Saturday, February 21, 2009

শিরোনামহীন


চাকরিটা আমি ছেড়ে দিয়েছি, বেলা শুনছো?...অবশেষে আরটিভির সামান্য বেতনের উঁচু পদের গ্লানিময় বস্তিবাস-জীবনের অবসান ঘটেছে। সেদিন সুন্দর এক সকালে অফিসে ঢুঁকে আমার ডেস্কের ডেল-কম্পিউটারে দ্রুত টাইপ করে ফেললাম পদত্যাগপত্র।
'বরাবর, চেয়ারম্যান, আরটিভি। বিষয়: পদত্যাগপত্র। জনাব, বিনীত নিবেনদন এই যে, ব্যক্তিগত কারণে আমি বর্তমান কর্মস্থল থেকে পদত্যাগ করছি। একই সঙ্গে আবেদন জানাচ্ছি, আজ থেকে আমার পদত্যাগপত্র কার্যকর করার জন্য। পেশাগত জীবনে আমি সব সময়ই আমার সহকর্মীদের কাছ থেকে সব ধরণের সহযোগিতা পেয়েছি, এ জন্য আপনার মাধ্যমে তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনার সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ। নিবেদক--ইত্যাদি।

সকালে অফিস বেশ ফাঁকা থাকে। তবু যে আট-দশজন সহকর্মি তখন সকালের সংবাদ তৈরিতে ব্যস্ত, তাদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে আমি ব্যাগ গুছিয়ে উঠে পড়ি।

যাবার বেলায় কয়েকজনের কৌতুহলী প্রশ্নের ছোট্ট করে জবাব দেই: এমনি, বিশেষ কোনো কারণে নয়; এখানের পরিবেশটা আমার পছন্দ হচ্ছে না। নাদিম কাদিরের মতো বড় সাংবাদিকই যখন এখানে টিকতে পারেননি, তখন আমি আর কোন ছাড়? নাহ্, আপাতত কোথাও যোগ দিচ্ছি না। কয়েকদিন বিশ্রাম নেবো, বই মেলায় আড্ডাবাজী করবো। তারপর না হয় চাকরি খোঁজা যাবে। ...আমি কাজ জানি, তাই চাকরি নিয়ে খুব ভাবি না।...

বিশাল ভবনের লিফট টপকে (হায়, লিফটম্যান!) কারওয়ানবাজারের ব্যস্ত অফিসপাড়ার পরিবেশে আমি খানিকটা হতচকিত হয়ে পড়ি। এখন আমি কর্মহীন, বেকার! টানা ১৭ বছরের পেশাগত জীবনে এই প্রথম। এখন আমার কোনো গন্তব্য নেই, কাজ নেই, লেখার জায়গাও নেই।....তবে কথা কি না, বরাবরই নিজের কাছে আমি খুব পরিস্কার। প্রত্যেক মানুষেরই তো আত্নমর্যাদা বলে একটা বস্তু থাকা উচিৎ, তা-ই না? বিশেষ করে তার যদি আবার নকশাল-ব্লাড হয়!

তবু কি আমি সামনের অনিশ্চিত ভবিষ্যত ভেবে বিপন্নতাবোধ করি? আমি ফোন করে বসি, আমার করপোরেট বন্ধুটিকে, ধরা যাক, সেই বেলা বোস।...

সে তখন অফিস অ্যাকাউন্ট মেলাতে খুব ব্যস্ত। আমি জানি, তার ভেতরের গহিনের অস্থিরতাটুকুও। বিগত প্রেম মুছে ফেলার জন্য তাকে কতখানিই না মানসিক পীড়ন সহ্য করতে হচ্ছে! এমন কি সে এ জন্য আমার শরণাপন্ন হতেও দ্বিধা করেনি!

তো সেই বেলা বোস বলে, অ্যাঁ, তুমি এই সকালে এ সব কি বলছো! দুষ্টুমী করছো না তো? শোনো, এখন আমার অফিসে এসো না প্লিজ। আমার সামনে একগাঁদা ক্লায়েন্ট বসে আছে, অ্যাকাউন্ট নিয়ে খুব বিজি; আমি একটু ফ্রি হয়ে তোমাকে ফোন করছি, কেমন?

