Wednesday, November 28, 2007

লাশকাটা ঘর



শোনা গেল লাশকাটা ঘরে/নিয়ে গেছে তারে;/কাল রাতে - ফাল্গুনের রাতের আধাঁরে...

এক। একের পর এক সাপ্তাহিকীতে কলম-পেষার পর নয়ের দশকের শুরুতে দৈনিক আজকের কাগজে তিন হাজার+ অনিয়মিত বেতনে ক্ষুদে রিপোর্টার হিসেবে প্রথম চাকরীতে যোগদান। সেই সময় দুর্ধর্ষ ক্রাইম রিপোর্টার আমিনুর রহমান তাজ (এখন অবসর জীবনে) ভাইকে দেখে অধমেরও শখ জাগে ওনার মতো খ্যাতনামা ও ক্ষমতাধর ক্রাইম রিপোর্টার হওয়ার। শুরু হয় তাজ ভাইয়ের পেছনে ঘোরাঘুরি।
তখনই বোঝা হয়ে গিয়েছিলো, সাংবাদিকতায় রাজনৈতিক ও অপরাধ বিষয়ক রিপোর্টারদের সবচেয়ে বেশী বাজারদর। ক্ষমতার পাল্লাটিও বেশ ভাড়ি।

কিন্তু তাজ ভাই কিছুতেই এই পুঁচকে সাংবাদিককে তার দলে নেবেন না। তার এক কথা, তুই তো চ-ব-খ দিয়ে কথাই বলতে পারিস না! তোর মতো ভদ্র ছেলে দিয়ে ক্রাইম রিপোর্টিং হবে না। ক্রাইম রিপোর্টিং কোনো ভদ্রলোকের পেশা না। গুডি বয় - চকলেট বয়রা এই বিটে টিকতে পারে না। তুই তো থানায় গিয়ে ওসির দরজায় নক করে বলবি, মে আই কাম ইন স্যার? আর ওসি মনে করবেন, এইডা আবার কোন ছাগল!
মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে, অ্যাঁ!
তাজ ভাই বলেন, ঠিকই বলছি। শোন, এদেশে হেরাল্ড ট্রিবিউন বা আশাহি সিম্বুনের সাংবাদিকতা চলবে না। ক্রাইম রিপোর্টার হতে গেলে, থানার দরজায় লাথি মেরে ওসির রুমে ঢুকবি । টেবিল চাপড়ে বলবি, এই ব্যাটা ওসি, আমি ক্রাইম রিপোর্টার বিপ্লব। জলদি আমার জন্য এক প্যাকেট বেনসন আনান! তখন ওসি মনে মনে বলবেন, এই তো একজন জাত সাংবাদিক এসেছেন! বুঝলি?
দুই। অনেক কষ্টে চা - সিগারেট খাইয়ে, ফুটফরমাশ খেটে দিয়ে তাজ ভাইয়ের মন গলানো গেলো। লেগে পড়া গেলো শখের ক্রাইম রিপোর্টিং-এ।
একদিন তাজ ভাই ডেকে বললেন, এই শোন, তুই তো খুব ভদ্র ছেলে, মর্গে বেশি ঘোরাঘুরি করবি না!
-- কেনো তাজ ভাই?
- কোনো প্রশ্ন করিস না। যেটা বলেছি, সেটা শোনার চেষ্টা করিস। নইলে রাতে ভয়ের স্বপ্ন দেখবি।
-- রাতে ভয়ের স্বপ্ন দেখি তো!
- মানে?
-- ইয়ে... প্রায় রাতেই ভয়ংকর সব ভয়ের স্বপ্ন দেখি। ঘুমের ঘোরে দেখি, বিছানায় শুয়ে আছি, আমার মাথার ওপর দিয়ে 

