Saturday, August 11, 2007

পল্লবের পরীরা


প্রিয় পল্লব, বছর তিনেক আগে দৈনিক যুগান্তর ছাড়ার পর আমার যুগান্তরের অনেক সহকর্মী দৈনিক সমকালে যোগ দেন। তাদেরই টানে আমি প্রথম আলো -- নিউ এজ বদলে সমকাল -- নিউ এজ পড়তে শুরু করি। কিন্তু মানসিক রোগিদের (মনে আছে নিশ্চয়ই, মিরপুরের কথিত সেই দুই সুপার জিনিয়াস রীতা -- মিতা কাহিনী) পুঁজি করে সমকাল সংবাদ বিক্রি করা শুরু করায় আমি আবার ফিরে যাই প্রথম আলোতে। সেই থেকে সমকাল আমার তেমন একটা পড়া হয় না। হয়তো অফিসে এসে হেডলাইনগুলোতে একটু চোখ বুলিয়ে গেলাম -- এরকম আরকি।
কিন্তু সেদিন রাতে একটা পার্টিতে সমকালের পুরনো একটা সাপ্লিমেন্টে আপনার লেখা দেখে আমি পত্রিকাটা টেনে নেই। এক টানে পড়ে ফেলি পুরো লেখা।


সমকালের বিভিন্ন পাতায় এর আগেও আপনার ভ্রমন কাহিনী পড়েছি। আপনার সাবলীল ভাষা, প্রকৃতি দেখার সহজাত চোখ ও পর্যটকের মন আমাকে টানে। কিন্তু (এই কিন্তুটা অনিবার্য; কোনো রকমেই কিন্তুটাকে এড়ানো গেলো না। অতএব কিন্তু) --


চিতমরমের পাহাড়ে মারমাদের বর্ষবরণ উতসব 'সাংগ্রাই' নিয়ে আপনার এবারের লেখাটি আমি কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারলাম না -- লেখাটির দিকদর্শনের কারণেই।

এর বিষয়বস্তু নয়, ভাষা নয়, এমন কী মূল রচনা সম্পর্কেও নয়, পাহাড়িদের দেখার যে লোভাতুর দৃষ্টি গত প্রায় ১০০ বছরে আমরা সংখ্যাগুরু বাঙালি জাতি তৈরী করেছি, সেই দৃষ্টিসুখের মোহ থেকে শেষ পর্যন্ত বন্ধুবরেষু পল্লবও বের হতে পারলেন না -- আমার আপত্তি এখানেই।
প্রিয় পল্লব, আদিবাসী পাহাড়িদের নিয়ে আমরা সমতলের বাঙালিরা সব সময়েই একটা রোমান্টিকতায় ভুগি; বিশেষ করে পাহাড়ি মেয়েদের নিয়ে। এর একটা কারণ বোধহয়, পাহাড়ি মেয়েরা প্রকৃতির মতো সরল ও সুন্দর (আপনার ভাষায় -- পরীর মতো)। যে কারণে পাহাড়ি মেয়েদের নষ্ট করার সুযোগও অনেক বেশী।

আপনি পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস পর্যলোচনা করলে দেখতে পাবেন --পাহাড়, অরণ্য, ঝর্ণা ধারায় নয়নাভিরাম পার্বত্যাঞ্চলের ইতিহাস, গণহত্যা, গণধর্ষণ, শোষণ আর বঞ্চনার ইতিহাস। কল্পনা চাকমাকে মনে পড়ে নিশ্চয়ই। নিখোঁজ নারী নেত্রীর শেষ পরিনতি কী -- আশা করি পল্লব, আপনি তা সহজেই অনুমান করতে পারেন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সমতল কী পাহাড়ে -- আদিবাসী অধূ্যষিত অন্যান্য এলাকার চিত্রও কী প্রায় একই রকম নয়? জমি কেড়ে নিয়ে, ভাষা কেড়ে নিয়ে, ধর্ম নষ্ট করে, মেয়েদের নষ্ট করে, গলা টিপে ুদ্র জাতিসমূহকে ধ্বংস করার একটা নিরব সুদূর প্রসারী ষড়যন্ত্র কী সর্বত্রই চলছে না?
একটু খেয়াল করে ৬০দশক থেকে এ পর্যন্ত চলে আসা বাংলা -- হিন্দী সিনেমা, এমন কি টিভি নাটক খেয়াল করে দেখবেন, সেখানে কী ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে আদিবাসীদের -- বিশেষ করে আদিবাসী মেয়েদের।

