Saturday, January 7, 2012

নিধনযজ্ঞে বৃক্ষশূন্য খাসিয়া পাহাড়


বিপ্লব রহমান, শ্রীমঙ্গল থেকে ফিরে
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল। অন্য অনেক বিষয়ের পাশাপাশি বৃক্ষশোভিত পাহাড়শ্রেণী এর বড় একটা গর্বের বিষয় ছিল। কিন্তু পাহাড়গুলো আজ সৌন্দর্যহীন। চা বাগান কর্তৃপক্ষের হাতে কাটা পড়েছে এখানকার প্রায় সাড়ে তিন হাজার গাছ। বেপরোয়া গাছ কাটার ফলে শ্রীমঙ্গলের খাসিয়া পাহাড় আজ বৃক্ষশূন্য। বিপন্ন হয়ে পড়েছে ভাষাগত সংখ্যালঘু খাসিয়া জনজাতির দুটি গ্রাম। হুমকির মুখে পড়েছে খাসিয়া জনপদের জীবন-জীবিকা। মানববন্ধন, প্রশাসনে ধরনা-কোনো কিছুতেই ফল হয়নি। প্রতিটি মুহূর্ত উচ্ছেদ আতঙ্ক তাদের তাড়া করে ফিরছে।



খাসিয়ারা বলছেন, ব্যাপক হারে গাছ কাটার ফলে তাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন পান জুম (পাহাড়ের ঢালে বিশেষভাবে পান চাষ) হুমকির মুখে পড়েছে। বৃক্ষশূন্যতায় লাখ লাখ টাকার পান ধ্বংস হয়ে গেছে। জানা গেছে, খাসিয়া পাহাড়ে বন আইন উপেক্ষা করে যথেচ্ছভাবে তিন ফুট বেড়ের চেয়েও কম মাপের গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। আবার বড় বড় গাছগুলো কেটে ফেলার সময় ডালপালার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পানজুম। কেটে ফেলা গাছ হাতি দিয়ে টেনে নেওয়ার কারণে অজ্ঞাত ভাইরাসে মড়ক দেখা দিয়েছে পানচাষে। এই ক্ষতির মুখে খাসিয়ারা এখন দিশেহারা। এ অবস্থা চলতে থাকলে শিগগির তাদের দেশান্তর হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
অন্যদিকে চা বাগান কর্তৃপক্ষ বলছে, উৎপাদন বাড়াতে সরকারি বাধ্যবাধকতা থাকায় পাহাড়ের গাছ কেটে চা বাগানের সম্প্রসারণ জরুরি। তাই তারা উচ্চ আদালত, প্রশাসন ও বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে বৈধভাবেই পাহাড়ের গাছগুলো কেটে ফেলেছেন। পরিকল্পনা রয়েছে খাসিয়াদের চা চাষের কাজে নিয়োগ করে জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার। তবে এ নিয়ে তারা খাসিয়াদের সঙ্গে কোনো আলোচনাই করেনি।
সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে শ্রীমঙ্গল সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে ভারতের আসাম সীমান্তের কাছে ঘটনাস্থল ঘুরে নির্বিচারে গাছ কাটার পাশাপাশি খাসিয়া জনপদের বিপন্নতার চিত্র দেখা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১০ সালের ডিসেম্বরে গাছগুলো চিহ্নিত করার পর করাতিরা খাসিয়া পাহাড়ে গাছ কাটা শুরু করেন। এ নিয়ে গত ৮ জানুয়ারি কালের কণ্ঠে 'খাসিয়া গ্রামে গাছ কাটার মহোৎসব' শিরোনামে সরেজমিন প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। এত কিছুর পরও চা বাগান কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি।
দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত বনের নানা বয়সী গামারি, শিরিষ, কড়ই, জাম, বনাক, আলপিন, নেউর, মসকন, রঙ্গিসহ নাম না জানা অসংখ্য গাছ কেটে ফেলায় খাসিয়া পাহাড় ন্যাড়া পাহাড়ে পরিণত হয়েছে। যত্রতত্র মাথা উঁচিয়ে আছে কেটে ফেলা গাছের গুঁড়ি। আবার বন আইন উপেক্ষা করে কম বয়সী নানা জাতের গাছ কেটে ফেলা হলেও সেগুলো পরে বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়নি। আরো প্রায় হাজারখানেক গাছ করাতিদের চিহ্ন বুকে নিয়ে এখন কেটে ফেলার অপেক্ষায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে গাছ কাটার বিষয়ে শ্রীমঙ্গল থানা পুলিশ গত ৪ জানুয়ারি প্রশাসনে একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে বন আইন উপেক্ষা করে যথেচ্ছভাবে কম বয়সী গাছ কেটে ফেলা এবং খাসিয়াদের পানজুম ক্ষতিগ্রস্ত করার কথা বলা হয়েছে।
খাসিয়ারা জানান, তারা কোনোরকম সার বা কীটনাশক ছাড়াই প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে পানজুম করেন বলে সমতলের চেয়ে খাসিয়া পানের কদর বেশি। দেশীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও এই পান রপ্তানি হয়। এক কুড়ি (প্রায় তিন হাজার) খাসিয়া পানের দাম এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। পাইকাররা গ্রাম ঘুরে এসব পান সংগ্রহ করে বাজারজাত করেন।
খাসিয়া গ্রাম নাহারপঞ্জি-১-এর মন্ত্রী (গ্রামপ্রধান) নবার লাপাসাম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমরা জরিপ করে দেখেছি, করাতিরা ছোট-বড় মিলিয়ে মোট আট হাজার ২০০ গাছ কেটে ফেলেছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে আবেদন-নিবেদন করেও ফল পাইনি। ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা, সরকারি-বেসরকারি কোনো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনাও করেনি। অথচ নাহারপুঞ্জি-১ ও ২-এর ৬৮ পরিবার খাসিয়ার লাখ লাখ টাকার পানজুম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।'