পোস্ট মর্টেম করা কাঁটাছেড়া বিভৎসব সব নগ্ন লাশ একের পর এক উড়ে যাচ্ছে! তখন ভয়ের চোটে ঘুমের ভেতর ছটফট করি। ঘুম ভেঙে গেলে দেখি, পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে। গ্লাসের পর গ্লাস পানি খাই; তবু তৃষ্ণা মেটে না!
তাজ ভাই তার নবাগত শিষ্যের করুন হাল দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। তার মুখে বাক্য সরে না।
এবার পাল্টা প্রশ্ন করা হয়, তাজ ভাই, আপনার কী অবস্থা? আপনিও কী ভয়ের স্বপ্ন দেখেন?
তার সরল জবাব, আমার কথা আর কী জানতে চাস? আমি তো এখন মর্গে বসে ভাতও খেতে পারবো!
তিন। বলা ভালো, সে সময় ডিএমসি'র (ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল) মর্গের বেহাল দশা যারা না দেখেছেন, তাদের পক্ষে একটু বোঝা মুশকিল, মর্গ কতোটা বিভৎস হতে পারে!
এখনকার মতো এসি তো দূরের কথা, তখন মর্গে ফ্যানও লাগানো ছিলো না। সেখানে সারিবদ্ধ স্টিলের স্ট্রেচারে ফরমালিন দেওয়া লাশগুলো সংরক্ষণ করার যেনো একটা প্রহসন হতো। আর প্রায়ই ফরমালিনের অভাবে পঁচন ধরতো লাশে। মর্গের আধ মাইল দূর থেকে পাওয়া যেতো লাশের বোঁটকা দুর্গন্ধ।
এই অধমদের মতো পুঁচকে ক্রাইম রিপোর্টারদের কোনো মৃত্যূর খবর নিশ্চিত করতে ছুটে যেতে হতো ওই মর্গেই। তখন মর্গের অধিপতি ছিলেন মাঝ বয়সী সুদর্শন রমেশ ডোম। স্বীকার করা যাক, বয়সে ছোট বলে রমেশ দা'র কাছে নবীন সাংবাদিকের খাতির অন্যদের চেয়ে একটু বেশীই ছিলো।
ফিনফিনে সিল্কের সাদা পাঞ্জাবি - লুঙ্গী, সোনার চেন, আর আট - দশটি ঝলমলে আংটিতে কে তাকে দেখে বলবেন যে, তিনি একজন পেশাদার ডোম! তাদের কয়েক পুরুষের পেশা-- লাশ কাটা।
একবার খুব শখ হলো, পোস্ট মর্টেম বা ময়না তদন্ত দেখার। রমেশ দা কিছুতেই রাজী হন না। অনেক বলে-কয়ে তাকে রাজী করানো গেলো। অবাক হয়ে দেখা গেলো, একজন ডাক্তার উলঙ্গ এক বৃদ্ধর লাশের (ডিএমসির ভাষায়: বডি) এখানে 

