Tuesday, January 1, 2008

নির্বাচন কমিশনের তিনটি বানর...

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়টি আগারগাঁওয়ের বিশাল এলাকা জুড়ে। সুন্দর লাল ইট দিয়ে ঘেরা সীমানা প্রাচীরের ভেতর নানা ধরণের গাছ - গাছালিতে ছাওয়া এলাকাটি বেশ মনোরম। এই সীমানার ভেতর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের দপ্তর। তবে সবাই একে নির্বাচন কমিশন অফিস বলেই জানে।


কমিশন সচিবালয়ের ভেতরে রয়েছে বেশ কয়েকটি পুরনো শিল কড়ই, অশ্বত্থ, বট, আম ও কাঁঠালের বড় বড় গাছ। আছে নানান ধরণের দেশি - বিদেশি ফুলের গাছ। বছর জুড়েই অনেক দেশি -- বিদেশি পাখপাখালিতে পুরো ক্যাম্পাসটি মুখরিত থাকে। দেখে মনেই হবে না যে, এটি কোনো সরকারি কার্যালয়; লেকটিকে বাদ দিলে বেশ একটা রমনা পার্ক, রমনা পার্ক আবহ এর।

কমিশনের দুটি ক্যান্টিন ছাড়াও ক্যাম্পাসের দুই কোনো গাড়ি গ্যারাজের পেছনে আছে দুটি ঝুপড়ি চায়ের দোকান। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারিদের অল্প বয়সী দুজন ছেলে এই দুটি চা দোকান চালায়। একজন মাহতাব, আরেকজন জনি মিয়া।

প্রতিদিন নির্বাচন কমিশনের হালনাগাদ তথ্য - সংবাদ সংগ্রহ করতে আমরা ৩০ - ৩৫ জন গণমাধ্যম কর্মি ভীড় করি এই দুটি চায়ের দোকানে। নামকরণের সুবিধার্থে সাংবাদিকরা চায়ের দোকান দুটির নাম দিয়েছে, বোমা তলা আর বানর তলা।

এখন কমিশনের সব কর্মকর্তা - কর্মচারি এই চায়ের দোকান দুটিকে এরকম অদ্ভুদ নামেই চেনে। এই নামকরণের নেপথ্যে রয়েছে একটু মজার ইতিহাস।

*
ওয়ান ইলেভেনের পর বর্তমান সেনা সমর্থিত অস্বাভাবিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্বাচন কমিশন গত বছর বাতিল করে ২২ জানুয়ারির এক তরফা নির্বাচন।

সবার মনে আছে নিশ্চয়ই, এই নির্বাচন বাতিল হওয়ার আগে পুরো কমিশনকে ঘিরে ঢাকাসহ সারাদেশে গড়ে উঠেছিল সহিংস আন্দোলন।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এমএ আজিজসহ অন্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে প্রায় প্রতিদিনই হরতাল, অবরোধ, কমিশন কার্যালয় ঘেরাও, কুশ পুত্তলিকা দাহ -- ইত্যাদি চলছে।

সেনা বাহিনী, বিডিআর, আমর্ড পুলিশ, পুলিশ আর সামরিক - বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থার কড়া নিরাপত্তার ভেতর কমিশন কার্যালয় থেকে একটু পর পর আপডেট নিউজ দিতে দিতে আমরা সাংবাদিকরাও বেশ খানিকটা উত্তেজিত।

সকাল ৯ টা থেকে রাত ৯ টা - ১০ টা পর্যন্ত আমাদের সময় কাটছে কমিশনের অফিসেই। কমিশন ক্যান্টিনে সকালের নাস্তা, আর দুপুরের খাবারের আগে ও পরে মাহতাব - জনির চায়ের দোকানে আমাদের আড্ডাবাজীও চলছে।

এমন সময় এক বিকালে খবর পাওয়া গেলো, মাহতাবের চায়ের দোকানের পাশে একটি তাজা হাতবোমা পাওয়া গেছে! এই বুঝি বোমা ফাঁটলো -- পুরো কমিশন ভীত - সন্ত্রস্ত্র।

খবর পেয়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) বিশাল একটি বোম - স্কোয়াড ইউনিট এসে হাজির। মাহতাবের দোকানটিকে ঘিরে বোমা বিশেষজ্ঞরা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে। এ সব দক্ষ - যজ্ঞ শেষে তারা বোমাটিকে নিস্ক্রিয় করার জন্য বিশেষ ধরণের যানবাহনে করে নিয়ে যায়।