একই গ্রামের ডিবারমিন পতাম বলেন, 'আমরা বহু বছর ধরে এই পাহাড়ে বসবাস এবং জমি-ভোগদখল করেও দখলি স্বত্ব পাচ্ছি না। প্রতি মুহূর্তে উচ্ছেদ আতঙ্ক আমাদের তাড়া করছে। সরকার কখনোই আদিবাসী খাসিয়াদের সুবিধা-অসুবিধা দেখে না।' তিনি বলেন, 'আমরা এ দেশকে ভালোবেসে এখানেই চাষবাস করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই। আমরা চাই, আমাদেরকে জমির দখলিস্বত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হোক।'
গৃহবধূ বেটসেবা আমসি বলেন, 'আমরা এই অমানবিক অনিশ্চিত জীবনের অবসান চাই। যে যেখানে আছি, সেভাবেই শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে চাই। জীবন-জীবিকার ওপর বারবার আঘাত এলে পরিবার-পরিজন নিয়ে আমরা কোথায় যাব?' আইটি টংপার বলেন, 'আমরা এই পাহাড়েই নাগরিক মর্যাদা নিয়ে নিজস্ব পরিবেশে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই।'
নাহারপঞ্জি-২-এর মন্ত্রী (গ্রামপ্রধান) ফ্রেন্ডলি দুরং কালের কণ্ঠকে জানান, চাবাগান মালিকের অনুমতি নিয়ে ১৯৮০ সালে তারা ওই দুটি গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকে তারা এখানে পানজুম করে আসছেন। চাষবাসের জন্য বাগান মালিককে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ৫০ হাজার থেকে শুরু করে এক লাখ টাকা চাঁদাও দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'কিন্তু এখন আমাদের মতামত উপেক্ষা করে অমানবিকভাবে বন ও পানজুম ধ্বংস করে গ্রামগুলো উচ্ছেদের প্রক্রিয়া চলছে। আমরা কোনোভাবেই এই উচ্ছেদ মেনে নেব না।'
স্থানীয় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ঝর্ণা সুচিয়ান বলেন, 'আমাদের এখানে চিকিৎসা, সুপেয় পানীয়জলের বড়ই অভাব। দুটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া ছেলেমেয়েদের শিক্ষার অন্য কোনো সুযোগ নেই। নেই বিদ্যুৎ বা অন্যান্য নাগরিক সুবিধা। এর পরও আমরা বেশি কিছু চাইছি না। শুধু চাই খেয়েপরে নিজের মতো করে বাঁচতে। কিন্তু সেই বাঁচার অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।'
লোকমান পৎলং বলেন, 'সরকার কখনোই খাসিয়া আদিবাসীদের দিকে তাকায়নি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারও আমাদের জনজীবন ধ্বংস করে খাসিয়া পাহাড়ে ইকো-পার্ক করতে চেয়েছিল। তাই আমাদের সুবিধা-অসুবিধা চা বাগান মালিক কর্তৃপক্ষকেই দেখতে হবে।'
নাহার চা বাগানের ব্যবস্থাপক পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য কালের কণ্ঠকে জানান, ২০০৬ সালে প্রায় ৮৬৫ একর আয়তনবিশিষ্ট চা বাগানটির ইজারা নিয়েছেন ফরিদা সারোয়ার। বছরে আড়াই শতাংশ হারে চা উৎপাদন বৃদ্ধির সরকারি বাধ্যবাধকতা থাকায় তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বাগান সম্প্রসারণের। এজন্য তাদের ওই সাড়ে চার হাজার গাছ কেটে ফেলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। বন বিভাগের অনুমতিক্রমে বৈধভাবেই গাছগুলো কাটা হয়েছে। তিনি বলেন, 'বর্তমান চা বাগান কর্তৃপক্ষ খাসিয়াদের প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক। এ জন্য চাষবাসের জন্য তাদের কাছ থেকে এ পর্যন্ত কোনো চাঁদা নেওয়া হয়নি। উপরন্তু গাছ ও পানজুমের ক্ষতিপূরণ বাবদ তাদের ৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।'
পীযূষ আরো বলেন, 'আমরা চাই খাসিয়ারাও পাহাড়ে বসবাস করুক। কিন্তু সমঝোতার ভিত্তিতে প্রতিবছর তাদের ৫০ থেকে ১০০ একর জমি চা চাষের জন্য ছেড়ে দিতে হবে। এতে খাসিয়া জনজীবন ব্যাহত হলে প্রয়োজনে আমরা তাদেরকে চা বাগান শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দিতে রাজি আছি।'
অন্যদিকে খাসিয়া নেতা ডিবারমিন পতাম বলেন, 'প্রতি বছর ৫০ থেকে ১০০ একর পানজুমের জমি চা চাষের জন্য ছেড়ে দিতে হলে আমাদেরকে একপর্যায়ে দেশান্তর হতে হবে। এ ছাড়া আমরা পানজুম ছাড়া অন্য কাজ জানি না। চা শ্রমিক হিসেবে ব্যারাক জীবনেও অভ্যস্ত নই। এটা স্পষ্টতই আদিবাসী জীবন-জীবিকা, ঐতিহ্য, রীতিনীতি ও সংস্কৃতির ওপর চরম আঘাত।'

__
News Link: http://www.kalerkantho.com/print_edition/?view=details&type=gold&data=Laptop&pub_no=754&cat_id=1&menu_id=13&news_type_id=1&news_id=218668&archiev=yes&arch_date=07-01-2012#.VILPBSfIYQt