- সেখানে ছড়ি দিয়ে ইঙ্গিত করছেন। রমেশ দা ভাবলেশহীনভাবে স্কালপেল দিয়ে লাশ কাঁটাছেড়া করছেন। পরীক্ষা - নীরিক্ষা শেষে হাঁটু মুড়ে বসে লেপ - তোষক সেলাই করার মতো আবার সেই লাশ জোড়া দেন তিনি। এবার অবশ্য দু - তিনজন সহকারী তাকে সহায়তা করেন।
চার। একবার রমেশ দা'কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল 'লাশ খেকো খলিলুল্লাহ'র কথা। তিনি শুধু বলেন, চিনতাম গো দাদা। ওই কথা ছাড়া অন্য যে কোনো কথা কন।
এরপর কিছুতেই তিনি এ বিষয়ে মুখ খুলতে চাইতেন না।
অনেকেরই হয়তো মনে থাকবে, খলিলুল্লাহর কথা। বিষয়টি জানা গেছে, সাবেক নকশালাইট বাবা আজিজ মেহেরের ব্যক্তিগত বইয়ের ভাণ্ডারে ঘেঁটে। সাতের দশকে সাহাদাত চৌধুরী সম্পাদিত জনপ্রিয় 'সাপ্তাহিক বিচিত্রা'র একটি পুরো প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছিলো এই নিয়ে ।
সাদাকালো প্রচ্ছদে খলিলুল্লাহ মানুষের লাশ খাচ্ছেন, এমন একটা ছবিও ছাপা হয়েছিলো।
খলিলুল্লাহও ছিলেন ঢাকা মেডিকেলের তালিকাভুক্ত ডোমদের একজন। তখন ডোমদের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস ছিলো, লাশের কলজের একটু খানি কাঁচা খেলে নাকি মনে সাহস বাড়ে, লাশ কাটতে সহজ হয়। এই ভাবে মরা মানুষের কলজে খেতে খেতে খলিলুল্লার মানসিক বিকৃতি ঘটে।
তিনি শেষ পর্যন্ত আজিমপুর গোরস্থান থেকে লাশ চুরি করে কলজে ছিঁড়ে খাওয়া শুরু করেন! বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ঢাকা জুড়ে দেখা দেয় খলিলুল্লাহ - আতঙ্ক।...
পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে চিকিৎসার জন্য পাবনা মানসিক হাসপাতালে পাঠায়। শোনা গেছে, একেবারে শেষ বয়সে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে খলিলুল্লাহ নাকি আজিমপুর গোরস্থানের গেটে বসে ভিক্ষে করতেন। এই করতে করতে শেষে তিনি মারা যান।
পাঁচ। আরেকদিন ধরা গেলো রমেশ দা'কে, আচ্ছা দাদা, কোনো রাতে লাশ কাটতে ভয় পেয়েছেন?
রমেশ দা হাসেন, আরে না রে বোকা। আমাদের আবার ভয়ডর কি! আমাদের ভয় করলে চলে? তয় যে রাতে বডি বেশী কাটতে হয়, তার আগে একটু 'বাংলা' মাইরা লই। মনে বল পাওয়া যায়, কাজও হয় ভালো।
তিনি নিজে থেকেই বলেন, আমি কোনো বডির মুখ - শরীর, কিছুতেই মনে করতে পারি না। তবে একটা মাইয়ার মুখ সারা জীবন মনে থাকবে গো দাদা!
-- কোনো? কী হয়েছিলো তার?
- সুইসাইড কেইস। প্রেমে ব্যর্থ হইয়া বিষ খাইছিলো। এই ধরো ১৭ - ১৮ বছর বয়স হইবো। কি যে সোন্দর আছিলো দেখতে! তখন আমার বয়সও ছিলো কম। বাপের কাছে নতুন নতুন বড়ি কাটা শিখছি। তো সেই বডি কাটতে কিছুতেই মন সায় দেয় না। বার বার মনে হয়, এতো সুন্দর নিস্পাপ মাইয়াটারে আমি কাইটা ফেলবো? এই মাইয়াটা যদি ব্যাথ্যা পায়? যদি তার অভিশাপ আমার গায়ে লাগে? ... এদিকে ডাক্তার সাব আমারে খালি ধমকান, এই রমেশ, তাড়াতাড়ি করো, তাড়াতাড়ি করো।
... শেষে মনে মনে মাইয়াটার কাছে মাফ চাইয়া লই। মা জননী গো, তুমি আমারে ক্ষমা দেও। তোমার বডি না কাটলে আমার চাকরি যাইবো গা। ...পরে কাজ শেষ হইলে বডিটারে আমি প্রনাম করছি। ওইটাই প্রথম, ওইটাই .‌শ্যাষ।...

ছয়। রমেশ ডোম এখন আর লাশ কাটেন না। তার সহযোগিরাই কাজ চালিয়ে নেন। তার ছেলেদের কাউকেই তিনি এ পেশায় আনেন নি। তাদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন, উজ্জল ভবিষ্যতের আশায়। 'ডোম' পরিচয় ঘোচাতে কয়েক বছর আগে ধর্ম বদল করে তিনি এখন মোহাম্মাদ সিকান্দার।
তথ্য-সাংবাদিকতায় জীবনের অনেকটা বাঁক পেরিয়ে এখনো হঠাৎ হঠাৎ তার কথা মনে পড়ে।
ব্যস্ততার কারণে রমেশ ডোম, ওরফে মো. সিকান্দারের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত দেখা করা হয়ে ওঠে না। মনে পড়ে তার সেই কথা, আমারে ক্ষমা দেও গো মা জননী। তোমার বডি না কাটলে আমার চাকরি যাইবো গা!...
কসাইয়ের মতো নির্লিপ্ততায় যখন গণহত্যা বা পাহাড়ি-বাঙালি মারাত্নক সব সহিংসতার সংবাদ লেখা হয়, সংবাদে তুলে আনা হয় ধর্ষিতার আর্তনাদ, যখন তুমুল স্পিডে টাইপ করতে হয় ঘুর্ণিঝড়ে হতাহতদের তাজা খবর, অথবা সাধারণ কোনো মৃত্যূ সংবাদ -- তখন মাঝে মাঝে নিজেকেও কেনো যেনো রমেশ ডোম, ওরফে মো. সিকান্দার বলে ভ্রম হয়।...
জানা আছে নির্ঘাত, এই সব বিবিধ টাটকা খবরের ময়না তদন্ত না করলে রমেশ ওরফে সিকান্দারের মতো এই অধমেরও 'চাকরি যাইবো গা!'...
---
ছবি: লাশকাটা ঘর, আন্তর্জাল।