সিনেমা/নাটক হিট।

করপোরেট কালচার জানে মা, মাটি, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ-- এইসব সসি আইটম 'পাবলিক খাবে ভালো'। তাই 'দাগ থেকে যদি ভালো কিছু শেখা যায়, তবে দাগই ভালো', কী বলেন?

তবে ব্যাপার হচ্ছে, এই সবই অতি ব্যবহার দুষ্ট, বেশ কেমন জোলো। তাই করপোরেট বাণিজ্যের নতুন কিছু চাই। একদম টাটকা কোনো বিষয় হলে ভালো, যেটি খুবই আলোচিত, একদম পাবলিকের মুখে মুখে ফিরছে, এমন বিষয় হলে খুবই ভালো হয়। এটি সরকার বিরোধী হলে আবার করপোরেট বাণিজ্যের আসল চিত্রটিও বেশ খানিকটা আড়ালে থাকে। ...এটিও তো পাবলিকের ভালোই খাবার কথা।

তাই করপোরেট অনলাইন সংবাদপত্র বিডিনিউজ টোয়েন্টফোর ডটকম- এর পোষা বিডি-ব্লগ ডাক দিয়ে বসে সাগর-রুণী হত্যার বিচারের দাবিতে ব্লগ ব্ল্যাক আউট বা ব্লগ বিরতির। তাদের ঘোষণা অনুযায়ী, এই হত্যার বিচার চেয়ে আজ, ১৫ এপ্রিল সকাল ১১টা থেকে বেলা ০১টা পর্যন্ত ব্লগ বিরোতি থাকার কথা। লিজেন্ট ব্লগার, ব্লগ আইনের পক্ষে সবচেয়ে সোচ্চার আইরিন সুলতানা'র 'সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড: খুনির বিচার চেয়ে প্রতিবাদের মঞ্চে সোচ্চার হল ব্লগাররা' শীর্ষক ব্লগটি সেখানে সকাল থেকে স্টিকি করে রাখা হয়। এটি সিটি জার্নালিজম-এর (ইহা হয় কী বস্তু?) বহিঃপ্রকাশও বটে; এতে সময় সময় আপডেট দেওয়া হয়। ব্লগ পোস্টে জুড়ে দেওয়া হয় 'আমরা ব্লগার' ব্যানারে ঢাবিতে প্রতিবাদকারীদের কয়েকটি ভিডিও চিত্রও।

আইরিন সুলতানা ব্লগ আইনের পক্ষে শুধু সোচ্চারই নন, তিনি বিডিনিউজের পোষা করপোরেট ব্লগটির হর্তাকর্তা, সঞ্চালক, নীতিনির্ধারকও বটে। ওই পোষা ব্লগের আরেক করপোরেট ব্লগার কৌশিক আহমেদকে দেখা যায়, কথিত এই ব্লগ ব্ল্যাক আউট নিয়ে ফেসবুক ও জি+এ ব্যাপক প্রচার চালাতে। ফেসবুকের লিংক পোস্টে সহব্লগার হাসিব মাহমুদ ছোট্ট একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, কৌশিক, ব্লগ আইন বানানোর বিষয়ে বিডি কতদূর এগোল?...মুহূর্তেই দেখি ওই মন্তব্যটি উধাও। করপোরেট কালচার ভিন্নমত সহ্য করে না, তার বিরুদ্ধ মতটিকে তো বটেই।



নাদান ব্লগাররা, সাকুল্যে কুমির শাবক ১২ জন

বলা ভালো, বিবিসি সংলাপের একটি অনুষ্ঠানে সরকারের উপদেষ্টা এইচটি ইমাম সাইবার আইনের পক্ষে মত প্রকাশ করলে বিডিনিউজের বর্তমান করপোরেট প্রধান, সিটিজেন জার্নালিজম নামক গজকচ্ছপের জন্মদাতা তৌফিক ইমরোজ খালিদী ব্লগ আইনের পক্ষে মত প্রকাশ করে (আইরিন সুলতানার পূর্বতন ও এইচটি ইমামের সে সময়ের মতটিকে জোর সমর্থন করে) মতামত দেন। বিডি-ব্লগের বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে এর পক্ষে আবারো সাফাই গেয়ে তৌফিক খালিদী বলেন, 'আইন বা বিধিবিধানের বিষয়টি তখনই সামনে আসে যখন স্বাধীনতার অপব্যবহার হয়। স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতা হয়। '

সে সময় এ নিয়ে প্রায় সব কটি বাংলা ব্লগে তুমুল নিন্দার ঝড় ওঠে। কারণ এটি মুক্ত মত প্রকাশের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। আইরিন-ইমাম-খালিদী'র দেশনাটি ব্লগ চেতনার পরিপন্থী তো বটেই। লক্ষ্যনীয় অ-ব্লগার ইমাম-খালেদী তাদের চিন্তার শৃঙ্খলতার পক্ষীয় দর্শনে একা নন, সেখানে আইরিন-কৌশিক ছাড়াও নাদান সিটি-ব্লগাররাও রয়েছেন।



ব্লগ আইনের ধ্বাজাধারী, তৌফিক খালিদী
তবে গ্রামীণ ফোনের বিজ্ঞাপনের মতো করপোরেট বিডি-ব্লগের ব্ল্যাক আউট হাঁকডাকেও গুরুতর ফাঁকি আছে। সেখানে আইরিনের পোস্টের ছবি ও ভিডিওতে দেখা যাবে, 'আমরা ব্লগার' নামে মাত্র ১০-১২ জন নাদানকে প্ল্যাকার্ড-ব্যানার নিয়ে কথিত ওই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে! ঘুরে ফিরে পুরো আন্দোলনে কুমির শাবক কিন্তু সাকুল্যে ওই ১০-১২ জনই!

এরচেয়ে বড় ফাঁকিতে বিডি-ব্লগ পড়েছে, সাংবাদিক দম্পতি হত্যাকাণ্ডের বিচার  চাওয়ার আন্দোলনের প্রহসন করতে গিয়ে। তাদের কথিত ওই ব্লগ ব্ল্যাক আউটে কোনো শীর্ষ বাংলা ব্লগ তো বটেই, এমনকি তাদের সহযোগি করপোরেট ব্লগ সামু-আলু-ও যোগ দেয়নি। এ নিয়ে এখনো কোনো পোস্টও ব্লগগুলোতে দেখা যায়নি; অর্থাৎ বিডি-আইরিন-ইমাম-খালেদী-কৌশিক ব্লগের চুলকানি শুধু 'আমরা আর মামুরা'তেই সীমাবদ্ধ! কেমন কী?

সাগর-রুণি হত্যাকাণ্ড নিয়ে এইসব নাটুকে মায়া কান্নার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। করপোরেট ছাগুদের জন্য রইলো এক রাশ তাজা কাঁঠাল পাতা। মুক্তচিন্তা ও স্বাধীন মত প্রকাশের বাংলা ব্লগ অজেয় হোক!