ওই ঘটনার পর আম - কাঁঠালের গাছের নীচে মাহতাবের দোকানের কদর বাড়ে। কমিশনের ড্রাইভার, পিয়ন মামুরা সকাল - বিকাল ভীড় জমান বোমা প্রাপ্তির স্থানটিকে এক নজর দেখার জন্য।

মাহতাবও ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় সরস বর্ণনা দিতে থাকে, 'তারপর চাচা মিয়া, বুঝলাইন, আমি দোহান ঝাড়ু দিতা গিয়া দেহি, পাতার আড়ালে ইহা ব্বড়ো একটা বুমা। লাল ট্যাপ দিয়া প্যাঁচানো'...।

এরপর চায়ের কাপে যথারীতি ঝড় ওঠে। অনেক মামু সাংবাদিকদের কাছে জানতে চান, দেশের ভবিষ্যত। আমরাও বিজ্ঞর মতো হাত নেড়ে নেড়ে তাদের জ্ঞান দেই।

তো এই বোমা প্রাপ্তির পর থেকেই আমরা মাহতাবের দোকানটির নাম দেই -- বোমা তলা।

*
কমিশনের আরেক কোনে কয়েকটি বড় বড় কড়ই গাছের নীচে জনির চায়ের দোকানই বা নামকরণ থেকে বাদ পড়বে কেনো? কড়ই তলা থেকে সেটি হয়ে যায় -- বানর তলা।

কড়ই গাছগুলোতে সত্যিই সত্যিই কোথা থেকে যেনো তিনটি বানরের একটি দল হঠাৎ হঠাৎ এসে জড়ো হয়। আমরা আর মামুরা বানরদের আদর করে কলা, রুটি, বিস্কুট খাওয়াই।

বানরগুলোর খাবারের লোভে একেবারে গাছের নীচের ডালে, কি জনির দোকানের প্লাস্টিক শিটের ছাদে এসে বসে। বুনো হলেও ওরা জানে, এখানে ওরা নিরাপদ। তখন হাত বাড়িয়েই বানরগুলোকে খাবার দেওয়া যায়।

আমরা শুনেছি, তেজগাঁ পুরনো বিমানবন্দরে নাকি বানরদের একটি বড়সড় দল ছিল। টোকাইদের নিষ্ঠুর ইট - পাটকেলের আঘাতে মারা গেছে কয়েকটি। আবার কয়েকটি বৈদ্যুতিক শকে মারা পড়েছে।

কিন্তু কী ভাবে যেন কোনো রকমে টিকে গেছে মাত্র এই তিনটি বানর। এই বানরত্রয়ের বাস আসলে কমিশন সচিবালয়ের পাশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের কড়ই গাছে। ওই ক্যাম্পাসটিও গাছ - গাছালিতে পূর্ণ।

বানর তিনটির মধ্যে বৈদ্যুতিক শক খেয়ে আবার বড়টির এক পা খোড়া হয়ে গেছে। কোনো এক সময় ইটের আঘাতে ওপরের ঠোঁট বিশ্রীভাবে কেটে গেছে মেজোটির। আর ছোটটি সুস্থ থাকলেও এতো রুগ্ন যে ওর পাঁজরের হাড় বেরিয়ে গেছে। ...

সাংবাদিকরা দুষ্টুমি করে বানর তিনটির নাম দেই আজিজ (সিইসি এমএ আজিজ), মাহফুজ (কমিশনার মাহফুজুর রহমান) ও জাকারিয়া ( আরেক কমিশনার মোহাম্মাদ জাকারিয়া)!

*

গত বছর জানুয়ারিতে হঠাৎ করে বানর তিনটি উধাও হয়ে যায়। এর পর পরই পদত্যাগ করেন আজিজ কমিশন। দায়িত্ব নেন বর্তমান সিইসি এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বে নতুন কমিশন।

বানর ত্রয়ের উধাও হওয়ার সঙ্গে অবশ্য আজিজ কমিশনের পদতাগের কোনো যোগসাজস নেই। বানর তলার জনি জানায়, কমিশন কার্যালয়ের উল্টো দিকে বাণিজ্য মেলার মাইকের বিকট আওয়াজে বানরগুলো আবার ফিরে গেছে তেজগাঁ পুরনো বিমানবন্দর এলাকায়। বন্যেরা নিরবতা পছন্দ করে।...

