Tuesday, May 6, 2008

গুডবাই শফিক রেহমান...


কাল রাতে দৈনিক যায় যায় দিন থেকে পদত্যাগ করলেন সম্পাদক শফিক রেহমান। বলতে দ্বিধা নেই, একই সঙ্গে পেশাদার সাংবাদিকরা আপাতঃ হাফ ছেড়ে বাঁচলেন এক মিডিয়া-ড্রাগনের খপ্পর থেকে।

এ নিয়ে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া শফিক রেহমান ইনিয়ে বিনিয়ে আজকের যাযাদিতে অনেক নাকি কান্না কেঁদেছেন। তার আপোষহীন চরিত্রের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে স্টোর রুম ঘেঁটে তুলে এনেছেন ৯০ দশকের সাপ্তাহিক যাযাদির কয়েকটি আলোচিত প্রচ্ছদচিত্র ।

তবে ফিউজ লাল গোলাপ-শফিক রেহমান তার ব্যাখ্যায় যে কথা বলেননি, তা সংক্ষেপে এ রকম:
১৯৯০ এর জে. এরশাদ বিরোধী স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় সাপ্তাহিক যাযাদি আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা পায়। ধারালো বিশ্লেষনী, কলাম ও আপোষহীন নীতির কারণেই তখন তিন টাকা দামের নিউজপ্রিন্ট মলাটের ১০ পয়েন্টে ছাপা হরফের সাপ্তাহিকটি এ দেশের পুরো মিডিয়া জগতের চেহারাই পাল্টে দেয়। এর আগে কোনো সাপ্তাহিকই এতো পাঠকপ্রিয়তা পায়নি। পত্রিকাটি দুদুবার সরকারের রোষানলে পড়ে বন্ধ হয়ে যায়। শফিক রেহমানকে সে সময় দেশ ছাড়াও করা হয়।

এরশাদ পতনের পর ১৯৯২ সালে যাযাদি আবার যাত্রা করে। পরে ১৯৯৮ সালে পুরনো পল্টনের একটি অফিস যাযাদি ট্যাবলয়েড দৈনিক হিসেবে একমাস প্রকাশ হয়েই আবার বন্ধ হয়ে যায়।

পেশাদার সাংবাদিকের অভাব, তীব্র আওয়ামী বিরোধীতা, পরিকল্পনার অভাবই ছিলো এর কারণ। আর এর নাটের গুরু ছিলেন সাবেক ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অঘোষিত প্রেস সচিব এবং শফিক রেহমানের মিডিয়া পরামর্শক নূরুল ইসলাম ছোটন, ওরফে নূরুল ইসলাম ভূঁইয়া।


পরে আবারো যাযাদি সাপ্তাহিক হিসেবে প্রকাশ হতে থাকে। তবে ততদিনে অন্যান্য প্রিন্ট মিডিয়ার উত্থান ও যাযাদির অন্ধ বিএনপি-নীতি অনুসরণ করার ফলে সাপ্তাহিকটিও দ্রুত বাজার হারায়।

*
২০০১ সালে বিএনপি-জামাত জোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আবারও মিডিয়া ড্রাগন হিসেবে আবির্ভূত হন শফিক রেহমান। একই সঙ্গে আবির্ভূত হন খালেদা জিয়ার অঘোষিত প্রেস সচিব এবং শফিক রেহমানের মিডিয়া পরামর্শক নূরুল ইসলাম ছোটন। সরকারি বা রাজনৈতিক পদে না থাকলেও অতিক্ষমতাধর ছোটন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিয়মিত অফিস করতেন।
হাওয়া ভবনের যোগসাজসে তেজগাঁর খাস জমি বন্দোবস্ত নিয়ে, সরকারি রাস্তার নাম পাল্টে 'লাভ রোড' রেখে বসুন্ধরা গ্রুপের টাকা ও ব্যাংক ঋণ নিয়ে আলিশান অফিস তৈরির কাজ চলে। আবার কয়েক কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে যাযাদি দৈনিক হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে -- এমন সাজ সাজ রব পড়ে মিডিয়া জগতে। বছর দেড়েক ধরে শুধু অফিস নির্মাণ, অত্যাধুনিক প্রেস এবং নিজস্ব পাওয়ার স্টেশন বসানো, বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়া থেকে বাছাই করে সংবাদ কর্মী নিয়োগের কাজও চলে। অতঃপর ২০০৬ সালে প্রকাশ হয় একটি সোনার পাথর বাটি।