আমি জানি, কেউ কথা রাখেনি, কেউ কথা রাখে না। ...সুনীলের সেই '৩৩ বছর' কেটে যাওয়ার অর্থও জেনেছি ফেলে আসা প্রথম যৌবনেই। তাই নিশ্চিতভাবেই বেলা যখন আর ফোন করে না, তখন আমি একেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেই।

বাসায় ফিরে, চুপচাপ নিজের ঘরে ঢুকে ঘর অন্ধকার করে শুয়ে পড়ি। অবসরপ্রাপ্ত রেডিও অফিসের আপার-ক্লার্ক বৃদ্ধ মা কি ভাবে যেন কোনো বিপদ সংকেত টের পান। দরজার পর্দা সামান্য সরিয়ে সভয়ে জানতে চান, বাবু, তোর কি শরীর খারাপ? আজ না তোর নাইট-ডিউটি? ...

আমাকে বিরক্ত করো না মা। একটু একলা থাকতে দাও....আমার মন ভালো না।...

আহ, একুশের মেলাএকুশের বইমেলায় পরদিন একটু তাড়াতাড়ি যাই। বেকার হলেও সাংবাদিক তো, নাকি? তাই অনেক বছর পর অনিয়মিতভাবে নিয়মিত মেলায় এসে নানান পরিবর্তন সহজেই চোখে পড়ে।

পুরনো বন্ধু, আমার প্রথম বই 'রিপোর্টারের ডায়েরি, পাহাড়ের পথে পথে'র প্রকাশক, ‌'পাঠসূত্রের' রাজিব নূরকে ভীড়ের মধ্য থেকে টেনে আলাদা করি। শিববাড়ি মন্দিরের পাশে কফি খেতে খেতে ওকে বলি চাকরি ছেড়ে দেয়ার ইতিবৃত্ত। রাজিব সব কিছু চুপচাপ শোনে, সে-ও এক সময়ের স্টার-রিপোর্টার; মিডিয়া জগতের নোংরামি কি তাকেও স্পর্শ করে নি?

পরে সে বলে, খুব ভালো করেছেন। এখন কয়েকদিন চুপচাপ বিশ্রাম নেন, ভালো করে ঘুম দেন। টাকা-পয়সা লাগলে আমি তো আছিই। একটু ভেবে দেখি, চাকরির জন্য আপনাকে কোথায় কোথায় নক করতে হবে। জানেনই তো এখন মিডিয়ার-বাজার খুব খারাপ!...

এরই মধ্যে 'শুদ্ধস্বরে' গিয়ে যথারীতি একবার ঢুঁ দেই। টুটুল ভাই এসেছেন? সচল প্রকাশ বের হয়েছে? শ্যাজাদি, পিয়াল ভাইয়ের বইটা আসেনি? নাহ্, যে বইটা নিয়ে সবচেয়ে অনিশ্চয়তা ছিলো, লীলেন ভাইয়ের কবিতার সেই বইটাই সবার আগে প্রকাশ হয়েছে!

হঠাৎ সেখানে ছড়াকার সহব্লগার লুৎফর রহমান রিটনভাই আমাকে আবিস্কার করে ফেলেন: তোমার বাবা কেমন আছেন? তোমার বইটা কি বের হয়েছে? ...

আমি টুটুল ভাইয়ের জন্য আনা বইটাই রিটনভাইকে লিখে দেই। উনি বলেন, বাহ, খুব সুন্দর প্রচ্ছদ! অরূপের করা তো, তাই!... শোনো, তুমি কাল তথ্যকেন্দ্রের সামনে বিকাল ৪টার সময় এসো। তোমার একটা লাইভ ইন্টারভিউ নেবো।....