প্রচ্ছন্নভাবে ধারনা দেওয়া হচ্ছে, আদিবাসীরা জংলি, অসভ্য, এখনও ওরা নরমাংসভোজী।

আর সেইসব সিনেমা কী নাটকে দেখা যায়, শহর থেকে বাবুসাব গেছেন অরণ্যে বেড়াতে কী কর্মসূত্রে। ছমক ছমক নৃত্যগীতি -- ঢোল -- বর্শা -- মদ্যপানে প্রেম হলো তার জংলী রাণীর সঙ্গে। েেপ গেলো 'পরদেশী বাবুর' ওপর পুরো অরণ্যচারী জনপদ -- ইত্যাদি ইত্যাদি।
পল্লব, প্রিয় পল্লব, বছর চারেক আগে কুলাউড়ার খাসিয়া পাহাড় গর্জে উঠেছিলো ইকো -- টু্যরিজম, তথা ইকো -- পার্কের বিরুদ্ধে। আর এই সেদিন মধুপুরে আরেক ইকো -- পার্ক রুখতে গিয়ে প্রাণ দিলেন একজন গারো আদিবাসী তরুন।

সেই সময় বর্ষিয়ান খাসি নেতা অনিল ইয়াং ইউম আমাকে বলেছিলেন, যে পর্যটন আমার গ্রাম ধ্বংস করবে, নষ্ট করবে গাছবাঁশ, পানের বরজ, পাহাড়ি ছড়া, আর আমার মেয়েদের -- আমি নেতা হিসেবে নই, এই পাহাড়ের মানুষ হিসেবে আমি যে কোনো মূল্যে সেই পর্যটন রুখে দেবো। আমি শহর চাই না, দালান চাই না, রাস্তা চাই না, বিদু্যত, টিভি -- সিনেমা চাই না। আমার অরণ্যে আমি যুগ যুগ ধরে আমার মতো করেই স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই।
জানি না বিষয়টি আপনাকে কতোটা বোঝাতে পারলাম। আমার বোঝানোর মতাও তো সীমাবদ্ধ, তাই না?

তাই বলছিলাম, আপনার লেখা পড়ে সমতলবাসী+সুশিতি+প্রথম শ্রেণীর নাগরিক+সভ্য মানুষের মনে হতেই পারে, পাহাড় তাহলে প্রেমকাতর পরীতে ভরপুর! তারা নেচে নেচে সাংগ্রাই বারি বর্ষণ করবে -- তখন বলা যাবে, সাংগ্রাই ফানি ইজ সো ফানি।...ম্যামাচিং এর মতো সুন্দরীরা বলামাত্র মোবাইলে ফোন করবে, খুনসুটি করে পাল্টা প্রশ্ন করবে, কে রে?....

পল্লব, পাহাড়ে কর্মরত নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক তরুণ সদস্যর সঙ্গে আমি কথা বলে জেনেছি, ম্যালেরিয়া, জঙ্গল -- জলা, আর একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠির ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পোস্টিং দেওয়ার জন্য তাদের ভাল বেতন আর 'সেক্সি চাকমা মেয়ে' অবাধে ভোগ করার লোভ দেখানো হয়।....

সব মিলিয়ে তাই আপনার এবারের লেখাটা কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারলাম না। এ জন্য বিশেষভাবে দুঃখিত।

শেষ করছি। ভাল থাকবেন। ভালবাসায় থাকবেন।