বিপুল পরিমান অর্থ ব্যয় এবং বাঘা বাঘা সাংবাদিক নিয়োগ করেও দৈনিক যাযাদি অপেশাদার সুলভ নীতি, তীব্র আওয়ামী বিরোধীতা, অদ্ভুদ সব বানান রীতি, ইংরেজী শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার -- ইত্যাদির কারণে গোলাপ-শফিক রেহমানের পত্রিকাটি মোটেই পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করে না। উপরন্তু প্রতিদ্বন্দ্বি দৈনিকের সংখ্যাও বাড়তে থাকে।

বিএনপি সরকারের শেষ দিকে প্রকাশনার মাত্র চার মাসের মাথায় ২০০৬ সালের অক্টোবরে বসুন্ধরা গ্রুপের চাপে শফিক রেহমান গার্মেন্টস শ্রমিক ছাঁটাই করার কায়দায় একসঙ্গে ছাঁটাই করেন শতাধিক সংবাদকর্মী। কোনো রকম আগাম নোটিশ এবং দেনা-পাওনা পরিশোধ ছাড়াই ঈদের ছুটির পর এই ছাঁটাই কার্যকর করা হয়। এক সকালে সাংবাদিকরা যাযাদির অফিসে ঢুকতে গিয়ে দেখেন অফিস গেট বন্ধ; প্রধান ফটকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ছাঁটাই নোটিশ!

*
ক্ষুব্ধ সাংবাদিকরা খবর পান, শফিক রেহমান পত্রিকাটি বন্ধ করে তাদের বকেয়া টাকা পরিশোধ করা ছাড়াই লন্ডন পাড়ি জমাচ্ছেন! তারা ধাওয়া করেন বিমানবন্দরে।
বিমানবন্দর থানা পুলিশ, পরিচালক (জিয়া), প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং এয়ারলাইন্সগুলোর সহায়তায় সে রাতে চারটি দেশের ভিসা-টিকিট থাকা সত্বেও শফিক রেহমান দেশ ত্যাগ করতে পারেননি। ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিকরা এরই মধ্যে তার দেশত্যাগের ওপর আদালতের একটি নিষেধাজ্ঞাও পান।
শফিক রেহমান তার সাংবাদিক ইমেজটিকে ধরে রাখতে যাযাদির প্রকাশনা অব্যহত রাখতে বাধ্য হন।
এরমধ্যে ১/১১ এর পর পাল্টে যায় দাবার ঘুঁটি। গা ঢাকা দেন তার নাটের গুরু নূরুল ইসলাম ছোটন, ওরফে নূরুল ইসলাম ভূঁইয়া। খালেদা, তারেক, কোকো, মামুনসহ কারাবন্দী হয় শফিক রেহমানের ক্ষমতার উৎস।

পরে এইচআরসি গ্রুপ যাযাদির মালিকানা প্রায় পুরোটাই কিনে নেয়। তারা অল্প সংখ্যক সংবাদকর্মী দিয়ে কম সার্কূলেশনে পত্রিকাটির প্রকাশনা অব্যহত রাখে। তাদের অন্যতম শর্ত ছিলো যাযাদি থেকে শফিক রেহমানের অপসারণ। তাই মিডিয়া জগতে তার পদত্যাগ মোটেই কোনো চমক নয়; বরং এটি ছিলো অনিবার্য। তার পদত্যাগের গুঞ্জনটিও গত কয়েকদিন ধরে আলোচিত হচ্ছিলো।

এইসব মিডিয়া ড্রাগন বিভিন্ন সময় একেকজন শেঠজী জোগাড় করে আবারো হয়তো মাঠে নামবেন। আর তথ্য-সাংবাদিকতার কঠিন পেশাটিকে ভালবেসে মাঝ খান থেকে বেতন-ভাতার দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় পড়বেন পেশাগত সাংবাদিকরা। এই চিত্র যেনো আর পাল্টায় না! এই গল্পের যেনো কোনো শেষ নেই!...
*
পুনশ্চ: ১/১১ এর পরে দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের জের ধরে মিডিয়ায় এখন বড়ই দুর্দিন। দু-তিনটি টিভি চ্যানেল ও ছয়-সাতটি দৈনিক ছাড়া সবখানেই বেতন-ভাতা নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে না। আবার অধিকাংশ মিডিয়াতেই সরকার ঘোষিত বেতন স্কেলও দেওয়া হয় না।

এসব নিয়ে টুঁ শব্দটি করারও যেনো কেউ নেই! যারা মানবাধিকারের পক্ষে সবচেয়ে সোচ্চার, সেই মিডিয়া জগতের মানবাধিকারের কথা কে বলবেন?

অন্যদিকে, আগে মিডিয়া ছিলো পরিবেশ-বান্ধব; এখন সবাই সেনা-বান্ধব!