নাবালকেরা...আমার বইটির একজায়গায় পাহাড়ের কথিত পূর্নস্বায়ত্বশাসনপন্থী, শান্তিচুক্তি বিরোধী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) কে 'নাবালক বিপ্লবীদের গ্রুপ' বলা হয়েছে।

তো ইউপিডিএফ নেত্রি সমারী চাকমার বান্ধবী, হেনরি কিভাবে যেন আমার ফোন নাম্বার খুঁজে বের করে, মেলায় এসে হাজির। বিপ্লব দা, আমি তো সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগের ওপর 'সালমা সোবহান ফেলো' (ইহা হয় কোন অশ্বডিম্ব?) করেছি; এখন খাগড়াছড়ি থেকে প্রথম আলোতে টুকটাক সাংবাদিকতা করছি, কিন্তু আমি চাচ্ছি, ঢাকায় এসে সাংবাদিকতা করতে...আমার জন্য একটু ব্যবস্থা করুন না প্লিজ। এই নিন আমার সিভি। আপনি তো খুব নামকরা সাংবাদিক, এখন দেখি, আমার জন্য কি করতে পারেন!

আমি সিভিটা ব্যাগে ঢুঁকাই। চাকমা ভাষা পরদর্শী, ববকাট চুলের কৃষকায় হেনরিয়েটা সুখকে আমার অসুখি করতে ইচ্ছে করে না; তবু ওকে সত্যি কথা বলি: হেনরি, আমার নিজেরই চাকরি নেই। কাল আমি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। তবে শিগগিরই আমার কাজ জুটে যাবে। আর আপনার জন্যও আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করবো।

দুবছরের সাংবাদিকতায় অভিজ্ঞ হেনরি কিছুতেই আমার কথা বিশ্বাস করে না: ও মা, এ কি কথা বিপ্লব দা! আমার মনে হয়, আপনি মিথ্যে বলছেন। নিশ্চয়ই আপনার চাকরি চলে গেছে! কেউ আবার চাকরি ছাড়ে না কি!

এরই মধ্যে ইউপিডিএফ নেত্রি সমারী চাকমা এসে হাজির। আমার এক সময়ের বেস্টফ্রেন্ড, সেই আগের মতোই উজ্জ্বল এবং মস্তিস্ক শুন্য।

বিপ্লব দা, আমরা এখন যাই। চলে আয় হেনরি, আমরা তো আবার নাবালক বিপ্লবীর দল!

খুনে গপ্পোবাজলেখক, সাংবাদিক আহসান কবির একটি বই লিখেছেন, বিদেশি কাহিনী আবলম্বনে থ্রিলার টাইপের বই। এটিও 'পাঠসূত্র' প্রকাশনা। বইটির নাম-খুনে গল্পরাজ, আমি দুষ্টুমী করে একটু ঘুরিয়ে বলি, খুনে গপ্পোবাজ। আর সামান্য হিংসে হলেও স্বীকার করতে দোষ নেই , কবির ভাইয়ের বইটির কাটতি বেশ ভালো।...

কবির ভাই সাবেক নৌ-বাহিনীর কর্মকর্তা, পরে চাকরিচ্যুত ও ভাগ্যচক্রে সাংবাদিক। পাহাড়ে অনেক বছর সেনা নির্যাতন প্রত্যক্ষ করায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের (তিনি সাবেক হলেও) সম্পর্কে আমার ভেতর একটি অন্য রকম প্রতিক্রিয়া কাজ করে। তবে কবির ভাইয়ের সঙ্গে আমার এক ধরণের সখ্য আছে। ...নৌ-বাহিনীর সাবেক তো, তাই আমি তাকে দুষ্টুমি করে চাকমা ভাষায় বলি, পাইন্ন্যা সাপ। সংক্ষেপে, পাইন্না কবির!

তো, ওই সন্ধ্যায় পাইন্নার সঙ্গে মদ গিলে বেহেড হতে হতে চাকরি-বাকরি ইত্যাদির শুলক সন্ধান করি। তাকে আমি কিছুতেই বোঝাতে পারি না, আমার সাংবাদিকতার মাস্টার, রাঙামাটির সুনীল দা, এখনো তার দরজায় লিখে রেখেছেন,
আপোষ করতে করতে মানুষ ক্রমেই ছোট হয়ে যায়!
আমি পারি না, অনেক কিছুই পারি না হে...
___
ছবি: পটেটো ইটার্স, ভ্যানগগ, আন্তর্জাল।