Tuesday, February 7, 2012

একটি ক্লান্ত পাখির কথা...



ফুন্দরি রাঙা ঝুরবো ফেগ/ তম্মা মইলে মুই ইদু এজ...চাকমা ছড়া...রাঙা লেজের ক্লান্ত পাখি/ তোমার মা মারা গেলে আমার কাছে এসো...
রক্তাক্ত এই আদিবাসী মেয়েটিকে চিনতে পারেন? গত বছর রামগড় সংঘর্ষের সময় পাহাড়ে অভিবাসিত বাঙালি সেটেলারদের সংঘবদ্ধ হামলায় কিশোরিটি গুরুতর আহত ও নিখোঁজ হয়।

বলা ভাল, খাগড়াছড়ির রামগড়ে জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে গত বছর ১৭ এপ্রিল পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষ হয়। এতে তিনজন বাঙালি সেটেলার নিহত হন। পুড়িয়ে দেওয়া হয় পাহাড়ি ও বাঙালি সেটেলারদের অনেক বাড়ি।

একজন মারমা পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থল অতিক্রম করে খাগড়িছড়ি যাওয়ার সময় মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় মেয়েটির এই ছবিটি তুলতে সক্ষম হন। রক্তাক্ত ও দিশেহারা কিশোরিটির ছবি পরে আন্তর্জালে বিভিন্ন ওয়েবসাইট, ফেসবুক গ্রুপ এবং ব্লগে ছড়িয়ে পরে।

ছবিটি প্রকাশের পর দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অনেকে তার খোঁজ জানতে চেয়ে চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করার আগ্রহও প্রকাশ করেন। এই লেখক নিজেও দেশ-বিদেশের এরকম কয়েকটি টেলিফোন পান। তাকে নিয়ে ফেসবুক ও ইংরেজী-বাংলা ব্লগে লেখা হয় অসংখ্য পোস্ট। আদিবাসী কয়েকটি সংগঠন এই ছবিটি দিয়ে ডিজিটাল পোস্টার বানিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে আহ্বান জানায়-- সেভ আওয়ার চিলড্রেন!

আন্তর্জালে ছবিটি দেখার পর পরই এই লেখক রামগড় ও খাগড়াছড়িতে তার নিজস্ব সূত্রে মেয়ের অনুসন্ধান জানতে চান। হঠাৎ একটি বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিতভাবে মেয়েটির সন্ধান জানান। তবে তখনো রামগড়-খাগড়াছড়ির পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসেনি বলে আদিবাসী সূত্রটি নাম প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করে।

এরপর ওই সংবাদ সূত্রের মাধ্যমে সরেজমিনে খোঁজ-খবর চালানো হয়। রামগড় সহিংসতার পর তৈরি করা হয় একটি বিশেষ প্রতিবেদন। সে সময় দৈনিক কালের কণ্ঠ প্রথম পাতায় বক্স-আইটেম করে গুরুত্বসহ সংবাদটি প্রকাশ করে। এরই মাধ্যমে সহিংসতার এক সপ্তাহ পর দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে মেয়ের সন্ধান পাওয়ার খবর।

সে সময় ওই খবরে জানানো হয়, রামগড় সহিংসতায় নিখোঁজ আদিবাসী কিশোরী মেয়েটির নাম মি প্রু মারমা (১৩)। গুরুতর আহত অবস্থায় মি প্রুকে মাটিরাঙা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এক স্কুলশিক্ষক অবশেষে তাকে খুঁজে পান। পিতৃহীন, হতদরিদ্র পরিবারের সদস্য প্রুর মায়ের নাম আম্রা মারমা (৪৫)। বাড়ি মাটিরাঙা থানার গুইমারার বড়তলী পাড়ায়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রামগড় সহিংসতার সময় মেয়েটির মা আম্রা মারমাও গুরুতর আহত হন। পরিস্থিতি শান্ত হলে তিনি সন্তানকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের আদিবাসী একজন শিক্ষকের শরণাপন্ন হন।

পরে ওই শিক্ষক অনুসন্ধান চালিয়ে গত ২৪ এপ্রিল মাটিরাঙা হাসপাতালে মেয়েটিকে খুঁজে পান। চিকিৎসকরা তাঁকে জানান, তিন দিন অচেতন থাকার পর মেয়েটির জ্ঞান ফিরে আসে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় তার শরীর খুব দুর্বল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই শিক্ষক সে সময় এই লেখককে বলেন, এখন সহৃদয় ব্যক্তিদের সহায়তা নিয়ে আমার বাসাতেই মি প্রুর চিকিৎসা চলছে। ওর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ক্ষত রয়েছে। চিকিৎসকরা ওকে আশঙ্কামুক্ত ঘোষণা করলেও ক্ষত শুকাতে আরো সময় লাগবে বলে তিনি জানান।

মি প্রুর মা আম্রা মারমা ভাঙা বাংলায় এই লেখককে বলেন, মারমা আদিবাসী উৎসব সাংগ্রাইং উপলক্ষে আয়োজিত মেলা দেখার জন্য আমরা কয়েকজন আত্মীয়সহ ১৫ এপ্রিল (২০১১) মানিকছড়ি গিয়েছিলাম। সেখান থেকে বাসে করে গুইমারায় নিজেদের গ্রামে ফেরার পথে জালিয়াপাড়ায় একদল লোক বাস থেকে আমাদের নামিয়ে লাঠি দিয়ে ব্যাপক মারধর করে। আমি কোনো রকমে দৌড়ে পালাতে পারলেও মি প্রুকে আর খুঁজে পাই নি। এরপর জুম্ম (পাহাড়ি) স্কুলশিক্ষক ওকে খুঁজে বের করেন।

জুমচাষি আম্রা মারমা কান্না ভেজা গলায় বলেন, আমি এখন অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে যাব কোথায়? খাব কী?

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মি প্রু এরপর সুস্থ্য হয়ে ওঠে। তার চিকিৎসায় এগিয়ে আসে সহৃদয় ব্যক্তিবর্গ। রাঙামাটির মোনঘর শিশু সদন মেয়েটির শিক্ষা ও পুনর্বাসনে আগ্রহ প্রকাশ করে। খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার টেলিফোনে এই লেখকের সঙ্গে আলাপ করে মেয়েটির সার্বিক খোঁজ-খবর নেন।

দেহের ক্ষত শুকালেও মাত্র ১৩ বছর বয়সেই মেয়েটি যে বিভিষিকার মুখোমুখি হয়েছে, তাতে তার মনের ক্ষত আদৌ কখনো শুকাবে কী না, সে খবর অবশ্য লেখক, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মি, পুলিশ, প্রশাসন কেউই-- রাখেননি!...

__
ছবি: মি প্রু, সংগৃহিত।