একমাস পরে বাণিজ্য মেলা শেষ হলে ওরা আবার ফিরে আসে বানর তলার গাছে। খাবারের সন্ধানে অনেক সময় তারা বোমা তলায় মাহতাবের দোকানেও এসে হাজির হয়।

একদিন বোমা তলার মাহতাবকে দেখা গেলো, লম্বা একটি বাঁশ নিয়ে দোকানের সামনে অনবরত পায়চারি করতে। রাগে গজগজ করে সে, 'এক্কেরে সব কয়টারে কোপায় ফেলবাম!'...

আমাদের একজন তাকে ভুল শুধরে দেয়, 'ওরে মাহতাব, বাঁশ দিয়ে কাউকে কোপানো যায় না।'

একটু স্থির হয়ে মাহতাব জানায়, দোকান ফেলে ও কল থেকে এক বালতি পানি নিয়ে এসে দেখে তিন বানরের তিন রকম কীর্তি। আজিজ মিয়া কলার এক ছড়া, মাহফুজ মিয়া বড় একটি পাউরুটি আর জাকারিয়া মিয়া এক বয়াম কেক নিয়ে সটকে পড়েছে!

আমরা দেখি, গাছের মগডালে বসে তখনও মহানন্দে চুরি করা খাবার-দাবাড় সাবাড় করা চলছে।

সঙ্গে সঙ্গে মাহতাবকে আমরা চাঁদা তুলে ক্ষতিপূরণ দেই। ওকে পাখি পড়ানোর মতোন করে বোঝাই, কেনো কোনোক্রমেই বিপন্ন এই বানরগুলোকে তাড়ানো যাবে না। আমরা এ - ও বলি, আবার যদি এ রকম লুঠপাটের ঘটনা ঘটে, ও যেনো আমাদের তা জানায়; আমরাই ওর ক্ষতিপূরণ দেবো।

আজ ১ জানুয়ারি মাইক বাজিয়ে বিপুল উৎসাহ - উদ্দীপনায় ব্যপক শব্দ দূষনের মধ্যে দিয়ে আবার শুরু হয়েছে বাণিজ্য মেলা। কিন্তু কমিশনের বানররা এর কিছুদিন আগেই উধাও হয়ে গেছে একেবারে।

*
ঈদের ছুটির পর আমরা কমিশনে এসে শুনি সেই করুণ কাহিনী।

বানরতলার জনি আমাদের জানায়, ঈদের ছুটির সময় কমিশন ক্যাম্পাসে যখন পুলিশ ছাড়া আর কেউ নেই, তখন এক বানর ওয়ালা এসে নাকি কলার লোভ দেখিয়ে জাল দিয়ে বড় দুটিকে ধরে নিয়ে গেছে, পোষ মানিয়ে রাস্তায় রাস্তায় খেলা দেখাবে বলে! আর কোনোক্রমে ছোটটি পালিয়ে প্রাণে বেঁচেছে। সেটিও কয়েকদিন কান্নাকাটি করে কোথায় যেনো হারিয়ে গেছে।

জনি নিজেই দোকান বন্ধ করতে এসে দেখেছে এই দৃশ্য।

ঘটনা শুনে আমরা চুপ করে যাই। কিন্তু মামুদের কয়েকজন ক্ষেপে যায় জনি ওপর,'শালার ব্যাটা, তুই ওই বানর ওয়ালাকে লাঠি পেটা করতে পারলি না? পুলিশে খবর দিস নাই কেনো?'--ইত্যাদি।...আমরা তাদের থামাই।

এখনও প্রতিদিন কাজের ফাঁকে আমরা চায়ের জন্য ভীড় করি সেই বোমাতলা, বানরতলায়। আমাদের মধ্যে অনেকই ভুল করে এখনো উঁচু উঁচু গাছের ডালে খুঁজে বেড়ায় বানর তিনটিকে। আমাদের মনে পড়ে যায়, ক্ষুধার্ত বানরগুলোর জ্বলজ্বলে তিন জোড়া চোখ। সামান্য খাবার পেয়ে কী এক অদ্ভুদ মায়ায় ওরা তাকাতো আমাদের দিকে! মোবাইল ক্যামেরা কী ভিডিও ক্যামেরার সামনে ওরা ভেঙচি কেটে, লম্ফ - ঝম্ফ করে রীতিমতো পোজ দিতো! কিন্তু এখন এ সব কেবলই অতীত।...